রামুতে চলন্ত এসি বাসে আকস্মিক আগুন, স্থানীয়দের সাহসিকতায় প্রাণে বাঁচলেন ৩০ যাত্রী

রামুতে চলন্ত এসি বাসে আকস্মিক আগুন, স্থানীয়দের সাহসিকতায় প্রাণে বাঁচলেন ৩০ যাত্রী
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

সড়ক পরিবহন খাতে একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভঙ্গুর চিত্র আরও একবার স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হলো দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের একটি মর্মান্তিক ও রোমহর্ষক ঘটনার মধ্য দিয়ে। পর্যটন নগরী কক্সবাজার থেকে রাতের আঁধারে রাজধানী ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা একটি বিলাসবহুল এসি বাসে চলন্ত অবস্থায় হঠাৎ করে আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। প্রায় ৩০ জন সাধারণ যাত্রীকে বহনকারী এই বাসটি যখন কক্সবাজারের রামু উপজেলার জনবহুল এলাকা অতিক্রম করছিল, ঠিক তখনই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এই ভয়াবহ বিপদের মুখোমুখি হয় গাড়িটি। তবে স্থানীয় সাধারণ মানুষের চরম সাহসিকতা, বুদ্ধিমত্তা এবং তাৎক্ষণিক উদ্ধার তৎপরতার কারণে শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের প্রাণহানি বা মর্মান্তিক কোনো ট্রাজেডি থেকে অলৌকিকভাবে রক্ষা পেয়েছেন বাসের ভেতরে থাকা নারী, শিশুসহ অন্তত ত্রিশজন যাত্রী। গভীর রাতের এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ও থমথমে পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল।

আরও পড়ুন: সীতাকুণ্ডে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাস লিকে দশ শ্রমিকের মৃত্যু, তদন্তে উঠে এল কারণ

ঘটনার বিবরণ দিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী যাত্রীরা জানান যে, গত শুক্রবার দিবাগত রাত আনুমানিক ১টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ বা মহাসড়কের রামু উপজেলার কলঘর বাজারের ঠিক পশ্চিম পাশে অবস্থিত এন আলম ফিলিং স্টেশনের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর পরই বাসটির ভেতর থেকে অস্বাভাবিক ধোঁয়া ও গন্ধ বের হতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে সেই ধোঁয়া পুরো এসি বাসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেবিনের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং যাত্রীদের মাঝে তীব্র শ্বাসকষ্ট ও ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়। চলন্ত গাড়ির ভেতর এ ধরনের আকস্মিক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় যাত্রীরা চরম মাত্রায় ঘাবড়ে যান। বিশেষ করে আধুনিক এসি বাসগুলোর স্বয়ংক্রিয় কাচ ও দরজা আটকে যাওয়ার কারণে এবং ভেতরে তীব্র ধোঁয়া জমে যাওয়ায় যাত্রীরা নিজ উদ্যোগে দরজা খুলে বাইরে বের হওয়ার কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। মুহূর্তের মধ্যে বাসের ভেতরে কান্নাকাটি এবং বাঁচাও বাঁচাও আর্তনাদ শুরু হয়ে যায়, যা যেকোনো বড় ধরনের বড় বিপর্যয়ের পূর্বলক্ষণ ছিল।

ঠিক সেই মুহূর্তে ফিলিং স্টেশন সংলগ্ন এলাকার স্থানীয় কিছু সচেতন ও সাহসী মানুষ সড়কের ওপর বিকট শব্দ এবং বাসের ভেতর থেকে ধোঁয়া নির্গত হওয়ার বিষয়টি লক্ষ্য করেন। মুহূর্তের কালক্ষেপণ না করে তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দ্রুত ছুটে আসেন ওই চলন্ত বাসের কাছাকাছি। এসি বাসটির দরজা ভেতর থেকে অবরুদ্ধ থাকায় এবং চালক বা তার সহকারীর কোনো খোঁজ না পাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের হাতের কাছে থাকা লোহা ও শক্ত বস্তু দিয়ে বাসের জানാലার কাচ সজোরে ভাঙতে শুরু করেন। কাচ ভেঙে একে একে আটকে পড়া আতঙ্কিত যাত্রীদের নিরাপদে টেনেহিঁচড়ে বাইরে বের করে আনা হয়। বাসের একজন ভুক্তভোগী যাত্রী মোহাম্মদ রানা ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে জানান যে, তিনি তার পরিবারের সাতজন সদস্যসহ দীর্ঘ ছুটি কাটিয়ে কক্সবাজার ভ্রমণ শেষে অত্যন্ত আনন্দিত মনে ঢাকায় ফিরছিলেন। কিন্তু মাঝপথে এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কবলে পড়ে তাদের পরিবারসহ সবাই মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন। তিনি আরও ক্ষোভের সঙ্গে জানান যে, আগুন ও ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ার অত্যন্ত সংকটময় মুহূর্তে বাসের চালক বা তার কোনো সহকারীকে তারা আশেপাশে দেখতে পাননি, যা চরম দায়িত্বহীনতার বহিঃপ্রকাশ।

আরও পড়ুন: নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে চার জুট গুদাম ও তিন ইজিবাইক গ্যারেজ পুড়ে ছাই

এই রোমহর্ষক ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রামু হাইওয়ে থানা পুলিশের একটি চৌকস দল অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে মাত্র দশ মিনিটের ব্যবধানে ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হয় এবং উদ্ধারকাজে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেয়। রামু হাইওয়ে থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত সার্জেন্ট পারভেজ গণমাধ্যমকে জানান যে, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ বাহিনী দ্রুততম সময়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং উদ্ধারকৃত যাত্রীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় সাহসী জনতা নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার কাজ শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিনির্বাপক দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে সম্পূর্ণভাবে আগুন নিভিয়ে ফেল এবং বাসটি নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা এবং স্থানীয়দের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতায় বড় ধরনের প্রাণহানির হাত থেকে রক্ষা পায় পুরো যাত্রীবাহী বাসটি।

এই অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে রামু ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের স্টেশন অফিসার মো. আবদুল কাদের চৌধুরী গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি জানান যে, প্রাথমিক তদন্ত এবং ঘটনাস্থলের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ধারণা করা হচ্ছে যে, বাসের যান্ত্রিক কোনো ত্রুটি কিংবা ইঞ্জিনের অতিরিক্ত তাপ উৎপাদনের ফলেই এই আকস্মিক আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। দীর্ঘপথ একটানা যাত্রার কারণে এসি বাসের অতিরিক্ত ইলেকট্রনিক্স লোড এবং যান্ত্রিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এমন দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন। তবে এ বিষয়ে আরও সুনির্দিষ্ট এবং প্রযুক্তিগত কারণ অনুসন্ধানের জন্য ফায়ার সার্ভিস এবং মোটর বিশেষজ্ঞ দল কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সৌভাগ্যবশত এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বাসের কোনো যাত্রীর বড় ধরনের শারীরিক আঘাত বা প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি, যা এক বিরাট স্বস্তির বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পরিশেষে বলা যায় যে, এই মর্মান্তিক ঘটনাটি আমাদের দেশের দূরপাল্লার বাস ও পরিবহন ব্যবস্থার সামগ্রিক নিরাপত্তা মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। দীর্ঘপথ ভ্রমণের পূর্বে প্রতিটি গাড়ির ফিটনেস, এসি সিস্টেম, ইঞ্জিন এবং যান্ত্রিক ত্রুটিগুলো কঠোরভাবে পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। চালক ও সহকর্মীদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এবং যাত্রীদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলে পালিয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি বন্ধে পরিবহন মালিক সমিতি ও প্রশাসনকে আরও কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে রামু এলাকার স্থানীয় সাধারণ মানুষের মানবিক ও সাহসী ভূমিকা আবারও প্রমাণ করেছে যে, সংকটের মুহূর্তে সচেতন জনতাই সবচেয়ে বড় ভরসা। ভবিষ্যতে এ ধরনের মারাত্মক দুর্ঘটনা এড়াতে পরিবহন খাতের প্রতিটি স্তরে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি।

প্রতিবেদনের সূত্র: স্থানীয় সংবাদ ও ফায়ার সার্ভিস প্রতিবেদন।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন