প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
স্বাধীনতার দীর্ঘ এই পথ পরিক্রমায় বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবা ও জনস্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন এক নতুন ও যুগান্তকারী দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যেখানে দেশের আপামর জনসাধারণের দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ও নৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ যখন নানা ধরনের দৃষ্টিশক্তি সংক্রান্ত জটিলতা ও অন্ধত্বজনিত সমস্যায় ভুগে থাকেন, তখন তাদের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা বড় শহরগুলোর বড় হাসপাতাল থেকে একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে নিয়ে যাওয়ার কোনো বিকল্প থাকে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক অগ্রগতি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকাকে সামনে রেখে বাংলাদেশের প্রান্তিক অঞ্চলের প্রতিটি মানুষকে চোখের দৃষ্টির আলোর সাথে সংযুক্ত করার এক বিশাল ও দূরদর্শী রূপরেখা নিয়ে কাজ শুরু করেছে বর্তমান স্বাস্থ্য প্রশাসন। দেশের প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে অবস্থিত সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যায়ক্রমে অতি উন্নতমানের চক্ষু চিকিৎসা ও আধুনিক যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ সেবা নিশ্চিত করার এক সুদূরপ্রসারী জাতীয় পরিকল্পনা আজ বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে চলেছে বলে নীতিনির্ধারণী মহল থেকে অত্যন্ত জোরালোভাবে ঘোষণা করা হয়েছে।
এই ঐতিহাসিক অগ্রযাত্রার ধারাবাহিকতায় এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাথে তাল মিলিয়ে চলা বর্তমান স্বাস্থ্য খাতের সাম্প্রতিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গত মঙ্গলবার, অর্থাৎ ১৮ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের এই বিশেষ দিনে রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ও বিলাসবহুল হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের রূপসী বাংলা গ্র্যান্ড বলরুম প্রাঙ্গণে এক অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। দেশের প্রধান এই মহানগরীর অন্যতম সুরক্ষিত ও অভিজাত ভেন্যুতে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক মানের অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য খাতের বহু দেশি-বিদেশি বিশিষ্ট গবেষক, চিকিৎসক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি এবং সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণ অত্যন্ত উৎসাহের সাথে অংশগ্রহণ করেন। সমগ্র অনুষ্ঠানটিজুড়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং দেশের প্রতিটি স্তরের মানুষের চোখের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার বহুমুখী পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা হয়, যা উপস্থিত সকল মহলের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ এবং ইতিবাচক উদ্দীপনার সঞ্চার করতে সক্ষম হয়েছিল।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত এমপি, যাঁর প্রাজ্ঞ বক্তব্যে স্বাস্থ্য খাতের আমূল পরিবর্তনের এক স্পষ্ট রূপরেখা ফুটে ওঠে। তিনি তাঁর সুদীর্ঘ বক্তব্যে অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, বর্তমান সরকার কেবল শহরাঞ্চলের মানুষের জন্য নয়, বরং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও বড় ধরনের জাতীয় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে অবস্থিত সরকারি হাসপাতালগুলোতে সাধারণ চিকিৎসার পাশাপাশি উন্নত মানের চক্ষু চিকিৎসা, ছানি অপারেশন এবং দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষার আধুনিক সুযোগ-সুবিধা পর্যায়ক্রমে চালু করার মাধ্যমে চিকিৎসাব্যবস্থাকে জনমুখী করার কাজ অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এগিয়ে চলেছে। সাধারণ একজন খেটে খাওয়া মানুষ যেন চোখের চিকিৎসার জন্য জেলা শহর বা রাজধানী ঢাকায় ছুটে আসার ভোগান্তির শিকার না হন, তার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে চোখের আধুনিক চিকিৎসার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার এই উদ্যোগকে দেশের চিকিৎসা ইতিহাসে এক বিপ্লব হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও বৈশ্বিক একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের আনুষ্ঠানিক বাস্তবায়ন, যার নাম দেওয়া হয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘ডব্লিউএইচও স্পেকস ২০৩০ ইনিশিয়েটিভ’ বা ‘WHO SPECS 2030 Initiative’। বিশ্বজুড়ে চোখের দৃষ্টিশক্তির সুরক্ষা এবং লাখ লাখ মানুষের অন্ধত্ব দূর করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই বিশেষ বৈশ্বিক কর্মসূচিটি প্রণয়ন করেছে, যা এখন আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশেও আনুষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়নের পথে অত্যন্ত সফলভাবে হাঁটল। এই আন্তর্জাতিক উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রে দৃষ্টিসেবা বা রিফ্রাক্টিভ ইরর কারেকশন এবং চশমা বা অন্যান্য চক্ষু চিকিৎসা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে এবং অত্যন্ত সহজলভ্য করে তোলা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই মহৎ বৈশ্বিক উদ্যোগের সাথে বাংলাদেশের জাতীয় স্বাস্থ্য নীতির চমৎকার মেলবন্ধন ঘটিয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী মহোদয় দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চোখের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত এমপি আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে বলেন যে, বর্তমান সরকারের রূপকল্প বাস্তবায়নে দেশের স্বাস্থ্য খাতের প্রতিটি শাখায় দুর্নীতি দূর করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবার মান আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কাজ নিরলসভাবে চলছে। উপজেলা হাসপাতালগুলোতে যখন উন্নত চক্ষু চিকিৎসার আধুনিক অপারেশন থিয়েটার এবং দক্ষ চক্ষু বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করা হবে, তখন দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও জনজীবনে এর এক সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, কারণ অন্ধত্ব বা চোখের সমস্যা মানুষের কর্মক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘WHO SPECS 2030 Initiative’ দেশের মাটিতে সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের সাধারণ মানুষ বিনা মূল্যে বা অত্যন্ত স্বল্প খরচে বিশ্বমানের চোখের চশমা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা লাভ করতে পারবে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ বাংলাদেশের এই সাহসী পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে সর্বাত্মক প্রযুক্তিগত ও তাত্ত্বিক সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন।
পরিশেষে বলা যায়, রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অনুষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত এমপির সুদূরপ্রসারী ঘোষণা বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় এক নতুন ও স্বর্ণালী অধ্যায়ের সূচনা করল। উপজেলা হাসপাতালেই উন্নত চক্ষু সেবা চালুর এই বিশাল জাতীয় পরিকল্পনা এবং ‘WHO SPECS 2030 Initiative’-এর সফল বাস্তবায়ন দেশের অন্ধত্ব দূরীকরণ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী মাইলফলক হয়ে থাকবে। আমরা আশা করি, সরকারের এই মহৎ উদ্যোগ যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি কর্নারে আলোর বার্তা পৌঁছে যাবে এবং সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি সুস্থ, সবল ও দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন জাতি গঠনই আমাদের সকলের আজ অঙ্গীকার হওয়া উচিত।
সূত্র: স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রেস উইং ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশ প্রেস নোট।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।