অপরাধ ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের ইতিহাসে একক বৃহত্তম এবং সবচেয়ে ব্যয়বহুল মেগা প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শুরু থেকেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে এক বিপুল আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। দেশের জ্বালানি খাতের চেহারা বদলে দেওয়ার বিশাল স্বপ্ন নিয়ে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি পৃথক ইউনিট মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এই মহাপরিকল্পনার মূল নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে। দেশের এই গৌরবময় ও স্পর্শকাতর জাতীয় মেগা প্রকল্পের অন্তরালে একের পর এক ভয়াবহ আর্থিক কেলেঙ্কারি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা দেশের সচেতন নাগরিকদের বারবার স্তম্ভিত করে দিচ্ছে। এর আগে এই প্রকল্পের আবাসিক এলাকায় নিয়োজিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বসবাসের জন্য নির্মিত বহুতল ভবনে বালিশ ও দৈনন্দিন আসবাবপত্র কেনাকাটা এবং তা ভবনের ওপরে তোলার ক্ষেত্রে যে অবাস্তব ও কাল্পনিক খরচের চিত্র সামনে এসেছিল, তা সারা দেশে ‘বালিশ-কাণ্ড’ নামে ব্যাপক কুখ্যাতি অর্জন করে। সেই বালিশ কেলেঙ্কারির রেশ কাটতে না কাটতেই এবার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্রিন সিটি আবাসন প্রকল্পে বিদ্যুৎ সরবরাহের অত্যাবশ্যকীয় ভারী যন্ত্রপাতি ও বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের সরঞ্জাম কেনাকাটায় আরও এক নজিরবিহীন ও কল্পনাতীত মহাদুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য নথিপত্রসহ আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচিত হয়েছে।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়ের সাম্প্রতিক এক নিবিড় ও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে রূপপুর প্রকল্পের আবাসিক এলাকা তথা ‘গ্রিন সিটি’র অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা ১১টি বহুতল ভবনের জন্য প্রাক্কলিত বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের বিভিন্ন সরঞ্জাম ও জেনারেটর ক্রয়ের ক্ষেত্রে এই ভয়ংকর ও প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মটি শক্তভাবে শনাক্ত করা হয়েছে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের নির্ধারিত বাজারদর ও দাপ্তরিক খরচের প্রাক্কলনের চেয়ে ঠিকাদারদের প্রায় আট গুণ বেশি অর্থ সম্পূর্ণ অবৈধভাবে পরিশোধ করার এক অকাট্য প্রমাণ পেয়েছে নিরীক্ষা বিভাগ। সিএজির চূড়ান্ত নিরীক্ষা প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে যে সরকারের নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী যেসব অত্যাধুনিক ও ভারী যন্ত্রপাতির প্রকৃত বাজারমূল্য এবং প্রাক্কলিত দর ছিল মাত্র ২৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বা প্রায় ২৭ কোটি টাকা, সেই একই সরঞ্জামাদি ক্রয়ের অজুহাতে সরকারের কোষাগার থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিল বাবদ নির্বিচারে পরিশোধ করা হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭৭ টাকা বা প্রায় ২১৪ কোটি টাকা। এর অর্থ হলো, শুধুমাত্র ১১টি ভবনের বাহ্যিক বিদ্যুতায়নের আড়ালেই সরকারের নিশ্চিত আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে এবং জনগণের করের টাকা থেকে অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে পকেটে পোরা হয়েছে প্রায় ১৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্ধারিত রেট শিডিউল ও অনুমোদিত দাপ্তরিক প্রাক্কলনের তোয়াক্কা না করে কীভাবে এই পর্বতপ্রমাণ অর্থ লোপাট করা হলো, তা নিয়ে সিএজি কার্যালয়ের দায়িত্বশীল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা গভীর বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। নাম প্রকাশ না করার কঠোর শর্তে নিরীক্ষা বিভাগের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে দরপত্র আহ্বান ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে কার্যাদেশ প্রদান, অন্তর্বর্তীকালীন বিল অনুমোদন এবং চূড়ান্ত অর্থ খালাস করার প্রতিটি প্রশাসনিক ও আইনি ধাপেই নিয়মের চরম লঙ্ঘন করা হয়েছে। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে দুর্নীতিবাজ চক্রটি অত্যন্ত চতুরতার সাথে দরপত্রের মোট প্রাক্কলিত মূল্যটিকে মূল বাজেটের কাছাকাছি প্রদর্শন করলেও ভেতরের নির্দিষ্ট কিছু অতিপ্রয়োজনীয় পণ্যের একক মূল্য কয়েক গুণ বাড়িয়ে নিখুঁত সুপরিকল্পনায় এই বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি সাধন করেছে। এই ভয়ংকর রাষ্ট্রীয় অপরাধের প্রেক্ষিতে নিরীক্ষা বিভাগ ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট সকল অপরাধী কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক বিভাগীয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণসহ অপব্যয় ও আত্মসাৎকৃত পুরো ১৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে দ্রুততম সময়ে ফেরত আনার জন্য আইনি সুপারিশ পেশ করেছে।
নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের রূপপুর প্রকল্পের আবাসিক ভবন নির্মাণের মূল কাজগুলো আমানতভিত্তিক প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়ন করার আইনি দায়িত্ব পালন করছিল সরকারের গণপূর্ত অধিদপ্তর। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পাবনা গণপূর্ত বিভাগের তদানীন্তন নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে অনলাইন সরকারি ক্রয়পদ্ধতি তথা ই-জিপির মাধ্যমে গ্রিন সিটির ১১টি বহুতল ভবনের বাহ্যিক বিদ্যুতায়নের জন্য আনুষ্ঠানিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। এই সুনির্দিষ্ট কাজের আওতাভুক্ত বিষয়ের মধ্যে ছিল প্রতিটি ভবনের জন্য ১ হাজার ৬০০ কেভিএ ক্ষমতার উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র, বিদ্যুৎ ব্যাকআপের জন্য বিশাল জেনারেটর, স্বয়ংক্রিয় লিফট ব্যবস্থা, কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল, আধুনিক নিরাপত্তা ক্যামেরা, স্বয়ংক্রিয় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপন। তবে নিরীক্ষকেরা যখন প্রতিটি খাতের খরচের খতিয়ান নিয়ে বসেন, তখন দেখা যায় যে মূল আর্থিক লুটপাট ও নয়ছয়টি করা হয়েছে মূলত বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের মূল সরঞ্জাম এবং ব্যাকআপ জেনারেটর আমদানির আড়ালে।
আরও পড়ুন: পুনরুদ্ধার, উত্তরণ ও পুনর্গঠন: অর্থনীতিকে ৩ ধাপে সাজানোর ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের
দুর্নীতিবাজ চক্রটি এই দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সুদূরপ্রসারী কৌশল অবলম্বন করেছিল যাতে প্রথম দেখায় সাধারণ চোখে কোনো বড় অসঙ্গতি ধরা না পড়ে। নিরীক্ষকেরা দরপত্রের তুলনামূলক বিবরণী ও বিলের প্রতিটি লাইন বিশ্লেষণ করে দেখতে পান যে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের প্রধান প্রধান সরঞ্জাম ও জেনারেটরের একক দাম ঠিকাদারেরা বাজারদরের চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বাড়িয়ে ধরেছিলেন। অথচ একই দরপত্রে চোখধাঁধানো কৌশল হিসেবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসিসহ অন্যান্য কম গুরুত্বপূর্ণ কিছু সাধারণ পণ্যের দাম সরকারি দাপ্তরিক দরের চেয়ে অনেক কম দেখানো হয়েছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল যেন দরপত্রের সর্বমোট আর্থিক মূল্যটি গণপূর্তের মূল দাপ্তরিক প্রাক্কলনের তুলনায় মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য শূন্য ২ শতাংশ কম থাকে এবং এর ফলে যেন উচ্চপর্যায়ের অডিট বা তদন্তের সময় মোট খরচের হিসাবটি গ্রহণযোগ্য ও ত্রুটিমুক্ত মনে হয়। কিন্তু ভেতরের অতিপ্রয়োজনীয় এবং কারিগরি যন্ত্রাংশের একক মূল্য যে কয়েক গুণ বাড়িয়ে আকাশচুম্বী রাখা হয়েছিল, তা দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি জেনেশুনেও সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছে।
এই মহালুটাপাটের বাস্তব ভয়াবহতা বুঝতে গ্রিন সিটির ৭ নম্বর ভবনের একক খরচের খতিয়ানটি পর্যালোচনা করলেই পুরো চিত্রটি পরিষ্কার হয়ে যায়। ওই নির্দিষ্ট একটি ভবনের জন্য উচ্চ ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের ঠিকাদারি মূল্য ধরা হয়েছিল ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা, অথচ গণপূর্তের নিজস্ব নির্ধারিত দর এবং অনুমোদিত রেট শিডিউল অনুযায়ী এর প্রকৃত সর্বোচ্চ মূল্য ছিল মাত্র ১০ লাখ ৩২ হাজার টাকা। একইভাবে একটি মাত্র বিতরণ ট্রান্সফরমারের জন্য ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করা হয়েছে ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা, যার আসল সরকারি নির্ধারিত মূল্য ছিল মাত্র ৪০ লাখ ৪০ হাজার টাকা। একই ভবনে ব্যবহৃত নিম্ন ভোল্টেজের বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের জন্য খরচ দেখানো হয়েছে ৩ কোটি ২ লাখ টাকা, যেখানে এর প্রকৃত নির্ধারিত সর্বোচ্চ মূল্য ছিল মাত্র ১৬ লাখ ৩১ হাজার টাকা। এখানেই শেষ নয়, বিদ্যুতের ক্ষমতাগুণ বা পাওয়ার ফ্যাক্টর ঠিক রাখার একটি প্যানেলের দাম ধরা হয়েছিল ২ কোটি টাকা, যেখানে সরকারি হিসাবে এর মূল্য ছিল মাত্র ৯ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া জরুরি বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য দুটি ব্যাকআপ জেনারেটরের জন্য অবাস্তবভাবে বিল করা হয় ৫ কোটি sixty eight লাখ টাকা, অথচ সরকারি নির্ধারিত দরে এ দুটির মোট মূল্য ছিল মাত্র ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে যে পাঁচ ধরনের যন্ত্রপাতির জন্য একটি ভবনেই বিল করা হয়েছে ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা, সরকারি দরে সেগুলোর মোট আসল মূল্য ছিল ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, অর্থাৎ শুধুমাত্র একটি ভবন থেকেই সরকারের অতিরিক্ত ১৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এই বিশাল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ মূলত তিনটি প্রধান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং যৌথ উদ্যোগের পকেটে চলে গেছে বলে সিএজি ও গণপূর্তের নথিতে প্রমাণিত হয়েছে। নথির হিসাব অনুযায়ী, মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নামের বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানটি একাই পাঁচটি বড় ভবনের বিদ্যুতায়নের কাজ বাগিয়ে নেয় এবং কাজ শেষে প্রতিষ্ঠানটিকে বিল বাবদ পরিশোধ করা হয় প্রায় ৯২ কোটি টাকা, অথচ সরকারি আসল দরে ওইসব যন্ত্রপাতির প্রকৃত মূল্য ছিল মাত্র ১২ কোটি ২৭ লাখ টাকা, যার ফলে এই একটি প্রতিষ্ঠানকেই অতিরিক্ত দেওয়া হয়েছে ৭৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। সাজিন এন্টারপ্রাইজ নামক আরেকটি বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান চারটি ভবনের কাজ পেয়ে হাতিয়ে নিয়েছে ৮২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, যার প্রকৃত সরকারি মূল্য ছিল মাত্র ৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা এবং তাদের অতিরিক্ত লাভ দেওয়া হয়েছে ৭২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এ ছাড়া এমএসসিএল-জিকেবিপিএল নামক একটি যৌথ উদ্যোগ বা জয়েন্ট ভেঞ্চার প্রতিষ্ঠান দুটি ভবনের কাজ সম্পন্ন করে সরকারের কাছ থেকে তুলে নিয়েছে ৩৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, যার আসল মূল্য ছিল ৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা এবং তাদের অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
সরকারি ক্রয় বিধিমালা বা পিপিআর-২০০৮ এর স্পষ্ট আইন অনুযায়ী, কোনো দরদাতা যদি দরপত্রে কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের জন্য অস্বাভাবিক বা অবাস্তব বেশি দাম প্রস্তাব করে, তবে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে তার কাছ থেকে উক্ত বাড়তি দামের লিখিত ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা চাওয়ার। এমনকি কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হলে কাজ সফলভাবে শেষ করার গ্যারান্টি হিসেবে পারফরম্যান্স সিকিউরিটি বা জামানতের পরিমাণ বাড়ানোর সুপারিশ করার আইনি নিয়ম রয়েছে। কিন্তু রূপপুরের এই মেগা ক্রয়ের ক্ষেত্রে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি এমন কোনো আইনি বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের ন্যূনতম প্রয়োজন বোধ করেনি। উপরন্তু, দাপ্তরিক প্রাক্কলন নিখুঁতভাবে তৈরি করার জন্য সরকারের যে অনুমোদিত প্রাক্কলন কমিটি গঠনের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, নথিপত্রে তার কোনো প্রমাণ বা অস্তিত্ব খুঁজে পাননি নিরীক্ষকেরা। বাজারদর ও গণপূর্তের নির্ধারিত দরের তোয়াক্কা না করে মনগড়াভাবে প্রাক্কলন তৈরি করে ঠিকাদারদের বিপুল এই আর্থিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে।
নিরীক্ষা আপত্তির জবাবে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় গণপূর্ত দপ্তর অত্যন্ত দায়সারাভাবে দাবি করেছিল যে ঠিকাদারদের দেওয়া দর যেহেতু সর্বমোট দাপ্তরিক প্রাক্কলনের সীমার মধ্যেই ছিল, তাই এতে কোনো আইন লঙ্ঘন হয়নি। তবে এই খোঁড়া ও অবাস্তব ব্যাখ্যা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের উচ্চপর্যায়ের নিরীক্ষা বিভাগ। তাদের চূড়ান্ত আইনি বক্তব্য হলো, কেবল মোট দর প্রাক্কলনের মধ্যে থাকলেই সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, বরং জনস্বার্থে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ও কারিগরি পণ্যের একক মূল্য যৌক্তিক এবং বাজারদরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটি শতভাগ যাচাই করা প্রতিটি কর্মকর্তার আইনি কর্তব্য ছিল। নিরীক্ষা নথির সারসংক্ষেপ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে এই বিতর্কিত দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন রাজশাহী গণপূর্ত জোনের তৎকালীন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. নজিবর রহমান এবং সদস্যসচিব ছিলেন পাবনা গণপূর্ত বিভাগের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মাসুদুল আলম। এ ছাড়া বিলের অর্থ চূড়ান্তভাবে অনুমোদন ও পরিশোধকারী কর্মকর্তা হিসেবে নথিতে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে পাবনা গণপূর্ত বিভাগের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান খন্দকারের নাম।
এই কর্মকর্তাদের অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে রূপপুর প্রকল্পে আসবাবপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী অস্বাভাবিক দামে কেনাসংক্রান্ত পূর্ববর্তী দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুল আলমকে ২০১৯ সালেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তার করেছিল। এমনকি দুদকের তৎকালীন উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দল দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি নজিবর রহমানকেও ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সাজিন কনস্ট্রাকশনের মালিক শাহাদাত হোসেন এবং মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশনের মালিক আসিফ হোসেনকেও দেশের রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদক তখন আইনের আওতায় এনেছিল। এ ছাড়া জিকেবিপিএলের মূল অংশীদার ও বিতর্কিত ঠিকাদার জি কে শামীমকেও ওই বছরই অন্যান্য অর্থ পাচার ও ক্যাসিনো বিরোধী অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তার করে বর্তমানে কারাগারে রেখেছে। সিএজি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই দুর্নীতিগ্রস্ত মূল্যায়ন কমিটির সকল সদস্য এবং বিল অনুমোদনকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর সুপারিশ করেছে।
আরও পড়ুন: দুর্নীতি রুখতে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের প্রস্তাব সংসদে
দেশের সবচেয়ে বড় এবং সংবেদনশীল এই মেগা প্রকল্পে ১৮৭ কোটি টাকা বেশি বিল দিয়ে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনাকাটার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই পুরো ঘটনাকে একটি ক্লাসিক ‘মেগা দুর্নীতি’ হিসেবে অভিহিত করে জানিয়েছেন যে নির্ভরযোগ্য ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের ভিত্তিতে এটি এখন সূর্যালোকের মতো স্পষ্ট যে রূপপুরে সুপরিকল্পিত উপায়ে রাষ্ট্রীয় অর্থের এক ভয়ংকর মেগা লুটপাট সংগঠিত হয়েছে। তিনি অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করে বলেন যে বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রায়শই দুর্নীতিবিরোধী তীব্র রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বলা হলেও বাস্তবে দেশের মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো সুশাসন, স্বচ্ছতা বা দুর্নীতি প্রতিরোধক মজবুত পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে। আমলাতন্ত্র ও প্রকৌশলীদের একাংশের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও পারস্পরিক যোগসাজশের কারণে এই ধরনের জাতীয় অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহির আওতায় আনতে দেরি হচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তিনি সরকারকে হুঁশিয়ার করে বলেন যে যেহেতু দেশে বর্তমানে আরও অনেক মেগা প্রকল্প চলমান রয়েছে, তাই এই রূপপুর দুর্নীতির পুঙ্খানুপুঙ্খ ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি, অন্যথায় জাতীয় অর্থের এই প্রকাশ্য অপচয় ও প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাট রোধে অন্য কোনো সংস্থাকে সঠিক ও কঠোর বার্তা দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।
নিউজের সূত্র: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) বার্ষিক বিশেষ অডিট রিপোর্ট এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর প্রেস উইং।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।