প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের সড়ক মহাসড়কগুলোতে প্রতিদিন বেড়েই চলা মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এবং এর ফলে নিরীহ মানুষের প্রাণহানি যেন এক নিত্যদিনের করুণ চিত্রে পরিণত হয়েছে। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াতের সময় অসতর্কতা, বেপরোয়া গতি এবং ট্রাফিক নিয়মের চরম অবহেলার কারণে মুহূর্তের মধ্যে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে শত শত প্রাণ ও হাজারো পরিবারের সোনালী স্বপ্ন। সম্প্রতি সিলেট জেলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ওসমানীনগর উপজেলার অধীনস্থ ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণগ্রাম নামক কৌশলগত এলাকায় ঘটিত অত্যন্ত হৃদয়বিদারক একটি সড়ক দুর্ঘটনা পুরো দেশবাসীকে নতুন করে গভীর শোক ও উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। একটি দ্রুতগামী তেলবাহী ভারী লরির সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি যাত্রীবাহী সিএনজিচালিত অটোরিকশার অত্যন্ত ভয়াবহ মুখোমুখি সংঘর্ষের এই ঘটনায় ঘটনাস্থলেই এক মর্মান্তিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং মুহূর্তের মধ্যে ঝরে গেছে চারটি তাজা প্রাণ। এই আকস্মিক ও মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় কেবল চারজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে তাই নয়, বরং আরও বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন, যা সড়ক নিরাপত্তার ভঙ্গুর অবস্থাকে আবারও অত্যন্ত নির্মমভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
আরও পড়ুন: রংপুরের তরুণদের তৈরি দেশীয় সোশ্যাল মিডিয়া ‘ফ্রিডার’ এর অভাবনীয় সাফল্য ও বর্তমান সংকট
দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় এলাকাবাসী ও পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত শনিবার দুপুরের দিকে যখন প্রখর রোদে মহাসড়কের ওপর দিয়ে বিভিন্ন যানবাহন দ্রুতগতিতে চলাচল করছিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই এই অপ্রীতিকর ঘটনাটি সংঘটিত হয়। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণগ্রাম এলাকার ব্যস্ততম একটি বাঁক বা খোলা অংশে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি তেলবাহী বিশাল লরির সঙ্গে যাত্রীবাহী সিএনজিচালিত অটোরিকশার অত্যন্ত সজোরে মুখোমুখি ধাক্কা লাগে। তেলবাহী লরিটির চালকের অতিরিক্ত গতি এবং গাড়িটি নিয়ন্ত্রণে রাখার অক্ষমতার কারণে এই দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়নি বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে ধারণা করা হচ্ছে। সংঘর্ষের তীব্রতা এতটাই প্রচণ্ড ছিল যে, যাত্রীবাহী সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি চোখের পলকে সম্পূর্ণ দুমড়েমুচড়ে একেবারে অকেজো ও পিন্ডাকারে পরিণত হয়। অটোরিকশার ভেতরে বসা সাধারণ যাত্রীরা মুহূর্তের মধ্যে লোহার কাঠামোর নিচে বন্দি হয়ে পড়েন এবং তাদের আর্তনাদে চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। ব্যস্ততম এই মহাসড়কে এ ধরনের ভারী যান ও ছোট যানের পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষের কারণে মুহূর্তের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে বিঘ্নিত হয় এবং শত শত পথচারী ও চালক ঘটনাস্থলে ভিড় জমান।
এই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়া দুর্ভাগা চারজন ব্যক্তির পরিচয় পরবর্তীতে স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকারীদের প্রচেষ্টায় নিশ্চিত করা হয়েছে, যা এই ট্র্যাজেডির বেদনাকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের তিনজন সদস্য রয়েছেন, যা এই দুর্ঘটনাকে এক অপূরণীয় পারিবারিক শোকে রূপান্তর করেছে। নিহত ব্যক্তিরা হলেন সুনামগঞ্জ জেলার ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথপুর উপজেলার নিবাসী নিয়ামত আলী, তাঁর সহধর্মিনী এবং তাঁদের অবুঝ কন্যাসন্তান। পরিবারের সবাই মিলে কোনো একটি জরুরি কাজে বা গন্তব্যে যাওয়ার পথে এই নির্মম পরিণতি তাঁদের গ্রাস করে নেয়। এছাড়া এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো চতুর্থ ব্যক্তিটি হলেন সেই সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক লালন মিয়া, যিনি প্রতিদিনের মতো নিজের জীবিকা নির্বাহের তাগিদে গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর জীবন্ত ঘরে ফিরতে পারেননি। একই পরিবারের বাবা, মা ও মেয়ের একসঙ্গে চিরবিদায় এবং অটোরিকশাচালকের এই আকস্মিক মৃত্যুতে তাদের নিজ নিজ এলাকাসহ পুরো সিলেট জুড়ে শোকের মাতম চলছে এবং স্বজনদের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন: চাঁপাইনবাবগঞ্জে একশত ষাট পিস ইয়াবাসহ এক মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার
দুর্ঘটনার পরপরই মহাসড়কের আশপাশে থাকা সাহসী স্থানীয় লোকজন চরম সাহসিকতা ও মানবতা প্রদর্শন করে দ্রুত উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসেন। দুমড়েমুচড়ে যাওয়া এবং রক্তে ভেজা সিএনজি অটোরিকশার রড ও লোহালক্কড় কেটে ভেতরে আটকে পড়া মৃতদেহগুলো এবং গুরুতর আহত যাত্রীদের অত্যন্ত কষ্ট করে উদ্ধার করা হয়। এই দুর্ঘটনায় নিহত চারজন ছাড়াও আরও অন্তত দুজন যাত্রী অত্যন্ত গুরুতর জখম হয়ে মারাত্মক অবস্থায় রাস্তায় ছটফট করছিলেন। স্থানীয়রা তাৎক্ষণিকভাবে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে একটি দ্রুতগতির উদ্ধারকারী ব্যবস্থার মাধ্যমে সমস্ত হতাহত ব্যক্তিদের দ্রুত সিলেট শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত মর্যাদাপূর্ণ সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করেন। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর সেখানে দায়িত্বরত অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আহতদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন এবং মর্মান্তিক সত্য হিসেবে ঘোষণা করেন যে, হাসপাতালে আনার আগেই অথবা আঘাতের তীব্রতায় চারজন যাত্রীই পৃথিবী ছেড়ে চিরতরে চলে গেছেন। অন্যদিকে, গুরুতর আহত বাকি দুজন যাত্রীকে দ্রুত হাসপাতালের জরুরি অপারেশন থিয়েটারে ও আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে, যেখানে চিকিৎসকরা তাদের জীবন বাঁচানোর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় শেরপুর হাইওয়ে থানার পুলিশ বাহিনী অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করে। শেরপুর হাইওয়ে থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসি আনিসুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে এই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, পুলিশ ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং এই সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সমস্ত আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের প্রক্রিয়া জোরেশোরে চলছে। ঘাতক তেলবাহী লরিটিকে শনাক্ত করা এবং এর চালককে দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য হাইওয়ে পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। মহাসড়কে এই ধরনের বেপরোয়া ড্রাইভিং এবং ফিটনেসবিহীন লরি চলাচলের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এই ধরনের রক্তক্ষয়ী দুর্ঘটনা রোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না বলে সচেতন নাগরিক সমাজ বারবার দাবি জানিয়ে আসছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারির অভাব এবং চালকদের বেপরোয়া মানসিকতাই যে প্রতিদিন শত শত পরিবারের স্বপ্নকে এভাবে নিমিষেই ধুলিস্যাৎ করে দিচ্ছে, তা নিয়ে আজ দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
পরিশেষে বলা যায় যে, সিলেটের ওসমানীনগরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা আবারও আমাদের চোখের সামনে দেশের সড়ক নিরাপত্তার চরম অবনতি ও অনিরাপদ যাতায়াতের চিত্র অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। একটিমাত্র মুহূর্তের অসতর্কতা এবং গতির উন্মাদনা কীভাবে একটি পুরো পরিবারকে চিরতরে ধ্বংস করে দিতে পারে, নিয়ামত আলী ও তাঁর পরিবারের এই মর্মান্তিক পরিণতি তারই এক নিষ্ঠুর প্রমাণ। সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক মহল, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং ট্রাফিক পুলিশ প্রশাসনকে যৌথভাবে আরও অনেক বেশি কঠোর ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে মহাসড়কগুলো সাধারণ মানুষের জন্য মৃত্যুর ফাঁদ না হয়ে নিরাপদ চলাচলের পথ হয়ে ওঠে। নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করার পাশাপাশি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করা ছাড়া এই মুহূর্তে আর কোনো সান্ত্বনা ভাষা অবশিষ্ট থাকে না। দেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবন সুরক্ষায় সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় ও প্রধান দাবি।
প্রতিবেদনের সূত্র: হাইওয়ে পুলিশ ও স্থানীয় সংবাদদাতাগণ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।