প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি এবং গ্রামীণ জনপদের উৎপাদনশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে রাসায়নিক সারের গুরুত্ব অপরিসীম ও অপরিহার্য। বোরো, আমু কিংবা অন্যান্য মৌসুমী ফসল উৎপাদনের জন্য সঠিক সময়ে জমিতে ইউরিয়া সার প্রয়োগ করা কৃষকদের জন্য জীবন-মরণের মতো এক জরুরি বিষয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সার বিতরণের দায়িত্বে থাকা কিছু অসাধু ও মুনাফালোভী ডিলারের নানা ধরনের টালবাহানা, কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং কালোবাজারে সার বিক্রির প্রবণতার কারণে কৃষকদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। সম্প্রতি দেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী একটি জনবহুল ও কৃষিপ্রধান জেলা কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলা এলাকায় এমনই এক অভূতপূর্ব, চাঞ্চল্যকর ও উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যা সার সংকটের তীব্রতাকে জনসমক্ষে উন্মোচন করেছে। সঠিক সময়ে নির্ধারিত মূল্যে ও পরিমাণে সার না পেয়ে চরমভাবে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠা দুই শতাধিক প্রান্তিক কৃষক একত্রিত হয়ে একজন সরকারি অনুমোদিত সারের ডিলারের গুদাম বা গোডাউনের শক্ত তালা ও দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং সেখান থেকে শত শত বস্তা ইউরিয়া সার নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে চলে যান।
আরও পড়ুন: নরসিংদীর মনোহরদীতে বাড়িতে ঢুকে অটোরিকশাচালক যুবককে কুপিয়ে হত্যা
ঘটনার বিস্তৃত বিবরণ এবং স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই অভাবনীয় ও নাটকীয় ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল কুড়িগ্রাম জেলার ভূরুঙ্গামারী উপজেলার অন্তর্গত দূরবর্তী ও সীমান্তবর্তী শিলখুড়ি নামক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়নে। ওই ইউনিয়নের স্থানীয় কৃষকদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল যে, সরকারিভাবে পর্যাপ্ত পরিমাণে সারের বরাদ্দ পাওয়া সত্ত্বেও ডিলাররা তা সঠিক সময়ে কৃষকদের মাঝে স্বচ্ছতার সঙ্গে বিতরণ না করে নানা অজুহাতে কালক্ষেপণ করেন। এই নির্দিষ্ট এলাকার শাহ আমানত ট্রেডার্স নামক একটি সার বিতরণ পয়েন্টের লাইসেন্সধারী বা স্বত্বাধিকারী ছিলেন তাইফুর রহমান মুকুল নামক একজন ডিলার, যিনি ওই অঞ্চলের কৃষকদের সারের চাহিদা মেটানোর মূল দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ওই ডিলারের অনুকূলে মোট এক হাজার তিনশত কুড়ি বস্তা ইউরিয়া সার বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছিল, যাতে এলাকার কৃষকরা কোনো ধরনের দুর্ভোগ ছাড়াই তাদের প্রয়োজনীয় জমিতে সার ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু ডিলারের গুদাম বা গোডাউন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা যায় যে, বরাদ্দকৃত সেই বিশাল পরিমাণের বিপরীতে বাস্তবে গুদামের ভেতরে মাত্র তিনশত চল্লিশ বস্তা ইউরিয়া সার মজুদ রাখা হয়েছিল, যা নিয়ে কৃষকদের মনে আগে থেকেই চরম সন্দেহ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল।
সারের তীব্র প্রয়োজন এবং জমিতে সময়মতো সার ছিটাতে না পারার চরম উৎকণ্ঠার কারণে গত রোববার সকালের দিকে দুই শতাধিক সাধারণ ও বিক্ষুব্ধ কৃষক সংঘবদ্ধ হয়ে ওই ডিলারের নির্দিষ্ট পয়েন্টে এসে ভিড় জমায়। তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ জমির পরিমাণ অনুযায়ী সার কেনার জন্য প্রয়োজনীয় নগদ টাকা সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন এবং ডিলারের গুদাম খোলার অপেক্ষায় দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত হতাশাজনক বিষয় হলো, সকাল গড়িয়ে দুপুরের কাছাকাছি সময় হয়ে এলেও ডিলার বা তার কোনো প্রতিনিধি গোডাউনের প্রধান দরজা খুলে দেওয়ার কোনো নাম নিচ্ছিলেন না এবং নানা ধরনের অজুহাত দেখিয়ে কৃষকদের সঙ্গে টালবাহানা শুরু করেন। কৃষকরা যখন জানতে পারেন যে তাদের উৎপাদিত ফসলের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সেই ইউরিয়া সার মজুদের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম এবং ডিলার তা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন, তখন তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। টাকা সঙ্গে থাকার পরেও এবং দিনের পর দিন লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও ডিলারের অসহযোগিতামূলক আচরণ ও টালবাহানার কারণে বিক্ষুব্ধ কৃষকরা চরমভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
আরও পড়ুন: রামুতে চলন্ত এসি বাসে আকস্মিক আগুন, স্থানীয়দের সাহসিকতায় প্রাণে বাঁচলেন ৩০ যাত্রী
সকল নিয়মনীতি ও ধৈর্যের সব সীমা অতিক্রম করে অবশেষে গত রোববার সকালের দিকে, ঘড়ির কাঁটায় যখন প্রায় এগারোটা বাজছিল, তখন ক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত কৃষকরা ডিলারের গোডাউনের সামনের দিকে চড়াও হন। তারা কোনো ধরনের বাধা বা হুশিয়ারি তোয়াক্কা না করে সম্মিলিতভাবে সেই গোডাউনের মূল দরজা ও তালা ভেঙে একেবারে জোরপূর্বক ভেতরে প্রবেশ করতে বাধ্য হন। গোডাউনের ভেতরে প্রবেশ করার পর কৃষকরা দেখতে পান যে সেখানে তাদের চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত সামান্য সার রয়েছে এবং ডিলারের কারসাজি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায় করতে এবং জমির ফসল রক্ষা করার তাগিদে বিক্ষুব্ধ কৃষকরা গোডাউনে থাকা ৫০ কেজি ওজনের ঠিক একশত সাতানব্বই বস্তা ইউরিয়া সার সেখান থেকে নিজেদের দায়িত্বে বের করে নিয়ে আসেন। হিসাব করলে দেখা যায় যে, কৃষকদের এভাবেই জোর করে নিয়ে যাওয়া মোট সারের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় নয় হাজার আটশত পঞ্চাশ কেজি, যা ওজনের দিক থেকে প্রায় দশ টন ইউরিয়া সারের সমান। সার সংকটের দায়ে জর্জরিত হয়ে প্রান্তিক কৃষকদের এভাবে নিজেদের উদ্যোগে গোডাউন ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি মুহূর্তের মধ্যে পুরো অঞ্চলের মানুষকে হতবাক করে দেয়।
কৃষকদের এমন আকস্মিক ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশের পর শিলখুড়ি ইউনিয়ন এবং এর আশপাশের এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং বিষয়টি দ্রুত উপজেলা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দৃষ্টিগোচর হয়। সার ডিলারের এই ধরনের অনিয়ম এবং কৃষকদের গুদাম ভাঙচুরের সংবাদ পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য তৎপর হয়ে ওঠেন। স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে যে, তারা দীর্ঘদিন ধরে সার পাওয়ার জন্য ডিলারের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিকার পাননি, বরং ডিলার কৃত্রিম সংকট তৈরি করে চড়া দামে বাইরে সার বিক্রি করার গোপন ফন্দি এঁটেছিলেন। কৃষকরা জানিয়েছেন যে, তারা কোনো বেআইনি কাজ করার উদ্দেশ্যে গোডাউন ভাঙেননি, বরং বাধ্য হয়ে তাদের জীবিকা ও পেটের ভাত জোগানের একমাত্র মাধ্যম ফসলি জমি বাঁচানোর জন্যই এই চরম পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছেন। ডিলার তাইফুর রহমান মুকুলের এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ এবং সারের কৃত্রিম সংকট তৈরির বিষয়টি এখন পুরো উপজেলায় আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষ ওই ডিলারের লাইসেন্স বাতিলের জোরালো দাবি তুলেছেন।
ঘটনার পর থেকেই ভূরুঙ্গামারী উপজেলা প্রশাসন এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। ডিলারের গুদামে সরকারের দেওয়া বরাদ্দকৃত সারের সঠিক হিসাব কোথায় গেল এবং বাকি সারগুলো কোথায় সরিয়ে ফেলা হলো, সে বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তারা ডিলারের প্রতিনিধিদের জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কৃষকদের মাঝে সার বিতরণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান অনিয়মগুলো দূর করার জন্য এবং ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। সরকারের কৃষি ভর্তুকি এবং ডিলারদের মাধ্যমে সাধারণ কৃষকদের কাছে ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছানোর যে মহৎ উদ্যোগ রয়েছে, তা কিছু অসাধু ব্যক্তির দুর্নীতির কারণে যেভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তা নিয়ে সচেতন মহল তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কুড়িগ্রামের এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, কৃষকদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে তারা নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য কতটা দৃঢ় অবস্থান নিতে পারেন।
পরিশেষে বলা যায় যে, কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নে ডিলারের গোডাউন ভেঙে কৃষকদের প্রায় দশ হাজার কেজি সার নিয়ে যাওয়ার এই ঘটনাটি দেশের সার বিতরণ ব্যবস্থাপনার এক করুণ চিত্র উন্মোচন করেছে। কৃষকের মুখের হাসি কেড়ে নিয়ে যারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মুনাফা লুটতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিকভাবে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। কৃষকদের সার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে এবং ডিলারদের সিন্ডিকেট চিরতরে ভেঙে ফেলতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে আরও অনেক বেশি কঠোর ও নজরদারিতে থাকতে হবে। আমরা আশা করি দ্রুত সঠিক তদন্তের মাধ্যমে এই ঘটনার পেছনের আসল সত্য উদঘাটিত হবে এবং কৃষকরা ভবিষ্যতে কোনো রকম হয়রানি ছাড়াই তাদের ন্যায্য মূল্যে পর্যাপ্ত সার পাওয়ার পূর্ণ নিশ্চয়তা লাভ করবেন।
প্রতিবেদনের সূত্র: স্থানীয় কৃষক সমাজ ও ইউনিয়ন প্রতিনিধি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।