প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রধান বিভাগীয় শহর এবং শিল্পনগরী হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত খুলনার অভ্যন্তরীণ জনপদে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার নিরাপত্তা বিধান করা এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সমূলে উৎপাটন করার লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বদা অত্যন্ত তৎপর ও সজাগ রয়েছে। একটি আধুনিক ও জনবহুল মহানগরীর নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে সুসংহত রাখতে এবং অপরাধীদের নিরাপদ আস্তানাগুলো গুঁড়িয়ে দিয়ে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত বিরতিতে বিশেষ গোয়েন্দা অভিযান পরিচালনা করা একটি অপরিহার্য জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের সার্বিক দিকনির্দেশনা ও কঠোর নজরদারির মাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে পরিচালিত এমনই একটি অত্যন্ত সফল, সুদূরপ্রসারী ও ধারাবাহিক বিশেষ আভিযানিক কার্যক্রমের মাধ্যমে পুরো মহানগর এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ও অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী সাফল্য অর্জিত হয়েছে, যা স্থানীয় নাগরিকদের মাঝে ব্যাপক স্বস্তি ও নিরাপত্তার অনুভূতি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। অপরাধের আখড়া হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়ে পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করার এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়া নগরবাসীর মধ্যে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে এবং আইন অমান্যকারীদের মনে এক কঠোর ভীতি সঞ্চার করেছে।
আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে নজরুল বর্ষ ২০২৬-২৭ উদযাপন উপলক্ষে প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত
ঘটনার সম্পূর্ণ পটভূমি এবং খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) সূত্রে প্রাপ্ত দাপ্তরিক ও অনুসন্ধানী তথ্যাবলি থেকে জানা যায় যে, ক্যালেন্ডারের পাতা অনুযায়ী গত ১৭ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের বিকেলে এই বিশেষ সফল অভিযানটি পরিচালিত হয়েছিল। খুলনার অপরাধ জগতের এক সুপরিচিত ও ত্রাস সৃষ্টিকারী নাম শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেনেড বাবুর অন্যতম প্রধান সহযোগী হিসেবে পরিচিত মো. আসাদুজ্জামান মিঠু (৪৫)-কে ধরতে গোয়েন্দা বিভাগ অত্যন্ত নিখুঁত পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এর কিছুদিন পূর্বে খুলনার অত্যন্ত ব্যস্ততম এলাকা জাতিসংঘ পার্কের পশ্চিম পাশে একজন পেশাদার সাংবাদিক এবং সদর থানা বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদকের ওপর অত্যন্ত কাপুরুষোচিতভাবে প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণের একটি লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছিল। ওই ঘটনার পর থেকেই পুরো এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক মহলে চরম ক্ষোভের পাশাপাশি উৎকণ্ঠা বিরাজ করতে থাকে। উক্ত গুলিবর্ষণের চাঞ্চল্যকর ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে দায়েরকৃত নিয়মিত মামলার অন্যতম পলাতক ও সন্ধিগ্ধ আসামি হিসেবে মো. আসাদুজ্জামান মিঠুকে গ্রেপ্তার করার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের গোয়েন্দা নজরদারি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর অবশেষে সাফল্য অর্জিত হয়।
অভিযান পরিচালনার নেপথ্য কৌশল সম্পর্কে পুলিশ বিভাগ সূত্রে আরও জানা যায় যে, অত্যন্ত চতুর ও পলায়নপর প্রকৃতির অপরাধী মো. আসাদুজ্জামান মিঠু দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপন করে বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল। তবে প্রযুক্তিগত সহায়তা, তথ্য-প্রযুক্তির নিখুঁত ব্যবহার এবং গোয়েন্দা বিভাগের কাছে থাকা গোপন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে ওই দিন বিকেলে সে খালিশপুর থানাধীন নতুন রাস্তার মোড় এলাকায় অবস্থান করছে। এই সুনির্দিষ্ট গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কেএমপির গোয়েন্দা দলের চৌকস সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে অত্যন্ত সুকৌশলে ওই এলাকায় ছদ্মবেশে অবস্থান নেন এবং চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে তাকে আটক করতে সক্ষম হন। নতুন রাস্তার মোড় এলাকা থেকে গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নানা তথ্য উদঘাটনের জন্য পুলিশ ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে এবং তাকে অত্যন্ত সুরক্ষিত পাহারায় থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। প্রকাশ্য রাজপথে সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতার ওপর গুলিবর্ষণের মতো একটি গুরুতর অপরাধের সাথে সরাসরি যুক্ত থাকার অভিযোগে তার এই গ্রেপ্তার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে এক বিরাট মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আরও পড়ুন: গাজা যুদ্ধবিরতি নিয়ে কায়রো সফরে হামাস প্রধান খলিল আল-হাইয়া
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও পুলিশ রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে জানা গেছে যে, গ্রেপ্তারকৃত মো. আসাদুজ্জামান মিঠু সাধারণ কোনো অপরাধী নয়, বরং সে খুলনার দুর্ধর্ষ শীর্ষ সন্ত্রাসী ও অপরাধ জগতের গডফাদার হিসেবে পরিচিত 'গ্রেনেড বাবু'-র অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও সক্রিয় সহযোগী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। গ্রেনেড বাবুর অপরাধ সিন্ডিকেটের নানা ধরনের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, অস্ত্রের চোরাচালান এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো অপকর্মগুলোতে মিঠু সরাসরি অংশগ্রহণ করত বলে গোয়েন্দা সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, গ্রেপ্তারকৃত মিঠুর বিরুদ্ধে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) বিভিন্ন থানায় পূর্বে দায়েরকৃত একাধিক গুরুতর অপরাধের মামলা রয়েছে, যার মধ্যে অবৈধ অস্ত্র বহন, বিস্ফোরক দ্রব্য আইন লঙ্ঘন, রাষ্ট্রবিরোধী নাশকতা এবং সহিংস অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একের পর এক অপরাধের সাথে যুক্ত থাকার পরেও এতদিন ধরে সে আইনকে ফাঁকি দিয়ে কীভাবে লুকিয়ে ছিল এবং তার সাথে আর কারা কারা জড়িত রয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বের করার জন্য পুলিশ রিমান্ডের আবেদনসহ অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিকভাবে আরও জানানো হয়েছে যে, গ্রেপ্তারকৃত মো. আসাদুজ্জামান মিঠুর বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সকল দাপ্তরিক প্রক্রিয়া ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হচ্ছে, যাতে সে তার অপরাধের জন্য উপযুক্ত ও কঠোর আইনি শাস্তির মুখোমুখি হয়। খুলনার সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধান এবং অপরাধ জগতের নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ফেলার জন্য কেএমপির গোয়েন্দা বিভাগ ও অন্যান্য ইউনিটগুলো বর্তমানে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। কোনো সন্ত্রাসী বা অপরাধী যত প্রভাবশালী চক্রেরই হোক না কেন, আইনের হাত থেকে যে কেউ রেহাই পাবে না—এই সফল গ্রেপ্তারের মাধ্যমে প্রশাসন আবারও তা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় প্রমাণ করে দিয়েছে। অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করে নগরীতে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশের এই ধরনের কঠোর ও ধারাবাহিক অভিযান ভবিষ্যতেও অবিরাম গতিতে অব্যাহত থাকবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, খুলনায় সাংবাদিক ও বিএনপি নেতার ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনার সাথে জড়িত শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেনেড বাবুর সহযোগী মো. আসাদুজ্জামান মিঠুর এই গ্রেপ্তার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারিত্ব এবং দক্ষতার এক উজ্জ্বল নিদর্শন। অপরাধীদের যতই আড়াল করার চেষ্টা করা হোক না কেন, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে তাদের ঠিকই আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সম্ভব, এই ঘটনাটি তারই বাস্তব প্রমাণ। আমরা আশা করি, এই মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নেপথ্যের সকল অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হবে এবং খুলনার সাধারণ মানুষ এক নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরে পাবে। সবার সম্মিলিত সচেতনতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধই একটি অপরাধমুক্ত সমাজ বিনির্মাণের প্রধান শর্ত হিসেবে কাজ করবে।
সূত্র: খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) মিডিয়া সেল ও গোয়েন্দা শাখা প্রেস নোট।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।