উপমহাদেশের সূর্যসন্তান আল্লামা সালমান নদভী আর নেই: লখনউয়ের হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ

উপমহাদেশের সূর্যসন্তান আল্লামা সালমান নদভী আর নেই: লখনউয়ের হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ
ছবি: সংগৃহীত
 আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

লখনউ (ভারত): বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ এবং বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের ইসলামি শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার আকাশে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন প্রখ্যাত ইসলামি স্কলার, কালজয়ী বহু গ্রন্থের রচয়িতা এবং অনন্য শিক্ষক মাওলানা সৈয়দ সালমান হুসাইনি নদভী। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার এক জীবন্ত বাতিঘর নিভে যাওয়ার এই খবরে সমগ্র উপমহাদেশের আলেম সমাজ ও সাধারণ মুসলিমদের মাঝে গভীর শোক ও স্তব্ধতা নেমে এসেছে।

আজ সোমবার (২৯ জুন, ২০২৬) ভারতের উত্তর প্রদেশের লখনউ শহরের একটি নামী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে বরেণ্য ও প্রজ্ঞাবান এই আলেমের বয়স হয়েছিল আনুমানিক ৭২ বছর। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন এবং শেষ সময়ে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে ছিলেন।

আরও পড়ুন: বিদ্যুৎ বিল নিয়ে বড় ভোগান্তি: গ্রাহকদের অতিরিক্ত বিলের সুরাহায় বিদ্যুৎ বিভাগের জরুরি বার্তা

এক নজরে আল্লামা সালমান নদভীর গৌরবোজ্জ্বল জীবন

মাওলানা সৈয়দ সালমান হুসাইনি নদভী কেবল একজন প্রথাগত আলেম ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একাধারে যুগসচেতন গবেষক, বাগ্মী, সুসংগঠক এবং অসংখ্য আধুনিক ও দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বপ্নদ্রষ্টা। তাঁর গৌরবময় জীবন ও কর্মের প্রধান প্রধান দিকগুলো নিচে আলাদা আলাদা লাইনে পয়েন্ট আকারে সাজানো হলো:

  • জন্ম ও বংশ পরিচয়: বরেণ্য এই স্কলার ১৯৫৪ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের লখনউয়ের এক ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের পর থেকেই তিনি ইসলামি সংস্কৃতির এক অনন্য আবহে বেড়ে ওঠেন।

  • কোরআনে হাফেজ: জ্ঞানার্জনের শুরুর লগ্নেই তিনি লখনউয়ের বিশ্বখ্যাত বিদ্যাপীঠ ‘দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা’ থেকে অত্যন্ত সুনামের সাথে পবিত্র কোরআনুল কারিম হিফজ সম্পন্ন করেন।

  • উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন: নদওয়াতুল উলামা থেকেই তিনি ১৯৭৪ সালে কৃতিত্বের সাথে স্নাতক (গ্রাজুয়েশন) এবং পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে হাদিস শাস্ত্রের ওপর বিশেষায়িত মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন।

  • আন্তর্জাতিক শিক্ষা সফর: ভারতের শিক্ষা জীবন শেষ করে উচ্চশিক্ষার তৃষ্ণা মেটাতে তিনি সৌদি আরবে পাড়ি জমান। সেখানে ঐতিহ্যবাহী ‘ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সাউদ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়’ থেকে ১৯৮০ সালে হাদিস গবেষণায় পুনরায় উচ্চতর মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।

  • বিশ্ববিখ্যাত মেন্টর: সৌদি আরবে অবস্থানকালে তিনি সমকালীন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদিস বিশারদ ও প্রখ্যাত আলেম শেখ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহর সরাসরি তত্ত্বাবধানে থেকে ইলমে হাদিসের গভীর প্রায়োগিক জ্ঞান লাভ করেন।

কর্মজীবন ও সমাজ সংস্কারে অনন্য অবদান

সৌদি আরব থেকে শিক্ষা সমাপন শেষে মাতৃভূমি ভারতে ফিরে এসে আল্লামা সালমান নদভী নিজেকে পুরোপুরি দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে বিলিয়ে দেন। শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে তিনি অতি দ্রুত নিজের মেধা ও প্রজ্ঞার স্বাক্ষর রাখেন।

আরও পড়ুন: লক্ষ্মীপুরে একই পরিবারের ৩ জনকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা

শিক্ষা ও সমাজ বিনির্মাণে তাঁর সুদীর্ঘ কর্মজীবনের প্রধান মাইলফলকগুলো নিচে আলাদা আলাদা লাইনে বিশদভাবে উপস্থাপন করা হলো:

  • অনুষদের ডিন: তিনি দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ ইসলামি বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘দাওয়াহ ও শরিয়াহ’ অনুষদের প্রধান বা ডিন হিসেবে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।

  • কালজয়ী গ্রন্থ প্রণেতা: আরবি ও উর্দু ভাষার ওপর চমৎকার দক্ষতার অধিকারী এই আলেম ইসলামি আকিদা, মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান এবং হাদিস শাস্ত্রের সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা সম্বলিত অসংখ্য মৌলিক ও কালজয়ী গ্রন্থ রচনা করেছেন, যা বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত।

  • যুব সমাজের আইকন: তরুণ প্রজন্মকে ইসলামের সঠিক আলোয় আলোকিত করতে এবং সামাজিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করতে তিনি ‘জামিয়াত শাবাবুল ইসলাম’ নামক একটি শক্তিশালী যুব সংগঠনের সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে কাজ করেছেন।

  • প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব: তিনি ভারতের চিকিৎসা শিক্ষার অন্যতম কেন্দ্র ড. আব্দুল আলী ইউনানি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান এবং বিখ্যাত দারুল উলুম সৈয়দ আহমদ শহীদ-এর চ্যান্সেলর (উপাচার্য) হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন।

  • আধুনিক ও কারিগরি শিক্ষা: তিনি কেবল সনাতন দ্বীনি শিক্ষাই নয়, বরং ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলিমদের পিছিয়ে পড়া দূর করতে অসংখ্য আধুনিক মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট এবং তথ্যপ্রযুক্তি (IT) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন।

বিশ্বজুড়ে শোকের ছায়া ও জানাজার প্রস্তুতি

উপমহাদেশের এই জ্ঞানতাপসের আকস্মিক বিদায়ের খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শীর্ষস্থানীয় ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, আন্তর্জাতিক ইসলামি সংস্থা এবং তাঁর লাখো শিক্ষার্থীর মাঝে শোকের মাতম শুরু হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ বিবৃতি প্রকাশ করেছে।

পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, মরহুমের জানাজার নামাজ আজ সোমবার বিকেলের পর লখনউয়ের নিকটবর্তী ঐতিহাসিক উপশহর মালিহাবাদে অনুষ্ঠিত হবে। জানাজায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লাখো ভক্ত, অনুসারী এবং আলেম ওলামারা শরিক হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। মৃত্যুকালে এই প্রখ্যাত মনীষী স্ত্রী, সন্তান, পরিবার-পরিজনসহ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি গুণগ্রাহী ও ছাত্র রেখে গেছেন। তাঁর এই চলে যাওয়া উম্মাহর জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

নিউজের সূত্র: অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড এবং দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা (লখনউ) এর অফিশিয়াল মিডিয়া সেল।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন