রাজনীতি ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
ঢাকা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করে চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মামলায় এক ঐতিহাসিক রায় ঘোষিত হয়েছে। চব্বিশের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান দমনে উসকানি, প্ররোচনা এবং কুষ্টিয়া জেলায় ৬ আন্দোলনকারীকে নির্মমভাবে হত্যার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। ঢাকার সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অত্যন্ত জনাকীর্ণ ও কঠোর নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন, ২০২৬) দুপুরে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই মামলার চূড়ান্ত রায় প্রকাশ করেন। এই বিশেষ বিচারিক প্যানেলের অপর দুই সম্মানিত সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
আরও পড়ুন: রূপপুরে নতুন মহাদুর্নীতি: ২৭ কোটির বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনা হলো ২১৪ কোটি টাকায়!
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আজ সকাল থেকেই আদালত প্রাঙ্গণ ও তার আশেপাশের এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নজিরবিহীন ও ত্রিস্তর বিশিষ্ট কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। রায় ঘোষণার সুনির্দিষ্ট সময় তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা হাসানুল হক ইনুকে কঠোর পুলিশি পাহারায় ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় এনে হাজির করা হয়। আদালত সূত্রে জানা গেছে, রায় পড়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে কাঠগড়ার ভেতরে এক অন্যরকম নাটকীয় ও থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কাঠগড়ায় দাঁড়ানো অবস্থায় কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা যখন প্রথা অনুযায়ী আসামির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাঁর হাত ধরতে যান, তখন তীব্র ক্ষোভ ও অহংকারের সাথে হাসানুল হক ইনু পুলিশদের হাত সশরীরে সরিয়ে দেন এবং অত্যন্ত কর্কশ কণ্ঠে তাকে স্পর্শ করতে বা তার হাত ধরতে নিষেধ করেন। চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় এটি হলো ষষ্ঠ মামলার চূড়ান্ত রায়। দেশ-বিদেশের কোটি কোটি মানুষের প্রবল আগ্রহের কারণে এই সংবেদনশীল মামলার পুরো রায়টি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) সরাসরি লাইভ সম্প্রচার করা হয়।
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন উইং সূত্রে জানা গেছে, এই মামলার একমাত্র এজাহারনামীয় প্রধান আসামি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে নিষ্ঠুর ভূমিকা ও হত্যাকাণ্ডের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার মোট আটটি সুনির্দিষ্ট ও সুগঠিত অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে আনা হয়েছিল। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের ম্যারাথন যুক্তিতর্ক এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে বিজ্ঞ আদালত তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন যে প্রসিকিউশন পক্ষ সবকটি অভিযোগ পুরোপুরি প্রমাণ করতে না পারলেও বেশ কয়েকটি অভিযোগে ইনুর সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে। রায়ের আইনি আদেশে বলা হয়, আটটি অভিযোগের মধ্যে ১, ২, ৪, ৫ এবং ৮ নম্বর অভিযোগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ও অকাট্য প্রমাণের অভাব থাকায় আদালত তাকে ওইসব অপরাধের দায় থেকে টেকনিক্যালি খালাস প্রদান করেছেন। তবে বাকি তিনটি অভিযোগে তাঁর অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে এই ১০ বছরের দীর্ঘ কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
মামলার প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছিল, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ভারতীয় একটি প্রভাবশালী স্যাটেলাইট গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জুলাই আন্দোলনের মাঠপর্যায়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের জামায়াত, উগ্র সন্ত্রাসী এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির অ্যাখ্যা দিয়েছিলেন ইনু। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে তৎকালীন পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে সর্বোচ্চ বল প্রয়োগের উসকানি, প্ররোচনা, আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং হত্যারও পরোক্ষ নির্দেশ দেন। দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছিল, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই তৎকালীন বিতর্কিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে ১৪ দলীয় জোটের এক জরুরি নীতিনির্ধারণী সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কঠোর হস্তে দমনের জন্য বিতর্কিত ‘শুট অ্যাট সাইট’ বা দেখামাত্র গুলির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। হাসানুল হক ইনু সেই সভায় সশরীরে উপস্থিত থেকে ‘শুট অ্যাট সাইটের’ পৈশাচিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা দেশজুড়ে বাস্তবায়নে সম্মুখ থেকে নির্দেশ, প্ররোচনা, উসকানি ও রাজনৈতিক সহায়তা প্রদান করেন। আদালত এই দুটি অভিযোগের গভীরতা স্বীকার করলেও টেকনিক্যাল কারণে খালাস দেন।
তবে ট্রাইব্যুনাল মামলার তৃতীয় এবং সপ্তম অভিযোগের ক্ষেত্রে ইনুর সরাসরি অপরাধমূলক ভূমিকার প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন। তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছিল, আন্দোলন চলাকালে বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ ও ছবি দেখে আন্দোলনকারী সাধারণ ছাত্র–জনতার একটি সুনির্দিষ্ট কালো তালিকা প্রণয়ন করার এবং তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অবৈধভাবে আটক ও থানায় এনে অমানুষিক নির্যাতন করার জন্য কুষ্টিয়ার তৎকালীন পুলিশ সুপারকে (এসপি) নিজের মোবাইল ফোন থেকে সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন ইনু। চতুর্থ অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহার করা এবং আকাশপথে ছত্রীসেনা নামিয়ে সামরিক হেলিকপ্টারের মাধ্যমে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় বম্বিং বা বোমা বর্ষণের ভয়ংকর পরিকল্পনা করার অভিযোগ আনা হয়েছিল। পঞ্চম ও ষষ্ঠ অভিযোগে যথাক্রমে গণমাধ্যমে লাগাতার উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া, সরকারের গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ডকে কৌশলে আন্তর্জাতিক মহলে সমর্থন করা এবং ১৪ দলীয় জোটের সভায় উপস্থিত থেকে জামায়াতে ইসলামীকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অগ্রণী ভূমিকা পালনের বিবরণ দেওয়া হয়েছিল।
সবচেয়ে ভয়ংকর এবং রক্তক্ষয়ী অভিযোগটি ছিল মামলার অষ্টম অনুচ্ছেদে, যেখানে বলা হয়েছিল যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঠিক পূর্বমুহূর্তে কুষ্টিয়া শহরে জাসদ ও আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের প্রত্যক্ষ উসকানিতে ইউসুফ শেখ, উসামা, সুরুজ আলী, আশরাফুল ইসলাম, বাবলু ফরাজী এবং আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন নামের ছয়জন নিষ্পাপ ও অকুতোভয় আন্দোলনকারীকে ঠান্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। পাশাপাশি তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী ও জোট নেতা হিসেবে সারা দেশে ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি ছাত্র–জনতাকে গুরুতর আহত করার পেছনে তাঁর নীতিগত সিদ্ধান্তের সরাসরি দায় ছিল। আদালত সবদিক বিবেচনা করে সপ্তম অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে নিয়মিত গোপন কথা বলে চব্বিশের গণহত্যামূলক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অপরাধ এবং কুষ্টিয়ার ঘটনাপ্রবাহের সত্যতার ভিত্তিতে হাসানুল হক ইনুকে এই ঐতিহাসিক ১০ বছরের কারাদণ্ডাদেশ প্রদান করেন। এই রায়ের মাধ্যমে দেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে জাতি মুক্ত হলো বলে মনে করছেন দেশের বিশিষ্ট আইনবিদেরা।
নিউজের সূত্র: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর ডেথ রেফারেন্স সেল এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রসিকিউশন উইং।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।