সারাদেশ ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
সরিষাবাড়ী (জামালপুর): গ্রামীণ জনপদে বর্ষা মৌসুমের শুরুতে অসচেতনতা এবং সাঁতার না জানার কারণে শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এবার জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনায় মাদ্রাসা থেকে বাড়ি ফেরার পথে পুকুরের পানিতে ডুবে সম্পদ মিয়া নামের নয় বছর বয়সী এক কোমলমতি শিক্ষার্থীর অকাল মৃত্যু হয়েছে। দুপুরের তীব্র তাপদাহ থেকে বাঁচতে অথবা নিছক শৈশবসুলভ আনন্দের বশে পুকুরের শীতল পানিতে গোসল করতে নেমে আর জীবিত ফিরতে পারেনি এই শিশুটি। আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন, ২০২৬) দুপুরে জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী পৌরসভার অন্তর্গত ভুরারবাড়ি গ্রামে এই বুকফাটা ও বেদনাদায়ক ঘটনাটি ঘটে। নিহত শিশু শিক্ষার্থী সম্পদ মিয়া ওই গ্রামের স্থানীয় সুপরিচিত ব্যবসায়ী আবুল হোসেন আকন্দের একমাত্র আদরের পুত্র সন্তান ছিল।
আরও পড়ুন: সিন্ধুর পানিতে হাত দিলে হাত কেটে দেওয়া হবে: ভারতকে পাকিস্তানের চরম হুমকি
পারিবারিক সূত্র, প্রত্যক্ষদর্শী এবং ভুরারবাড়ি গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে যে, প্রতিদিনের মতো আজ মঙ্গলবার দুপুরেও সম্পদ তার স্থানীয় মাদ্রাসা থেকে ছুটির পর নিজের ছোট বোনকে সাথে নিয়ে পায়ে হেঁটে বাড়ির দিকে রওনা হয়েছিল। দুই ভাই-বোন গল্প করতে করতে বাড়ি ফেরার পথে সরিষাবাড়ী পৌরসভার অন্তর্গত সরকার পাশা ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট সংলগ্ন একটি গভীর পুকুরের পাড়ে এসে পৌঁছায়। এ সময় দুপুরের প্রচণ্ড গরমে ক্লান্ত হয়ে পড়া শিশু সম্পদ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বা সাঁতার কাটার প্রবল ইচ্ছায় পরনের পোশাক রেখেই আচমকা পুকুরের পানির উদ্দেশ্যে ঝাঁপ দেয়। তবে পুকুরটির গভীরতা অতিরিক্ত বেশি থাকায় এবং সম্পদের সাঁতারের পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে পানিতে পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সে তীব্র স্রোতে বা অতল গহ্বরে তলিয়ে যেতে শুরু করে এবং একপর্যায়ে পানির নিচে পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায়।
পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সম্পদের ছোট বোন ভাইয়ের এই ভয়ংকর অবস্থা এবং পানিতে তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে ভয়ে ও আতঙ্কে চিৎকার শুরু করে। অবুঝ ছোট বোনের সেই গগনবিদারী ডাকচিৎকার ও কান্নার শব্দ শুনতে পেয়ে আশেপাশের বাড়িঘর এবং রাস্তায় যাতায়াতকারী স্থানীয় লোকজন ও পথচারীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বেশ কয়েকজন স্থানীয় যুবক তাৎক্ষণিকভাবে পুকুরের পানিতে নেমে নিখোঁজ শিশুটিকে খুঁজতে শুরু করেন। প্রায় বেশ কিছুক্ষণ আপ্রাণ চেষ্টা ও খোঁজাখুঁজির পর তারা পুকুরের তলদেশ থেকে অচেতন ও নিথর অবস্থায় সম্পদ মিয়াকে পানির ওপরে উদ্ধার করে নিয়ে আসতে সক্ষম হন।
উদ্ধারের পরপরই উপস্থিত স্বজন ও এলাকাবাসী কালবিলম্ব না করে সম্পদকে চিকিৎসার জন্য দ্রুত সরিষাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। তবে সেখানে নিয়ে যাওয়ার পর কর্তব্যরত জরুরি বিভাগের চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে অত্যন্ত দুঃখের সাথে সম্পদ মিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত ঘোষণা করেন। এই মর্মান্তিক ও আকস্মিক মৃত্যুর খবরটি ভুরারবাড়ি গ্রামে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে পুরো এলাকায় এক নিস্তব্ধ ও থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরিবারের একমাত্র পুত্র সন্তানকে হারিয়ে নিহতের মা-বাবা এবং আত্মীয়-স্বজনদের আহাজারিতে পুরো এলাকার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও অকাল মৃত্যুর ঘটনায় গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের কালো ছায়া।
আরও পড়ুন: জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধ: হাসানুল হক ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ড
এই বেদনাদায়ক ঘটনার বিষয়ে সরিষাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সম্মানিত স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ দেবাশীষ রাজবংশী গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করে জানান যে, দুপুরে পুকুরের পানিতে ডুবে যাওয়া এক শিশুকে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় তার স্বজনরা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে এসেছিলেন। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, হাসপাতালে পৌঁছানোর অনেক পূর্বেই শিশুটির শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল। চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা সত্ত্বেও তাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। গ্রামীণ অঞ্চলের অভিভাবক ও মা-বাবাদের প্রতি তিনি বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়ে বলেন যে, বর্ষা ও গরমের এই সময়ে ছোট ছেলেমেয়েরা যেন কোনোভাবেই বড়দের চোখ ফাঁকি দিয়ে উন্মুক্ত জলাশয় বা পুকুরে নামতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে।
নিউজের সূত্র: জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগ এবং ভুরারবাড়ি গ্রামের স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিনিধি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।