সীতাকুণ্ডে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাস লিকে দশ শ্রমিকের মৃত্যু, তদন্তে উঠে এল কারণ

সীতাকুণ্ডে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাস লিকে দশ শ্রমিকের মৃত্যু, তদন্তে উঠে এল কারণ
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাস লিকের ঘটনায় মোট দশজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে সংঘটিত এই দুর্ঘটনার প্রাথমিক কারণ হিসেবে ব্যালাস্টের পানিতে দ্রবীভূত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস মুক্ত হওয়াকে চিহ্নিত করেছে বুয়েটের একটি বিশেষজ্ঞ দল।

গত চৌদ্দ আগস্ট এমটি রাসি নামের একটি পুরোনো এলএনজি জাহাজের ট্যাংকে পানি নিষ্কাশনের সময় এই দুর্ঘটনা ঘটে। তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, বিষাক্ত গ্যাসের ঘনত্ব নিরাপদ সীমার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ছিল। এই ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের সব ধরনের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।

ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের এগারো সদস্যের কমিটিসহ মোট তিনটি পৃথক তদন্ত কমিটি কাজ করছে। শ্রমিক সংগঠনগুলো তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছে, যথাযথ সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়া শ্রমিকদের ট্যাংকে নামানোর কারণেই এই মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে। এমনকি নিরাপত্তা ঘাটতির কারণে এই কারখানার বিরুদ্ধে আগে থেকেই শ্রম আদালতে মামলা চলমান ছিল।

আরও পড়ুন: কুষ্টিয়ায় বিয়ের রাতে স্ট্যান্ড ফ্যান পড়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে নববরের মৃত্যু

শিপব্রেকিং শিল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তা একটি দীর্ঘদিনের আলোচিত বিষয়। এ ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটলে শ্রমিকদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাব এবং নিরাপত্তা বিধি না মানার কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দলের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নমুনা সংগ্রহ করেছেন এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন। তাদের রিপোর্টের ভিত্তিতেই তদন্ত কমিটিগুলো কাজ করছে।

শ্রমিক সংগঠনগুলো দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। তারা বলেছেন, শ্রমিকদের জীবন রক্ষার জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে কাজ করা শ্রমিকরা বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকির মধ্যে কাজ করেন। বিষাক্ত গ্যাস, ভারী যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য বিপদ তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়া কাজ করানো আইনত নিষিদ্ধ। এই ঘটনায় সেই বিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।

তদন্ত কমিটিগুলো ঘটনার সকল দিক খতিয়ে দেখছে। তারা শ্রমিকদের সাক্ষ্য, ইয়ার্ডের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং জাহাজের অবস্থা পর্যালোচনা করছেন। তদন্ত শেষে প্রকৃত কারণ এবং দায়িত্ব নির্ধারণ করা হবে।

এই দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাদের ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের বিষয়টি সরকারিভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। শ্রমিক সংগঠনগুলোও পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের কমিটিসহ অন্যান্য তদন্ত কমিটি দ্রুত রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ পেয়েছে। তদন্তের স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জে জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে চুরি যাওয়া মোটরসাইকেল উদ্ধার করল পুলিশ

শিপব্রেকিং শিল্পে নিরাপত্তা মান উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ এবং নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে এ ধরনের দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব।

শ্রমিকদের সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা এবং প্রশিক্ষণ প্রদানের বিষয়টি জোরালোভাবে উঠে এসেছে। এ ধরনের ব্যবস্থা থাকলে প্রাণহানি এড়ানো যেত বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

ঘটনার পর ইয়ার্ডের কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কার্যক্রম শুরু না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

স্থানীয় প্রশাসন এবং শ্রম অধিদপ্তর ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে। তারা তদন্তে সহযোগিতা করছেন এবং শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছেন।

এই দুর্ঘটনা শিপব্রেকিং শিল্পে নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা আবারও তুলে ধরেছে। শ্রমিকদের জীবন রক্ষায় সকল পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

আগামী দিনগুলোতে তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ পাবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

সূত্র: বুয়েট তদন্ত দল ও শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্র।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন