প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
মানুষের জীবনে চলার পথে শত শত বাধা-বিপত্তি, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা সামাজিক প্রতিকূলতা থাকতে পারে, কিন্তু মানুষের অদম্য ইচ্ছা শক্তি, প্রবল মানসিক দৃঢ়তা এবং নিরলস পরিশ্রমের সামনে কোনো বাধাই যে চিরস্থায়ী দেওয়াল হয়ে দাঁড়াতে পারে না, তার এক উজ্জ্বল ও অনুপ্রেরণাদায়ক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বাংলাদেশের এক তরুণী। বিশ্বমঞ্চে নিজের মেধার দ্যুতি ছড়িয়ে দিয়ে পুরো দেশবাসীর হৃদয়ে গভীর শ্রদ্ধার আসন করে নিয়েছেন সুনামগঞ্জ জেলার কৃতি সন্তান রুহি। অত্যন্ত সাধারণ ও প্রান্তিক একটি পরিবার থেকে উঠে এসে তিনি যে অসাধারণ কীর্তি গড় তা কেবল তার নিজের বা পরিবারের জন্যই নয়, বরং সমগ্র জাতির জন্য এক গর্বের অধ্যায় হয়ে উঠেছে। জীবন সংগ্রামের নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে পায়ে দলে রুহি প্রমাণ করেছেন যে, কঠোর সাধনা ও আত্মবিশ্বাসের জোরে পৃথিবীর যেকোনো কঠিন পাহাড় সমান বাধাকে সহজেই জয় করা সম্ভব। তার এই সাফল্যে কেবল তার নিজ গ্রাম বা উপজেলা নয়, বরং গোটা দেশজুড়ে আজ প্রশংসার জোয়ার বইছে এবং লাখ লাখ তরুণের জন্য তিনি এক জীবন্ত অনুপ্রেরণায় পরিণত হয়েছেন।
আরও পড়ুন: ফরিদপুরে মাদক সেবনের ভিডিও ধারণ নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, পুলিশের গাড়িতে হামলা
সুনামগঞ্জ জেলার দূরবর্তী ও নদীমাতৃক ছাতক উপজেলার অন্তর্গত ইতিহাসসমৃদ্ধ ইসলামপুর ইউনিয়নের অবহেলিত গনেশপুর গ্রামের এক অতি সাধারণ পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন এই কৃতি ছাত্রী। রুহির জীবনযাত্রার পথচলা কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না, বরং তা ছিল প্রতিনিয়ত টিকে থাকার এক দীর্ঘ সংগ্রাম। তার পরিবারে অর্থের প্রাচুর্য ছিল না, ছিল না কোনো বিলাসবহুল জীবনযাপনের সুযোগ; কিন্তু অভাব অনটনকে তারা কখনো নিজেদের পড়াশোনা ও স্বপ্নের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে দেননি। রুহির বাবা আব্দুল কাদির পেশায় একজন অত্যন্ত সাধারণ ও খেটে খাওয়া চা বিক্রেতা, যিনি প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করেন। আধুনিক কোনো স্থায়ী দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান না থাকায় তিনি প্রতিদিন নিজের ছোট্ট নৌকা নিয়ে ছাতক এলাকার বিভিন্ন নদী ও জনপদে ঘুরে ঘুরে চা বিক্রি করেন এবং সেই অতি সীমিত আয় দিয়েই নিজের বিশাল সংসারের নিত্যদিনের খরচ মেটানোর পাশাপাশি অত্যন্ত কষ্টেসৃষ্টে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জুগিয়ে যান। বাবার এই হাড়ভাঙা খাটুনি, রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে তিল তিল করে জমানো কষ্টের প্রতিটি পয়সা যে কতটা মূল্যবান, তা খুব গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন তার সন্তান রুহি।
পিতার এই অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগের কথা সব সময় মনে রেখে রুহি তার ছাত্রজীবনে কখনো পড়াশোনায় এক মুহূর্তের জন্যও অবহেলা করেননি। অভাবের তাড়নায় যখন প্রতিদিনের সংসার চালানোই ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তখনো আব্দুল কাদির তার স্নেহের ছোট মেয়েটির শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হতে দেননি। বাবার সেই ভাঙা নৌকার চা বিক্রির উপার্জনের ঘাম ঝরানো প্রতিটি মুদ্রা যেন রুহির কাছে একেকটি অমূল্য রত্নতুল্য ছিল। বাবার সেই আত্মত্যাগের ঋণ শোধ করার একমাত্র উপায় হিসেবে রুহি তার সমস্ত মনযোগ পড়াশোনায় নিবেশ করেছিলেন। স্থানীয় নারী শিক্ষার অন্যতম বিদ্যাপীঠ উইমেন্স মডেল কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতিটি ধাপে নিজের অসাধারণ মেধা ও বুদ্ধিমত্তার স্বাক্ষর রেখে চলেছিলেন। কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অকৃত্রিম স্নেহ এবং নিজের আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে তিনি নানা প্রতিকূলতার মাঝেও এগিয়ে চলেছিলেন নিজের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে, যা আজ তাকে এনে দিয়েছে এক ঐতিহাসিক ও অভাবনীয় সাফল্য।
আরও পড়ুন: গাজীপুরের কাপাসিয়ায় ছেলের মৃত্যুর খবরে মায়েরও মৃত্যু, পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে
সম্প্রতি উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে রুহি অর্জন করেছেন প্রায় পঁচাত্তর লক্ষ টাকার এক বিশাল ও মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ, যা সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। আন্তর্জাতিক মানের এই বৃত্তি লাভের মধ্য দিয়ে তিনি এখন বিশ্বের যেকোনো উন্নত দেশের শীর্ষস্থানীয় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নিজের উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করার সুবর্ণ সুযোগ লাভ করেছেন। একটি চা বিক্রেতা পিতার অতি সাধারণ ঘরের মেয়ে হয়েও নিজের অদম্য মেধা ও কঠোর অধ্যবসায়ের জোরে এত বড় অঙ্কের একটি আন্তর্জাতিক শিক্ষাবৃত্তি অর্জন করা সত্যিই অবিশ্বাস্য এক ঘটনা। এই খবরটি প্রকাশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গনেশপুর গ্রামের সেই ছোট্ট কুটিরে এবং পুরো সুনামগঞ্জ জেলা জুড়ে আনন্দের এক মহোৎসব শুরু হয়ে যায়। খবরের কাগজ ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কল্যাণে এই খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সর্বস্তরের মানুষ ছুটে আসছেন আব্দুল কাদিরের সঙ্গে দেখা করতে এবং তার এই সংগ্রামমুখর জীবনের সার্থকতার জন্য তাকে অভিনন্দন জানাতে। বাবার চোখের আনন্দের অশ্রু আর মেয়ের এই বিশ্বজয় যেন সমগ্র সমাজের প্রতিটি মানুষের মনকে গভীরভাবে নাড়া দিয়ে গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মে এই সংবাদটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে নেটদুনিয়ায় এক বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন মাধ্যমে লাখ লাখ সাধারণ মানুষ অদম্য এই তরুণী রুহি এবং তার সংগ্রামী পিতা আব্দুল কাদিরকে অন্তহীন ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় ভাসিয়ে দিচ্ছেন। নেটিজেনরা মন্তব্য করছেন যে, বর্তমান প্রজন্মের অনেক তরুণ-তরুণী যখন সামান্য সুযোগ-সুবিধার অভাবে হতাশায় নিমজ্জিত হয়, ঠিক তখন রুহি প্রমাণ করে দিয়েছেন যে মনের জোর থাকলে শূন্য থেকেও মহ শিখরে পৌঁছানো যায়। চা বিক্রেতা পিতার এই ত্যাগ এবং তার মেয়ের এই ব্রত পুরো জাতির সামনে এক অনন্য নৈতিক শিক্ষার বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক বিভিন্ন পর্যায় থেকেও এই মেধাবী মুখটিকে সংবর্ধনা জানানোর নানা ঘোষণা আসতে শুরু করেছে, যা তার ভবিষ্যৎ পথচলাকে আরও বেশি সুগম করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায় যে, সুনামগঞ্জের ছাতকের গনেশপুর গ্রামের চা বিক্রেতা আব্দুল কাদিরের মেয়ে রুহির এই ৭৫ লাখ টাকার স্কলারশিপ অর্জনের ঘটনাটি কেবল একটি বৃত্তির প্রাপ্তি নয়, এটি হলো মেধা, শ্রম এবং সততার এক পরম বিজয়। হাজারো অভাব-অনটন এবং সামাজিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও কেউ যদি তার লক্ষ্য থেকে একচুলও সরে না দাঁড়ায়, তবে ভাগ্যও তার সহায় হতে বাধ্য হয়, রুহি তার প্রমাণ রাখলেন। দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার এই গৌরবোজ্জ্বল পদচারণা বাংলাদেশের নারী সমাজ ও দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য চিরকাল এক আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে। আমরা এই মেধাবী তরুণীর সর্বাঙ্গীন উন্নতি, সুস্বাস্থ্য এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি, যেন তিনি আগামী দিনে দেশ ও দশের কল্যাণে নিজেকে পুরোপুরি নিয়োজিত করতে পারেন এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নাম আরও অনেক উঁচুতে তুলে ধরতে পারেন।
প্রতিবেদনের সূত্র: স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম ও পারিবারিক তথ্য।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।