প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের সড়ক মহাসড়কগুলোতে প্রতিদিন যে পরিমাণ প্রাণহানি ঘটছে, তা যেন এক চিরস্থায়ী অভিশাপে পরিণত হয়েছে এবং এর কারণে অসংখ্য পরিবার প্রতিদিন সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছে। বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, চালকদের অদক্ষতা এবং ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা না করার মানসিকতার কারণে আমাদের দেশের জনবহুল সড়কগুলো প্রতিনিয়ত রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে। প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে কোনো না কোনো চালকের চরম মাত্রার দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, যার খেসারত দিতে হয় সম্পূর্ণ নিরপরাধ পথচারী ও সাধারণ যাত্রীদের। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাইপাস সড়কগুলোতে দূরপাল্লার বাসগুলোর অসুস্থ প্রতিযোগিতার ফলে প্রায়শই এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে যা গোটা জাতিকে স্তব্ধ ও শোকাভিভূত করে তোলে। প্রিয়জন হারানোর এই অন্তহীন বেদনা এবং কান্নার রোল কোনো কিছুর বিনিময়েই আর পূরণ হওয়ার নয়, তবুও প্রতিদিন নতুন নতুন জীবনের অপমৃত্যু আমাদের সমাজকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি এবং চালকদের কঠোর শাস্তির বিধান নিশ্চিত করা না হলে এই মরণঘাতী সড়ক দুর্ঘটনা কমানো কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।
আরও পড়ুন: নেত্রকোনায় ভিডিও ফাঁসের ভয় দেখিয়ে কিশোরীকে চার বছর ধরে নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্ত গ্রেপ্তার
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এবং স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন সূত্রে প্রাপ্ত অত্যন্ত মর্মান্তিক তথ্যানুযায়ী, চলতি সপ্তাহের গত ছাব্বিশ আগস্ট বুধবারের সকালের দিকে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল। ঝিনাইদহ জেলার কেন্দ্রীয় শহর সংলগ্ন অত্যন্ত ব্যস্ততম একটি এলাকা হিসেবে পরিচিত ভুটিয়ারগাতী এলাকার বাইপাস সড়কটিতে এই রক্তক্ষয়ী দুর্ঘটনা ঘটে। ওই দিন সকালে প্রতিদিনের সাধারণ সময়ের মতো সাধারণ পথচারীদের মতো চলাফেরা করছিলেন একটি দাম্পত্য যুগল, যাদের মধ্যে ছিলেন ছাব্বিশ-সাতাশ বছর বয়সী তরুণী জান্নাতুল ফেরদৌস তুলি। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্বামী সোহেল কাজী, যিনি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পবিত্র দায়িত্বে নিয়োজিত একজন গর্বিত এবং কর্তব্যপরায়ণ সেনাসদস্য হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ঝিনাইদহ শহরের ওই বাইপাস সড়কটি পারাপার হওয়ার সময় বা অন্য কোনো কাজে সেখানে অবস্থান করার মুহূর্তে পেছন থেকে মৃত্যুদূত হয়ে ছুটে আসে একটি যাত্রীবাহী বাস। দূরপাল্লার ওই বাসটির বেপরোয়া গতি এবং চালকের চরম অসাবধানতার কারণে মুহূর্তের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর ওপর দিয়ে গাড়িটি চালিয়ে দেওয়া হয়, যার ফলে সেখানে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, গড়াই পরিবহনের ওই যাত্রীবাহী বাসটির প্রচণ্ড গতির কারণে চালক আর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেননি এবং সরাসরি ওই দম্পতির ওপর গাড়ি তুলে দেন। বাসের সামনের অংশের শক্তিশালী ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই করুণ মৃত্যুর শিকার হন সেনাসদস্যের সহধর্মিণী জান্নাতুল ফেরদৌস তুলি, যার দেহটি সড়কে লুটিয়ে পড়ে। চোখের সামনে নিজের প্রিয় স্ত্রীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু এবং নিজের গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া সব মিলিয়ে সেনাসদস্য সোহেল কাজীর জীবনও তখন চরম সংকটের মুখে পতিত হয়। মুহূর্তের মধ্যে পুরো সড়ক রক্তে ভেসে যায় এবং আশপাশের স্থানীয় লোকজন ও পথচারীরা এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে দৌড়ে এসে উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসেন। ঘাতক বাসটি মুহূর্তের মধ্যে সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করলেও স্থানীয় জনতা ও উপস্থিত সাধারণ মানুষ অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে গাড়িটিকে আটক করার চেষ্টা চালান। ঘটনার তীব্রতা এবং আকস্মিকতায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে এবং দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে এসে এই বেদনাদায়ক ঘটনার দৃশ্য দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।
আরও পড়ুন: খুলনায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও চিকিৎসাসেবা পরিদর্শনে মহানগর বিএনপি নেতৃবৃন্দ
খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় থানা পুলিশ এবং হাইওয়ে পুলিশের যৌথ একটি দল অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পুলিশ সদস্যরা দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে ঘাতক সেই গড়াই পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসটিকে জব্দ করেন এবং নিজেদের হেফাজতে নিয়ে আসেন, তবে চালক বা তার সহকারীরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা নিহত গৃহবধূ জান্নাতুল ফেরদৌস তুলির মরদেহ উদ্ধার করে আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে মর্গে পাঠানো হয়। অন্যদিকে, মারাত্মকভাবে জখম ও রক্তাক্ত অবস্থায় সেনাসদস্য সোহেল কাজীকে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা হয়। কিন্তু তাঁর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে যাওয়ায় চিকিৎসকরা তাঁকে সেখানে রাখা নিরাপদ মনে করেননি এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত রেফার করেন। পরবর্তী সময়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে যশোর জেলার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল বা সিএমএইচে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে চিকিৎসকরা তাঁকে বাঁচিয়ে তোলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালান।
কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে যশোর সিএমএইচের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় পরবর্তীতে সেনাসদস্য সোহেল কাজীও না ফেরার দেশে চলে যান এবং তাঁর মৃত্যুর সংবাদ এসে পৌঁছায়। স্বামী ও স্ত্রীর এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক প্রয়াণে তাদের পরিবার এবং আত্মীয়স্বজনের মাঝে কান্নার রোল পড়ে যায়, যা পুরো পরিবেশকে ভারী করে তুলেছিল। একজন দেশের সেবায় নিয়োজিত সেনাসদস্য ও তাঁর স্ত্রীর এমন করুণ মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তাদের সহকর্মী এবং এলাকার শোকার্ত সাধারণ মানুষ। পুলিশ জানিয়েছে যে এই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনায় নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং ঘাতক বাসের চালককে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। আইন অমান্যকারী এই চালকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে সড়কে বিশৃঙ্খলা কমানো সম্ভব হবে না বলে সচেতন মহল ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
পরিশেষে বলা যায় যে, ঝিনাইদহ শহরের বাইপাস সড়কে বাসচাপায় সেনা সদস্য স্বামী ও তাঁর স্ত্রীর এই মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের সড়ক নিরাপত্তার কঙ্কালসার চিত্রটিই পুনরায় উন্মোচন করেছে। চালকদের বেপরোয়া মনোভাব এবং ট্রাফিক আইনের অবহেলার কারণে আজ একটি সম্ভাবনাময় ও গোছানো পরিবার নিমেষেই ধ্বংস হয়ে গেল। আমরা এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনায় নিহত স্বামী ও স্ত্রীর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। দেশের প্রতিটি সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষা করার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক—এটাই আজকের দিনে আমাদের সকলেরকান্ত প্রত্যাশা।
প্রতিবেদনের সূত্র: হাইওয়ে পুলিশ ও স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।