ঢাকা: গত কয়েকদিন ধরে দেশজুড়ে চলমান তীব্র বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও লোডশেডিং পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। যান্ত্রিক ও কারিগরি ত্রুটি এবং সমুদ্রবন্দরে কয়লা খালাসে সৃষ্ট আকস্মিক জটিলতা কাটিয়ে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা আবারও সচল হতে শুরু করেছে। ফলে দেশজুড়ে যে তীব্র লোডশেডিংয়ের চাপ তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতি হলেও দেশের কিছু কিছু এলাকায় চাহিদার তুলনায় সাময়িক বিদ্যুৎ ঘাটতি বা হালকা লোডশেডিং অব্যাহত থাকতে পারে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
আজ সোমবার (২৯ জুন, ২০২৬) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ ও বিশেষ বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এবং জাতীয় গ্রিডের সর্বশেষ উৎপাদন ও চাহিদার নিখুঁত খতিয়ান সংসদের সামনে তুলে ধরেন।
সংসদে বিদ্যুৎমন্ত্রীর বিবৃতি ও স্বস্তির বার্তা
বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সংসদে বলেন, গত রবিবারের ভয়াবহ পরিস্থিতির তুলনায় বর্তমান বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা অনেকটাই স্বাভাবিক এবং স্বস্তিদায়ক অবস্থায় ফিরে এসেছে। জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন বাড়ার কারণে ঘাটতি দ্রুত কমে আসছে এবং বিদ্যুৎ বিভাগ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: উপমহাদেশের সূর্যসন্তান আল্লামা সালমান নদভী আর নেই: লখনউয়ের হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ
সংসদে মন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদনের গাণিতিক খতিয়ান ও পরিসংখ্যান নিচে আলাদা আলাদা লাইনে পয়েন্ট আকারে সাজানো হলো:
বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি: যান্ত্রিক ত্রুটি কাটিয়ে ওঠার পর বর্তমানে দেশে জাতীয় গ্রিডে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন একলাফে বেড়ে ১৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে এসে পৌঁছেছে।
সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা: এর বিপরীতে দেশজুড়ে এই মুহূর্তে বিদ্যুতের প্রকৃত চাকা সচল রাখতে মোট চাহিদা রয়েছে ১৪ হাজার ৮৩৯ মেগাওয়াট।
ঘাটতির পরিমাণ হ্রাস: উৎপাদন ও চাহিদার এই সমীকরণ শেষে দেশজুড়ে বর্তমানে বিদ্যুতের নিট ঘাটতি বা লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ব্যাপক কমে মাত্র ৩৩৯ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে।
উত্তরণের প্রচেষ্টা: বিদ্যুৎমন্ত্রী সংসদকে আশ্বস্ত করে বলেন, "গতকালের পরিস্থিতি বেশ নাজুক ছিল, তবে আল্লাহর অশেষ রহমতে আজ আমরা সেই বড় সংকট থেকে উত্তরণ করতে পেরেছি। আমাদের লক্ষ্য এখন এই ৩৩৯ মেগাওয়াটের সামান্য ঘাটতিও দ্রুত শূন্যে নামিয়ে আনা।"
কিছু এলাকায় সাময়িক লোডশেডিংয়ের সতর্কতা
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও মন্ত্রী দেশের গ্রাহকদের বাস্তব চিত্র মনে করিয়ে দিয়ে কিছুটা সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, জাতীয় গ্রিড লাইনে সরবরাহ বাড়লেও স্থানীয় সাব-স্টেশন এবং সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতার কারণে দেশের কিছু কিছু সুনির্দিষ্ট অঞ্চলে এখনো সাময়িকভাবে হালকা লোডশেডিং বা লোড ড্রপিং হতে পারে। তবে এটি দীর্ঘস্থায়ী হবে না এবং পর্যায়ক্রমে সব এলাকাতেই নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা হবে।
আরও পড়ুন: পুনরুদ্ধার, উত্তরণ ও পুনর্গঠন: অর্থনীতিকে ৩ ধাপে সাজানোর ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের
আকস্মিক বিদ্যুৎ সংকটের নেপথ্য কারণসমূহ
এর আগে গত রবিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে দেওয়া এক বিবৃতিতে মন্ত্রী দেশজুড়ে হঠাৎ করে লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ার পেছনে মূল দুটি বড় কারিগরি ও প্রাকৃতিক কারণ ব্যাখ্যা করেছিলেন, যা নিচে আলাদা আলাদা লাইনে উল্লেখ করা হলো:
বয়লার টিউবে ছিদ্র: দেশের একটি বড় ও প্রধান বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের অন্যতম বয়লারের ভেতরের টিউবে আচমকা ছিদ্র (লিকেজ) দেখা দেওয়ায় বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সাথে সাথে বন্ধ হয়ে যায়।
কয়লা খালাসে বৈরী আবহাওয়া: বঙ্গোপসাগরে হঠাৎ গভীর নিম্নচাপ ও বৈরী আবহাওয়া সৃষ্টি হওয়ার কারণে বন্দরগুলোতে বিদেশ থেকে আসা কয়লাবাহী বড় জাহাজ থেকে কয়লা খালাস করার প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
উৎপাদনে বড় ধাক্কা: এই দুটি অনাকাঙ্ক্ষিত সংকটের কারণে আকস্মিকভাবে জাতীয় গ্রিডে প্রায় তিন হাজার (৩,০০০) মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সাময়িকভাবে থমকে গিয়েছিল, যার ফলেই দেশজুড়ে লোডশেডিংয়ের মাত্রা তীব্র আকার ধারণ করে।
আজ সোমবারের বিবৃতিতে মন্ত্রী সংসদকে স্পষ্ট করে জানান যে, প্রকৌশলীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়লারের কারিগরি ত্রুটিটি সম্পূর্ণ মেরামত করা সম্ভব হয়েছে এবং বন্দরে কয়লা খালাস কার্যক্রমও পুনরায় শুরু হয়েছে। ফলে তিন হাজার মেগাওয়াটের সেই বিশাল ঘাটতি কাটিয়ে দেশ আজ স্বাভাবিক ধারায় ফিরছে। সরকারের এই দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের ফলে সাধারণ মানুষের মাঝে বড় ধরনের স্বস্তি ফিরবে বলে মনে করছেন সংসদ সদস্যরা।
নিউজের সূত্র: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের কার্যবিবরণী ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের মিডিয়া সেল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।