প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার উত্তরার আব্দুল্লাহপুর থেকে গাজীপুরের টঙ্গীগামী ব্যস্ত মহাসড়কে একটি চলন্ত মোটরসাইকেলের দুই পুরুষ আরোহীর মাঝখানে একজন তরুণীকে সংজ্ঞাহীন ও নিস্তেজ অবস্থায় চরম ঝুঁকিপূর্ণভাবে বহন করে নিয়ে যাওয়ার চাঞ্চল্যকর ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছিল। চলন্ত যানে এমন অস্বাভাবিক ও আশঙ্কাজনক অবস্থায় একজন নারীকে পরিবহন করার দৃশ্যটি সামাজিক মাধ্যমে দেখার পর ইন্টারনেটে মুহূর্তের মধ্যেই চরম তোলপাড় শুরু হয়। নানা ধরণের অপপ্রচার, মনগড়া তথ্য ও ভিত্তিহীন জল্পনা-কল্পনার কারণে জনমনে অপরাধমূলক কিংবা অপহরণের মতো ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হলেও অবশেষে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের দ্রুত তৎপরতা ও নিবিড় অনুসন্ধানে সেই রহস্যময় ঘটনার প্রকৃত বিবরণ ও আসল সত্য উন্মোচিত হয়েছে। টঙ্গী পশ্চিম থানায় পুলিশি তদারকি ও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তরুণী নিজেই স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে ঘটনার বাস্তব পরিস্থিতি বর্ণনা করে সমস্ত ধোঁয়াশার ইতি টেনেছেন।
আরও পড়ুন: লংমার্চের ১ লাখ লিটার তেল নিয়ে বিরোধীদের প্রশ্ন প্রতিমন্ত্রীর
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, ইন্টারনেটে পোস্ট হওয়া সংক্ষিপ্ত ওই আলোচিত ভিডিও চিত্রটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃষ্টিগোচর হওয়ার সাথে সাথেই টঙ্গী পশ্চিম থানা পুলিশ ও জোন পুলিশের অপরাধ তদন্তকারী দল বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেয়। আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক ট্র্যাকিং ও সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ঘটনার সঠিক স্থান ও সময় শনাক্তের পর ওই তরুণীর সন্ধান লাভ করে পুলিশ প্রশাসন। পরবর্তীতে তাঁকে থানায় নিয়ে এসে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও মানসিকভাবে স্বাভাবিক পরিবেশে জিজ্ঞাসাবাদ পরিচালনা করা হয়। গণমাধ্যমকর্মীদের সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে জিজ্ঞাসাবাদকালে তরুণী সম্পূর্ণ সুস্থ ও সজ্ঞান অবস্থায় নিশ্চিত করেন যে, তাঁকে জোরপূর্বক কোনো নেশাজাতীয় পদার্থ পান করানো হয়নি কিংবা তিনি কোনো ধরনের অপরাধ চক্র বা চক্রান্তের শিকার হননি। তিনি নিজের ইচ্ছেতেই অ্যালকোহল সেবন করেছিলেন বলে অকপটে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে ভুক্তভোগী তরুণী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, হ্যাঁ, আমি নিজেই মদ খেয়েছিলাম, আমাকে অন্য কেউ জোর করে বা প্রতারণা করে তা খাইয়ে দেয়নি। বাইকে থাকা ওই লোকগুলো আমার পরিচিত এবং তারা বিপদের সময়ে আমাকে হাসপাতালে বা নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিয়ে সাহায্য করতে এসেছিল। তিনি আরও জানান, অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যালকোহল সেবনের পর তীব্র শারীরিক অসুস্থতা ও মাথা ঘোরার সমস্যা দেখা দিলে তিনি বাধ্য হয়ে নিজের অত্যন্ত পরিচিত ও বিশ্বস্ত দুই ব্যক্তিকে ফোন করে ঘটনাস্থলে আসার আকুল অনুরোধ জানান। তারা ফোন পেয়ে দ্রুত এগিয়ে আসেন এবং মানবিক কারণে তাঁকে উদ্ধার করে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তবে চলন্ত বাইকে তীব্র শারীরিক দুর্বলতার কারণে তিনি ঠিকমতো সোজা হয়ে বসতে পারছিলেন না, যার কারণে পথচারীদের দৃষ্টিতে তাঁকে নিস্তেজ বলে মনে হয়েছিল।
আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে রংধনু মডেল স্কুলের কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা
ঘটনাটির মূল মনস্তাত্ত্বিক কারণ ও প্রেক্ষাপট উন্মোচন করে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম শনিবার গণমাধ্যমকর্মীদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানান, প্রাথমিক পুলিশি অনুসন্ধানে জানা গেছে যে ওই তরুণী সাম্প্রতিক সময়ে মারাত্মক কিছু পারিবারিক জটিলতা এবং চরম মানসিক বিষণ্নতার মধ্যে দিন পার করছিলেন। পারিবারিক দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন ও মনস্তাত্ত্বিক চাপের কারণে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। সেই তীব্র হতাশা ও মনের অশান্তি থেকে সাময়িক মুক্তি পাওয়ার ভুল ভাবনায় তিনি নিজ বাসভবনে একা অবস্থানকালে অতিরিক্ত মাত্রায় মদ সেবন করেন। পানের কিছুক্ষণের মধ্যেই শরীর প্রচণ্ড খারাপ হয়ে পড়লে ও অচেতন আমেজ সৃষ্টি হলে তিনি পরিচিত দুই যুবককে দ্রুত বার্তা পাঠে সহায়তার জন্য ডাকেন। দুই যুবক মূলত তাঁকে বিপদমুক্ত করতেই দ্রুত মোটরবাইকে তুলে নিয়ে গন্তব্যের দিকে যাচ্ছিলেন।
উপ-পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম আরও যুক্ত করে বলেন, ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিওচিত্রটি একাধিকবার কারিগরি বিশ্লেষণের মাধ্যমে পুলিশ টিম মোটরসাইকেলটির সঠিক রেজিস্ট্রেশন নম্বর ও তার প্রকৃত মালিকের বায়োডাটা শতভাগ নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। জিএমপি পুলিশের একটি চৌকস দল মোটরসাইকেলের দুই আরোহীকে দ্রুত খুঁজে বের করে প্রথাগত আইনি প্রক্রিয়ার অধীনে এনে প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ পরিচালনার জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো গোপন অপরাধমূলক দিক লুকিয়ে ছিল কি না তা সম্পূর্ণরূপে যাচাই করা সম্ভব হয়। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যপ্রমাণ ও তরুণীর জবানবন্দি অনুযায়ী এতে কোনো অপরাধমূলক চক্রান্ত বা জোরজবরদস্তির আলামত পাওয়া যায়নি বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ।
আইনগত অনুসন্ধান ও প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর কোনো মামলা বা চক্রান্তের সত্যতা না থাকায় শনিবার বিকেলেই তরুণীকে তাঁর আপন বোনের জিম্মায় সসম্মানে হস্তান্তর করা হয়। পরিবারের সদস্যরা থানায় এসে তাঁকে বুঝে নেন এবং এই জটিল পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক সহায়তার জন্য পুলিশ প্রশাসনের প্রতি গভীর ধন্যবাদ প্রকাশ করেন। ঘটনাটির রহস্যজনক মোড় কাটার পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী দপ্তরের পক্ষ থেকে সাধারণ সর্বস্তরের মানুষের উদ্দেশ্যে অনুরোধ জানিয়ে বলা হয়েছে যেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সঠিক যাচাই-বাছাই না করে অসম্পূর্ণ কোনো ভিডিও দেখে অপপ্রচার, বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক ছড়ানো থেকে সবাই বিরত থাকেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই আধুনিক যুগে যেকোনো ঘটনা দ্রুত ভাইরাল হওয়ার সুবাদে বিভ্রান্তি ছড়ানোর প্রবণতাও অনেকাংশে বেড়েছে। এই প্রেক্ষিতে সংবাদ মাধ্যম ও সাধারণ সমাজকে যেকোনো সংবেদনশীল ঘটনায় প্রশাসনের অফিসিয়াল বক্তব্যের ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। টঙ্গী পশ্চিম থানা পুলিশের তৎপরতায় খুব দ্রুততম সময়ে বাইকের রহস্য উন্মোচিত হওয়ায় জনমনে স্বস্তি ফিরে এসেছে। নাগরিক নিরাপত্তা বিধানের পাশাপাশি নিরপেক্ষ তদন্তের এই প্রশাসনিক পদক্ষেপ সুশীল সমাজে প্রশংসিত হচ্ছে।
সূত্র: গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ ও টঙ্গী পশ্চিম থানা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।