প্রাকৃতিক দুর্যোগে কি দেশজুড়ে এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত? বড় সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের

প্রাকৃতিক দুর্যোগে কি দেশজুড়ে এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত? বড় সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের
ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

ঢাকা: দেশের আসন্ন উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা পরিচালনা নিয়ে শিক্ষা প্রশাসনে এক বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বর্ষা ও বন্যা মৌসুমে দেশের কোনো বড় অঞ্চলে যদি আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা আবহাওয়ার চরম বিপর্যয় ঘটে, তবে শুধু সেই নির্দিষ্ট অঞ্চলেই পরীক্ষা বন্ধ থাকবে না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সমতা রক্ষা এবং অভিন্ন মূল্যায়নের স্বার্থে প্রয়োজনে একযোগে সারা দেশেই ওই দিনের পরীক্ষা স্থগিত করা হতে পারে। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষাকে সামনে রেখে এমন একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আভাস দেওয়া হয়েছে। তবে চূড়ান্ত যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণের আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ উপ-কমিটির সাথে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে যৌথ আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সম্মানিত সভাপতি হিসেবে অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই নতুন ভাবনার কথা গণমাধ্যমকে অবহিত করেন।

দুর্যোগ ও পরীক্ষা স্থগিত নিয়ে আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের মূল পরিকল্পনা

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানান, দেশের কোনো বিশেষ বিভাগে বা বড় অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পরীক্ষা গ্রহণ অসম্ভব হয়ে পড়লে, শুধু সেই এলাকার পরীক্ষার্থীদের আলাদা প্রশ্নপত্রে পরে পরীক্ষা নেওয়ার চেয়ে সারা দেশের পরীক্ষাই সাময়িকভাবে স্থগিত রাখাকে তারা বেশি যৌক্তিক মনে করছেন।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা: এবার বাহরাইনকে চরম পরিণতির কঠোর হুঁশিয়ারি দিল ইরান

শিক্ষা বোর্ডের এই বিশেষ চিন্তাভাবনা এবং পরীক্ষা পরিচালনার কৌশলগুলো নিচে আলাদা আলাদা লাইনে পয়েন্ট আকারে সাজানো হলো:

  • সারা দেশে একযোগে স্থগিত: দেশের কোনো বড় অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে সেই নির্দিষ্ট দিনের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা সারা বাংলাদেশেই স্থগিত রাখার একটি গভীর চিন্তাভাবনা কর্তৃপক্ষের রয়েছে।

  • সম্মিলিত আলোচনা ও সিদ্ধান্ত: এই ধরনের বড় সিদ্ধান্ত হুট করে নেওয়া হবে না; বরং শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মন্ত্রী মহোদয় এবং সকল বোর্ডের কর্মকর্তাদের সাথে সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করেই চূড়ান্ত রূপরেখা নির্ধারণ করা হবে।

  • বিকল্প ভাবনার দুয়ার খোলা: দুর্যোগকবলিত নির্দিষ্ট এলাকায় পরীক্ষা স্থগিত রেখে দেশের বাকি অংশে পরীক্ষা সচল রাখা হবে নাকি টোটাল পরীক্ষা পোস্টপন্ড করা হবে—এই দুই দিকই বোর্ডের টেবিলে জমা রয়েছে।

  • পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ স্পেস: কোনো ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা বা আকস্মিক বিপর্যয়ের কারণে কোনো পরীক্ষার্থী যদি পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাতে কিছুটা দেরি করে, তবে স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাকে নমনীয়ভাবে কিছুটা স্পেস বা বাড়তি সুযোগ দিয়ে পরীক্ষা নিতে পারবে।

  • সমতা নিশ্চিতের চেষ্টা: একটি বড় বিভাগে বড় ধরনের ‘ডিজাস্টার’ বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় আসলে সম্পূর্ণ পরীক্ষাটিকে সাময়িকভাবে স্থগিত (Postpone) করে অন্য একটি নতুন তারিখে সারা দেশে পুনরায় অভিন্ন প্রশ্নে পরীক্ষার আয়োজন করাকেই বোর্ড সবচেয়ে উত্তম মনে করছে।

পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস ও সিসিটিভি-বডি ক্যামেরার কড়াকড়ি

করোনা মহামারী ও পরবর্তী রাজনৈতিক-সামাজিক নানা পরিস্থিতির দীর্ঘ পাঁচ বছর পর এবারই প্রথম সম্পূর্ণ বা পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসের (Full Syllabus) ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে সম্পূর্ণ অভিন্ন ও সমমানের প্রশ্নপত্রে এই মেগা পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।

পরীক্ষায় যেকোনো ধরনের ডিজিটাল জালিয়াতি, অসদুপায় অবলম্বন ও অনিয়ম কঠোর হস্তে দমন করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবার অভূতপূর্ব কিছু নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, যা নিচে আলাদা আলাদা লাইনে উল্লেখ করা হলো:

  • সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারি: পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও শতভাগ নিরেট পরিবেশ বজায় রাখতে দেশের প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রের ভেতরের হলরুমগুলোতে আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।

  • পুলিশের বডি ক্যামেরা: পরীক্ষা কেন্দ্রের বাইরে এবং ভেতরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হবে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের শরীরে বডি ক্যামেরা সংযুক্ত থাকবে।

  • প্রস্তুতির শতভাগ সম্পন্ন: শিক্ষা বোর্ডগুলোর পক্ষ থেকে প্রশ্নপত্র মডারেট করা, কেন্দ্রে ওএস বা ওটিপি সিস্টেম চালু করা এবং খাতা বিতরণের সমস্ত লজিস্টিক সাপোর্ট ইতিমধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের অস্বস্তি ও শিক্ষাবিদদের পরামর্শ

পরীক্ষাকেন্দ্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বডি ক্যামেরা ব্যবহারের এই নতুন ও কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়ে সাধারণ পরীক্ষার্থীদের মনে কিছুটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও মনস্তাত্ত্বিক অস্বস্তির সৃষ্টি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজধানীর এক পরীক্ষার্থী জানান, "পরীক্ষার হলে বডি ক্যামেরার মতো উন্নত প্রযুক্তির উপস্থিতি আমাদের মতো সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এক ধরনের মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে, কারণ ইতিপূর্বে আমাদের এই ধরনের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। তবে আমরা আশা করছি প্রশ্নপত্র যেন অতিরিক্ত সহজ বা অতিরিক্ত কঠিন না হয়ে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ, সুন্দর ও সাবলীল হয়।

আরও পড়ুন: লোডশেডিং সংকট কাটিয়ে স্বস্তির পথে দেশ: সংসদে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ঘাটতির হিসাব দিলেন মন্ত্রী

এদিকে দেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদেরা অভিন্ন প্রশ্নপত্রের মান ও গ্রামীণ-শহুরে শিক্ষার্থীদের মেধার ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। তাঁদের মতে, দেশের রাজধানী বা বিভাগীয় শহরের বড় বড় নামী কলেজের শিক্ষার্থীরা যে ধরনের উন্নত সুযোগ-সুবিধা ও অনলাইন ক্লাসের সুবিধা পায়, প্রত্যন্ত গ্রাম বা চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা সেই সুবিধা থেকে অনেকটাই বঞ্চিত থাকে। তাই প্রশ্নপত্র প্রণয়নের সময় শহর ও গ্রামের এই কাঠামোগত পার্থক্যের বিষয়টি মাথায় রাখা অত্যন্ত জরুরি, যাতে কোনো অবহেলিত অঞ্চলের সাধারণ শিক্ষার্থী বৈষম্যের শিকার না হয়।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের এই এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় দেশজুড়ে মোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী ফরম পূরণ করেছেন, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৯ হাজারেরও বেশি। এই বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সারা দেশে সর্বমোট ২ হাজার ৯৯৭টি অত্যাধুনিক পরীক্ষা কেন্দ্র চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রশাসনের এই ব্যাপক প্রস্তুতি সফল হলে একটি স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত পরীক্ষা উপহার দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নিউজের সূত্র: ঢাকা শিক্ষা বোর্ড, আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির প্রেস বিজ্ঞপ্তি এবং জাতীয় শিক্ষা সংবাদ ডেস্ক।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন