গাজা যুদ্ধবিরতি নিয়ে কায়রো সফরে হামাস প্রধান খলিল আল-হাইয়া

গাজা যুদ্ধবিরতি নিয়ে কায়রো সফরে হামাস প্রধান খলিল আল-হাইয়া
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত নিরসন এবং অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় দীর্ঘ প্রতীক্ষিত একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াকে বেগবান করার উদ্দেশ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান এবং প্রধান মুলামূল আলোচনাকারী হিসেবে শীর্ষ দায়িত্ব গ্রহণের পর এই প্রথমবারের মতো ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সফরে মিশরের রাজধানী কায়রো অভিমুখে যাত্রা করেছেন প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা খলিল আল-হাইয়া। বর্তমান ১৬ই আগস্ট ২০২৬ তারিখে মিসরের গোয়েন্দা প্রধানের সাথে সরাসরি উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হওয়ার সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি রয়েছে তাঁর। এই সফরের মূল লক্ষ্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর সাথে চলমান আলোচনার নতুন ও ফলপ্রসূ মোড় উন্মোচন করা, যার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে চলা অবর্ণনীয় মানবিক দুর্ভোগের অবসান ঘটিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে বলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জে শিক্ষককে ঘিরে ধরে টাকা ছিনতাই, হাতেনাতে ১ ছিনতাইকারী আটক

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের মতে, হামাসের প্রধান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণের পরবর্তীতে খলিল আল-হাইয়ার এই মিসর সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল। গাজার ওপর চলমান সামরিক আগ্রাসন ও অবরুদ্ধ পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজতে মিসরের গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফর্মুলা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হবে। বিশেষ করে কায়রো বৈঠকের মাধ্যমে মধ্যস্থতাকারীদের প্রস্তাবিত রূপরেখাগুলোকে কীভাবে বাস্তবে রূপ দেওয়া যায় এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়, সে বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি করাই এই বৈঠকের প্রধান এজেন্ডা। মিসর বরাবরই ফিলিস্তিন সংকটের সমাধানে মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে এবং বর্তমান এই কঠিন পরিস্থিতিতে কায়রোর ভূমিকা আরও বেশি জোরালো হয়েছে।

আরও পড়ুন: ফতুল্লায় অস্ত্র ও গুলিসহ দুই সন্ত্রাসী গ্রেফতার, গুলিবর্ষণে পুলিশ আহত

অন্য একটি কূটনৈতিক ফ্রন্টে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের সুনির্দিষ্ট মধ্যস্থতাকরণ প্রয়াস। গাজা সংকটের স্থায়ী ও কার্যকর সমাধানকল্পে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইতিপূর্বে প্রণয়নকৃত বহুল আলোচিত ১৫ দফা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বাস্তবসম্মত পথ ও কৌশল অন্বেষণ করতে খুব শীঘ্রই আগামী সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্য সফরে আসছেন হোয়াইট হাউসের বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার। তাঁর এই পরিকল্পিত সফরের অংশ হিসেবে ইসরায়েল এবং মিসর উভয় রাষ্ট্রেই উচ্চপর্যায়ের ধারাবাহিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। মার্কিন এই বিশেষ দূতের মধ্যপ্রাচ্য সফর যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়ার স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন কোনো কূটনৈতিক মোড় আনতে পারে কি না, সেদিকেই এখন তীক্ষ্ণ নজর রাখছে বিশ্ব রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলো।

তবে মার্কিন শান্তি উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপের মাঝেও আঞ্চলিক বাস্তবতায় বড় ধরনের মতবিরোধ ও রাজনৈতিক জটিলতা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রস্তাবিত এই ১৫ দফা শান্তি পরিকল্পনা বা রূপরেখার প্রতি নিজেদের আনুষ্ঠানিক অসন্তোষ ও আপত্তি প্রকাশ করে তা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলি প্রশাসনের এই কঠোর অনড় অবস্থানের পরেও ফিলিস্তিনের পক্ষে হামাস অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে, তারা এই শান্তি চুক্তির রূপরেখার সাথে নীতিগতভাবে সম্পূর্ণ সম্মত রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক চুক্তি মানতে এবং যুদ্ধবিরতিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মার্কিন প্রশাসন ও আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর কার্যকর ও কঠোর কূটনৈতিক চাপের অপেক্ষায় রয়েছে হামাসের নীতিনির্ধারকরা।

কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলের এই বহুমুখী তৎপরতা এবং শান্তি আলোচনার নানামুখী দৌড়ঝাঁপের পরেও অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার অভ্যন্তরীণ ময়দানে ইসরায়েলি বাহিনীর সামরিক আগ্রাসন ও নির্বিচারে বিমান ও স্থল হামলা বিন্দুমাত্র হ্রাস পায়নি, বরং তা অত্যন্ত নির্মমভাবে অব্যাহত রয়েছে। গত বছরের শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত দীর্ঘ এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে গাজায় ফিলিস্তিনিদের মর্মান্তিক নিহতের সংখ্যা ইতোমধ্যেই ৭৩ হাজার ৩০০ জনের বিশাল গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। অবরুদ্ধ এই জনপদে প্রতিনিয়ত ঝরে যাওয়া হাজার হাজার সাধারণ মানুষের প্রাণ এবং পঙ্গুত্ববরণকারী লাখো মানুষের আর্তনাদ সমগ্র বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিলেও কাঙ্ক্ষিত স্থায়ী শান্তি এখনো অধরা রয়ে গেছে। খলিল আল-হাইয়ার এই কায়রো সফর এবং মার্কিন দূতের আসন্ন মধ্যপ্রাচ্য সফর যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার সাধারণ মানুষের জীবনে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

সূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ও মধ্যপ্রাচ্য কূটনৈতিক উইং।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন