ইসলামী ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
ঢাকা: অন্তহীন ও নশ্বর এই মহাবিশ্বের বুকে মানুষের ক্ষণস্থায়ী জীবনযাত্রায় কিছু কিছু কথা কেবল সাধারণ অক্ষরের সমষ্টি বা পড়ার জন্য নয়; বরং মানুষের অন্তরের গভীরতম অবচেতনে পরম অনুভূতি দিয়ে অনুভব করার জন্য সৃষ্টি হয়। মানব ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু কালজয়ী ও আধ্যাত্মিক বাণী বা উক্তি রয়েছে, যা অলস মানুষের ঘুমন্ত হৃদয়কে এক নিমেষে নাড়া দেয়, নিজের অবহেলায় করা অতীতের পর্বতপ্রমাণ গুনাহ ও অপরাধের কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় এবং পাপে নিমজ্জিত আত্মাকে পরম দয়াময় আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এক নতুন আলোর পথ ও অনুপ্রেরণা জোগায়। একজন সাচ্চা মুমিন বান্দার কোমল ও পবিত্র হৃদয় সর্বদা মহান আল্লাহর তীব্র ভয়, তাঁর প্রতি নিখাদ ভালোবাসা এবং পরকালের চূড়ান্ত জবাবদিহিতার চিন্তায় বারবার কেঁদে ওঠে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম সমাজে আত্মশুদ্ধি অর্জন ও আধ্যাত্মিক চেতনা বিকাশে দীর্ঘ সময় ধরে অনুপ্রেরণার এক অনন্য ও অফুরন্ত উৎস হিসেবে প্রচলিত থাকা তেমনই কয়েকটি অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী, মূল্যবান ও গভীর ভাবার্থপূর্ণ উক্তি ও বাণীর বিস্তারিত বিবরণ নিচে উপস্থাপিত হলো।
মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ন্যায়পরায়ণ শাসক এবং ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা আমিরুল মুমিনিন হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর একটি অত্যন্ত সুপ্রসিদ্ধ ও ঐতিহাসিক উক্তি আমাদের চিন্তার জগতকে চরমভাবে নাড়া দেয়। তিনি একবার গভীর আধ্যাত্মিক ভাবাবেগে বলেছিলেন যে, যদি কোনোদিন মহা আকাশ থেকে কোনো অদৃশ্য ফেরেশতার মাধ্যমে এই ঘোষণা জারি আসে যে পৃথিবীর সমস্ত মানুষ একসাথে জান্নাতে প্রবেশ করবে কেবল একজন হতভাগ্য ব্যক্তি ছাড়া! তবে আল্লাহর কসম, আমি ওমর নিজের গুনাহের কারণে মনে মনে এই চরম ভয় করব যে, সেই জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়া একমাত্র হতভাগ্য ব্যক্তিটি আমি নিজেই যেন না হই। ইসলামের ইতিহাসের এই মহান বীরের এমন উক্তি মূলত একজন প্রকৃত মুমিন বান্দার মনের ভেতরের চরম বিনয়, গভীর আত্মসমালোচনা এবং মহান আল্লাহর শাস্তির প্রতি তাঁর অন্তরের গভীর ভয়ের এক অনন্য ও অতুলনীয় বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।
আরও পড়ুন: ইসলামের মানদণ্ডে আসল প্রাজ্ঞ কে? জেনে নিন নবীজির (সা.) খাঁটি বুদ্ধিমানের সংজ্ঞা
ন্যায়বিচারের মূর্ত প্রতীক হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর জীবন থেকে নিঃসৃত আরেকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও গভীর ভাবার্থপূর্ণ উক্তি আমাদের আত্মশুদ্ধির পথ দেখায়। তিনি প্রায়শই আল্লাহর দরবারে মোনাজাত ও নিজের অনুভূতির কথা প্রকাশ করতে গিয়ে বলতেন যে, আমি মনে মনে এই বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাই যে আমার বাহ্যিক চোখ দুটো লোকদেখানো কান্নায় হয়তো অঝোরে কাঁদছে; কিন্তু আমার ভেতরের মূল চালিকাশক্তি তথা অবাধ্য হৃদয়টি আল্লাহর ভয়ে মোটেও কাঁদছে না। এই মহান খলিফার বাণী আমাদের খুব শক্তভাবে শিক্ষা দেয় যে, কেবল বাহ্যিক চোখের লোনা জল বা কান্নার অভিনয় কখনো মানুষের জীবনের প্রকৃত পরিবর্তন ডেকে আনে না; বরং মানুষের জীবনে প্রকৃত আধ্যাত্মিক রূপান্তর ও হেদায়েত তখনই সম্ভব হয়, যখন মানুষের ভেতরের মূল কলব বা হৃদয়টি আল্লাহর স্মরণে নরম ও বিনীত হয়ে যায়।
ইসলামী শরীয়ত ও আধ্যাত্মিক জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ও প্রখ্যাত মনীষী ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) মানুষের হৃদয়ের কঠিনতা বা পাষাণ রূপ নিয়ে একটি অত্যন্ত রূঢ় ও চিরন্তন সত্য উক্তি করেছেন। তিনি মানবজাতিকে উদ্দেশ্য করে সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন যে, চব্বিশ ঘণ্টার জীবনে কোনো একটি অন্যায় বা মহাপাপ করার পর যদি তোমার নিজের মন বা চোখে বিন্দুমাত্র অনুশোচনার পানি চলে না আসে, তবে তুমি খুব নিশ্চিতভাবে বুঝে নাও যে তোমার ভেতরের সেই জীবিত কোমল হৃদয়টি ইতোমধ্যে একটি মৃত ও শক্ত পাথরে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। কোনো গুনাহ বা পাপাচারের কাজ সংঘটিত হওয়ার সাথে সাথেই মনের ভেতরে তীব্র অশান্তি ও অনুতাপের সৃষ্টি হওয়া একজন প্রকৃত ঈমানদার মানুষের অন্যতম প্রধান ও সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ঠ্য। যে মানুষের হৃদয় নিজের করা পাপাচারের পরও বিন্দুমাত্র অশান্ত বা ব্যাকুল হয় না, তার আত্মিক ধ্বংসের জন্য এই একটি লক্ষণই যথেষ্ট এবং তার জন্য এখনই তওবা করা জরুরি।
উপমহাদেশের বিখ্যাত ও কালজয়ী উর্দু কবি মির্জা আসাদুল্লাহ খান গালিবের একটি আধ্যাত্মিক ও ভাবগম্ভীর উক্তি মানুষকে চিরন্তন এক পরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। কবি গালিব নিজের আত্মাকে শাসন করতে গিয়ে এক কবিতায় বলেছিলেন যে, হে গালিব! তুমি নিজের রবের হুকুম অমান্য করে এবং একের পর এক পাপ করে এই বিশাল পৃথিবীর বুকে পালাবার জন্য আর কোথায় যাবে? কারণ এই পায়ের নিচের মাটি কিংবা মাথার ওপরের এই অসীম নীল আকাশ— এই সমস্ত কিছুর মালিকানা ও রাজত্ব তো একমাত্র তাঁরই অর্থাৎ মহান আল্লাহর! এই গভীর দার্শনিক কথাটি মূলত সাধারণ মানুষকে প্রতি মুহূর্তে এটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, নিখিল বিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহর সুবিশাল রাজত্বের বাইরে কোনো মানুষেরই আশ্রয় নেওয়ার মতো দ্বিতীয় কোনো জায়গা নেই। তাই জীবনের যেকোনো পরিস্থিতিতে মানুষের একমাত্র আশ্রয়স্থল হলেন আল্লাহ এবং সমস্ত অপরাধের পর তাঁর কাছেই নতজানু হয়ে ক্ষমা চাইতে হবে।
পবিত্র আল-কুরআনের সুমহান শিক্ষা ও হাদিস শরিফের অকাট্য বাণীতেও এই অন্তরের কান্নার বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বিধৃত হয়েছে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সুরা আল-আনফালের ২ নম্বর আয়াতে প্রকৃত মুমিনের মূল মনস্তাত্ত্বিক পরিচয় দিতে গিয়ে অবতীর্ণ করেছেন যে,
আরও পড়ুন: জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধ: হাসানুল হক ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ড
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ
নিশ্চয়ই প্রকৃত মুমিন তো একমাত্র তারাই, যাদের সামনে মহিমান্বিত আল্লাহর পবিত্র নাম অত্যন্ত ভক্তিভরে উচ্চারণ করা হলে সাথে সাথে তাদের হৃদয় আল্লাহর ভয়ে ও ভালোবাসায় ভীত-কম্পিত হয়ে ওঠে।
এর পাশাপাশি দয়াময় আল্লাহর দরবারে তাঁর ভয়ে ঝরানো চোখের সামান্যতম অশ্রুর মর্যাদা কতখানি বেশি, তা রাসুলে কারিম (সা.)-এর বাণী থেকে স্পষ্ট জানা যায়। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর এক বিখ্যাত হাদিসে ঘোষণা করেছেন যে,
عَيْنَانِ لَا تَمَسُّهُمَا النَّارُ: عَيْنٌ بَকَتْ مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ...
দুটি বিশেষ চোখকে হাশরের ময়দানে জাহান্নামের উত্তপ্ত আগুন কখনো স্পর্শ করতে পারবে না— তার মধ্যে প্রথমটি হলো সেই সৌভাগ্যবান চোখ, যা দুনিয়ার জীবনে একাকী আল্লাহর গভীর ভয়ে ও অনুশোচনায় অশ্রু ঝরায়। এই মহামূল্যবান বাণীটি বিখ্যাত হাদিস গ্রন্থ জামে আত-তিরমিজির ১৬৩৯ নম্বর পাতায় সংকলিত আছে।
পাশাপাশি আল্লাহ তাআলা নিজের বান্দার তওবাকে কতটা ভালোবাসেন, তা প্রকাশ করে সুরা আল-বাকারার ২২২ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেছেন যে,
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ নিজের ভুল স্বীকার করে বারবার তওবাকারী বান্দাদের মনেপ্রাণে ভালোবাসেন এবং যারা সর্বদা বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা অর্জন করে, তাদেরও তিনি অত্যন্ত ভালোবাসেন।
একটি মানুষের ভেতরের আত্মিক সৌন্দর্যের সবচেয়ে বড় বহিঃপ্রকাশ ঘটে তখনই, যখন সে কোনো ভুল বা গুনাহ করার পর অহংকার না করে আল্লাহর দরবারে সম্পূর্ণ নতজানু হয়ে অনুতপ্ত হয় এবং চোখের পানি ফেলে নিজের ভুল সংশোধন করে। চোখের অশ্রু আল্লাহর দরবারে তখনই অত্যন্ত মূল্যবান মুক্তোর মতো মর্যাদা পায়, যখন তা হৃদয়ের গভীরতম অনুশোচনা ও খাঁটি তওবা থেকে উৎসারিত হয়। তাই আসুন, প্রতিদিন রাতের অন্ধকারে নিজের অন্তরকে একবার এই প্রশ্ন করি যে, আমার এই গুনাহগার হৃদয় কি এখনো আল্লাহর পবিত্র স্মরণে বিনীত ও নরম হয়? যদি আপনার উত্তর হ্যাঁ হয়, তবে বুঝে নেবেন সেটি আপনার ওপর আল্লাহর এক অশেষ রহমতের বড় নিদর্শন। আর যদি তা না হয়, তবে আজই খাঁটি তওবার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার এটাই হতে পারে আপনার জীবনের সবচেয়ে মহিমান্বিত ও উত্তম সময়।
নিউজের সূত্র: পবিত্র আল-কুরআনের তাফসিরে ইবনে কাসির, সুনানে ইবনে মাজাহ ও জামে আত-তিরমিজির হাদিস অধ্যায় এবং মনীষী ইবনুল কাইয়্যিমের কিতাবুয যুহদ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।