প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ও জনবহুল জনপদ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত সিরাজগঞ্জ জেলার অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন এলাকায় উন্নয়নের ছোঁয়া লাগার পাশাপাশি প্রায়শই অসতর্কতা ও সুরক্ষার অভাবজনিত কারণে নানা ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে থাকে, যা গোটা সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। একটি আধুনিক ও দ্রুত বর্ধনশীল জনপদের নিয়মিত কর্মমুখর পরিবেশে নির্মাণাধীন বিভিন্ন ভবনে কাজ করার সময় দিনমজুর ও শ্রমিকদের পেশাগত নিরাপত্তার বিষয়টি সবসময় অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অগ্রাধিকারমূলক একটি জাতীয় ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। সিরাজগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলা এলাকার সার্বিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি যখন সর্বস্তরে জোরালো হয়ে উঠছে, ঠিক তখনই জেলার অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ শাহজাদপুর পৌর শহর এলাকায় ঘটে যাওয়া একটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও স্বজনদের চোখের জল ফেলিয়েছে। নির্মাণকাজের সাথে জড়িত একজন খেটে খাওয়া সাধারণ শ্রমিকের এই আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যু পুরো এলাকায় এক গভীর শোকের ছায়া নামিয়ে এনেছে।
আরও পড়ুন: ৯৯৯ এ কল করে মহাখালী থেকে চুরি হওয়া বাস রাজধানী, বেড়িবাঁধ থেকে উদ্ধার, গ্রেপ্তার ২
ঘটনার সম্পূর্ণ পটভূমি এবং স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের সূত্রে প্রাপ্ত বিস্তারিত তথ্যাবলি থেকে জানা যায় যে, ক্যালেন্ডারের পাতা অনুযায়ী গত ১৮ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের মঙ্গলবার বিকেলে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল। ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল প্রায় চারটা বাজে (বিকাল ৪ টার দিকে), ঠিক সেই মুহূর্তে শাহজাদপুর পৌর শহরের অত্যন্ত পরিচিত ও ব্যস্ততম একটি বাণিজ্যিক ও আবাসিক পয়েন্ট হিসেবে খ্যাত দারিয়াপুর এলাকার ঢাকা ব্যাংকের ঠিক পাশে অবস্থিত একটি বহুতল নির্মাণাধীন ভবনে দৈনন্দিন কাজের অংশ হিসেবে নির্মাণ শ্রমিকেরা অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছিলেন। প্রতিদিনের মতো পেটের টানে ঘাম ঝরানো পরিশ্রম করতে আসা এই শ্রমিকেরা ভবনটির বিভিন্ন ফ্লোরে অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে নিজেদের দায়িত্ব পালন করছিলেন, যেখানে সামান্য একটু অসাবধানতা বা সুরক্ষার ঘাটতি যে কত বড় সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে, এই মর্মান্তিক ঘটনাটি তারই এক নির্মম ও নিষ্ঠুর বাস্তব উদাহরণ হয়ে রইল।
নিহত হওয়া দুর্ভাগা নির্মাণ শ্রমিকের সুনির্দিষ্ট পরিচয় ও পারিবারিক পটভূমি সম্পর্কে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায় যে, তাঁর নাম মহরম আহমদ আলী (৩৫)। তাঁর সম্মানিত পিতার নাম আজ্জল মিয়া এবং তাঁদের পারিবারিক স্থায়ী ঠিকানা ছিল সিরাজগঞ্জ জেলার ঐতিহ্যবাহী শাহজাদপুর উপজেলার অন্তর্গত পোতাজিয়া ইউনিয়নের অধীনস্থ শান্ত ও সুনিবিড় ভিটাপাড়া গ্রাম এলাকায়। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হিসেবে জীবিকার অন্বেষণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করে নিজের সংসার চালিয়ে আসছিলেন। ঘটনার দিন বিকেলে উক্ত নির্মাণাধীন ভবনের দ্বিতীয় তলার ফ্লোরে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত মনোযোগের সাথে অন্যান্য সহকর্মীদের সাথে কাজ করার সময় হঠাৎ করেই এক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির শিকার হন তিনি। কাজের ব্যস্ততার মাঝে কোনো এক মুহূর্তে অসতর্ক অবস্থায় তিনি মারাত্মকভাবে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং মুহূর্তের মধ্যে তাঁর পুরো শরীর অসাড় হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।
আরও পড়ুন: গাজা যুদ্ধবিরতি নিয়ে কায়রো সফরে হামাস প্রধান খলিল আল-হাইয়া
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা ও স্থানীয় লোকজনের বিবরণে জানা যায় যে, দ্বিতীয় তলার ফ্লোরে কাজ করার সময় তীব্র বৈদ্যুতিক শক খাওয়ার সাথে সাথেই শ্রমিক মহরম আহমদ মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিচে ফ্লোরের ওপর ছিটকে পড়ে যান। তাঁর আকস্মিক এমন করুণ অবস্থা দেখে সাথে থাকা অন্য দুই জন সহকর্মী ও মিস্ত্রি তাৎক্ষণিকভাবে নিজেদের কাজের সমস্ত ব্যস্ততা ফেলে দ্রুত ছুটে আসেন এবং অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে নিচে নামিয়ে নিয়ে আসেন। ততক্ষণে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার কারণে তাঁর শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর আঘাতের সৃষ্টি হয় এবং তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। এই অপ্রত্যাশিত আকস্মিক দুর্ঘটনায় নির্মাণাধীন ভবন চত্বরে কর্মরত অন্যান্য শ্রমিক ও আশপাশের লোকজনের মাঝে চরম আতঙ্ক ও হুলস্থুল কাণ্ড বেজে ওঠে, এবং দ্রুত তাকে বাঁচানোর জন্য স্থানীয়দের সাহায্য প্রার্থনা করা হয়।
আহত ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া শ্রমিককে দ্রুত বাঁচানোর উদ্দেশ্যে স্থানীয় মানবিক মানুষজনের স্বতঃস্ফূর্ত সহায়তা, নির্মাণাধীন ভবনের মালিকপক্ষ এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত অন্যান্য শ্রমিকেরা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে একটি জরুরি উদ্ধার তৎপরতা পরিচালনা করেন। মুমূর্ষু ও অচেতন অবস্থায় মহরম আহমদকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে শাহজাদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রেরণের জন্য একটি দ্রুতগামী যানবাহনে তোলা হয়। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত অভিজ্ঞ চিকিৎসকেরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তাঁর শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন এবং হৃদস্পন্দন ও অন্যান্য লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানান যে হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই তিনি এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত ঘোষণা করার সাথে সাথেই হাসপাতালে উপস্থিত স্বজনদের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে এবং এক মর্মান্তিক শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
একজন খেটে খাওয়া কর্মজীবী মানুষের এমন আকস্মিক ও করুণ মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই তাঁর নিজ এলাকা পোতাজিয়া ইউনিয়নের ভিটাপাড়া গ্রামসহ পুরো শাহজাদপুর পৌর এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। নিহতের পরিবার, আত্মীয়-স্বজন এবং পাড়া-প্রতিবেশীরা এই মর্মান্তিক ঘটনাটি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না, কারণ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটির এই বিদায় তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দিয়েছে। নির্মাণাধীন ভবনগুলোতে কাজের সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম বা সেফটি গিয়ার ব্যবহার না করার ফলে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে বলে সচেতন মহল মনে করছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্মাণাধীন ভবনগুলোতে আরও কঠোর নজরদারি এবং বৈদ্যুতিক লাইন স্থাপনকালে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো মায়ের বুক এভাবে খালি না হয়।
পরিশেষে বলা যায়, শাহজাদপুর পৌর শহরের দারিয়াপুর এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে শ্রমিক মহরম আহমদ আলীর এই প্রাণহানির ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা কতটা জরুরি। সামান্য একটু অসাবধানতা ও সুরক্ষার অভাব একটি তাজা প্রাণ কেড়ে নিতে পারে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি তিনি যেন মরহুমের বিদেহী আত্মাকে শান্তি দান করেন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের এই অপূরণীয় ক্ষতি সহ্য করার ধৈর্য ও শক্তি দান করেন। সবার সম্মিলিত সচেতনতা এবং কর্মক্ষেত্রে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমেই কেবল এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হতে পারে।
সূত্র: স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী, স্বজন ও সংবাদাতা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।