যশোরে স্বামীর মৃত্যুর পর সম্পত্তির বিরোধে সত্তর বছরের মাকে বাড়ি থেকে তাড়াল ছেলেরা

যশোরে স্বামীর মৃত্যুর পর সম্পত্তির বিরোধে সত্তর বছরের মাকে বাড়ি থেকে তাড়াল ছেলেরা
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

বাংলাদেশের সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় যে কতটা ভয়াবহ পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে, তার প্রমাণ প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশের নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা থেকে স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায়। যে পিতা-মাতা তিল তিল করে নিজেদের সমস্ত জীবন উৎসর্গ করে সন্তানকে মানুষ করেন, জীবনের শেষ অন্তিম মুহূর্তে এসে সেই জন্মদাতা বাবা-মায়ের কপালেই যখন পৈশাচিক নির্যাতন কিংবা চরম অবহেলা জোটে, তখন তা পুরো সমাজ ব্যবস্থার মুখে এক নির্মম উপহাসের রূপ নেয়। বিশেষ করে সম্পত্তির লোভে অন্ধ হয়ে আপন ভাইয়ে ভাইয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া এবং সেই দ্বন্দ্বের জেরে অসহায় বৃদ্ধা মাকে ঘরছাড়া করার মতো নৃশংস ঘটনাগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের শামيل। নৈতিকতার চরম পতনের ফলে আধুনিক যুগে এসে পারিবারিক সম্পর্কের এই শীতলতা এবং নিষ্ঠুরতা সমাজকে এক চরম অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা সচেতন নাগরিকদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলছে। রক্তের সম্পর্ককে তুচ্ছ করে পার্থিব সম্পত্তির মোহে মানুষ যেভাবে পশুর চেয়েও অধম হয়ে উঠছে, তা কোনোভাবেই সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না এবং এর বিরুদ্ধে কঠোর সামাজিক ও আইনি প্রতিরোধ গড়ে তোলা সময়ের দাবি।

আরও পড়ুন: ঢাবিতে পড়ুয়া দুই মেধাবী বোনের পড়াশোনার খরচে খাদ্যমন্ত্রীর মানবিক সহায়তা

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এবং স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে প্রাপ্ত অত্যন্ত হৃদয়বিদারক তথ্যানুযায়ী, সম্প্রতি যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার একটি প্রত্যন্ত জনপদে এই অমানবিক ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছে। পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং সম্পত্তির লোভের এই নির্মম শিকার হয়েছেন প্রায় সত্তর বছর বয়সী এক নিঃস্ব ও অসহায় বৃদ্ধা মা, যা পুরো এলাক জুজুড়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় তুলেছে। গত সপ্তাহের ছাব্বিশ আগস্ট বুধবারের দিকে ভুক্তভোগী ওই বৃদ্ধা মা নিরুপায় হয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ কার্যালয়ে গিয়ে নিজের সন্তানদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে বাধ্য হয়েছেন। এর মাত্র কিছুদিন পূর্বে অর্থাৎ গত সপ্তাহের সোমবারের দিকে ওই বৃদ্ধার স্বামী খালেক মান নামের এক ব্যক্তি বার্ধক্যজনিত কারণে বা অন্য কোনো কারণে মৃত্যুবরণ করেন। স্বামীর মৃত্যুর মতো শোকে যখন পুরো পরিবার ও ঘর জুড়ে কান্নার রোল পড়ার কথা ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে শুরু হয় সম্পত্তি নিজের দখলে নেওয়ার এক নগ্ন প্রতিযোগিতা। মৃত স্বামীর জানাজা বা সৎকারের পবিত্র আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার আগেই তার রেখে যাওয়া স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি নিজেদের নামে লিখে নেওয়ার লোভে মত্ত হয়ে ওঠেন দুই সন্তান।

নিহত খালেক মানের দুই পুত্র মাহবুবুর রহমান এবং আসাবুলের মধ্যকার এই সম্পত্তির লোভ এমন এক চরম হিংসাত্মক রূপ ধারণ করে যে তারা নিজেদের বাবার নিথর মরদেহের সামনেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হন। পরিবারের প্রবীণ সদস্যের মরদেহ ঘরে রেখে দুই ভাইয়ের মধ্যকার এই অমানবিক ও পৈশাচিক মারামারির দৃশ্য দেখে প্রতিবেশীরাও স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন এবং তারা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান। দুই ভাইয়ের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে উভয় পক্ষের লোকজন ছাড়াও তাদের নিজ নিজ স্ত্রী ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও সক্রিয়ভাবে অংশ নেন, যার ফলে পরিস্থিতি আরও বেশি ভয়ংকর হয়ে ওঠে। ভাইয়ে ভাইয়ে এবং পুত্রবধূদের মধ্যকার এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ফলে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন মারাত্মকভাবে আহত হন এবং তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখমের সৃষ্টি হয়। স্বামীর মৃত্যুর শোকের পাশাপাশি চোখের সামনে নিজের সন্তানদের এই পশুবৃত্তিমূলক আচরণ এবং রক্তপাত দেখে ওই বৃদ্ধা মা মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিলেন। স্থানীয় সাধারণ মানুষ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে এসে রক্তাক্ত অবস্থায় আহতদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য স্থানীয় হাসপাতালে দ্রুত প্রেরণ করেছিলেন, যা সাময়িকভাবে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করেছিল।

আরও পড়ুন: বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবি: বরগুনার পাথরঘাটায় ৫ জেলের মরদেহ উদ্ধার

হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা শেষ করে বাড়ি ফিরে আসার পরই ওই অসহায় বৃদ্ধা মায়ের জীবনে নেমে আসে আরও বড় এক পৈশাচিক ও অমানবিক দুর্ভাগ্যের কালো ছায়া। ছোট ছেলে এবং তার স্ত্রী চিকিৎসালয় থেকে বাড়িতে পা রাখার পরপরই কোনো ধরনের মানবিকতা প্রদর্শন না করে উল্টো ওই বৃদ্ধা মা নুরজাহান বেগমকে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে। সম্পত্তির বন্টন নিয়ে তাদের মনে যে ক্ষোভ ও লোভ কাজ করছিল, তার সমস্ত রাগ তারা গিয়ে ঝাড়েন ওই নিঃস্ব ও শোকাহত মায়ের ওপর এবং তাকে জোরপূর্বক ঘর থেকে তাড়িয়ে দেন। জীবনের এই অন্তিম মুহূর্তে এসে নিজের মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু হারিয়ে বৃদ্ধা নুরজাহান বেগম চরম মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হন এবং কান্নায় ভেঙে পড়েন। নিজের পেটের সন্তানের এমন অমানবিক আচরণ সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তিনি ওই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন এবং নিরুপায় হয়ে স্থানীয় এক মেয়ের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। সন্তানের হাতে চরম অবমূল্যায়িত ও নির্যাতিত হওয়ার এই মর্মান্তিক কাহিনী চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে।

কোথাও কোনো বিচার না পেয়ে শেষ পর্যন্ত গত বুধবার বৃদ্ধা মা নুরজাহান বেগম নিজেই বাদী হয়ে তার দুই ছেলে ও পুত্রবধূদের বিরুদ্ধে কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে নড়েচড়ে বসে এবং ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রক্রিয়া শুরু করে দেয়। কেশবপুর উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে এই লিখিত অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ নিশ্চিত করেছেন এবং খুব শীঘ্রই আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে একজন অসহায় ও বৃদ্ধা মায়ের সঙ্গে যে চরম অন্যায় করা হয়েছে, তার সঠিক বিচার নিশ্চিত করা হবে। আইনি সহায়তার মাধ্যমে ওই মাকে তার নিজের বাড়ি ফিরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধী সন্তানদের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে প্রশাসন থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের এমন সময়োপযোগী ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরে পেয়েছেন ওই নির্যাতিতা বৃদ্ধা এবং সচেতন এলাকাবাসী।

পরিশেষে বলা যায় যে, যশোর জেলার কেশবপুরে সম্পত্তির লোভে বাবার লাশ রেখে ভাইদের মারামারি এবং পরবর্তীতে ৭০ বছর বয়সী মাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার এই ঘটনাটি সমাজের পচে যাওয়া রূপের বহিঃপ্রকাশ। পার্থিব সম্পত্তির মোহে মানুষ আজ এতটাই অন্ধ হয়ে গেছে যে তারা জন্মদাতা মা-বাবার ন্যূনতম সম্মানটুকু রক্ষা করতেও কুন্ঠাবোধ করছে না। আমরা এই অমানবিক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই এবং দোষী সন্তানদের কঠোর শাস্তি দাবি করি, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর সাহস কেউ না পায়। প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বৃদ্ধা মা নুরজাহান বেগম যেন তার ন্যায্য অধিকার ফিরে পান এবং নিরাপদে বাকি জীবন কাটাতে পারেন—এটাই আজকের দিনে সকলেরকান্ত প্রত্যাশা।

প্রতিবেদনের সূত্র: উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রতিনিধি।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন