প্রতিবেদন: আব্দুস ছাত্তার (শামীম) / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংলগ্ন সড়ক ও আশেপাশের আশকোনা এলাকা জুড়ে প্রতিনিয়ত যাতায়াতকারী বৈদেশিক রেমিট্যান্স যোদ্ধা তথা প্রবাসীদের নিরাপদ যাতায়াত সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি ছিনতাই, ডাকাতি ও অজ্ঞান পার্টির মতো সংঘবদ্ধ অপরাধ দূরীকরণে অভূতপূর্ব ও অত্যন্ত কঠোর প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর অংশ হিসেবে রাজধানীর কাওলা মোড় থেকে শুরু করে উত্তরার জসিম উদ্দিন মোড় পর্যন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মহাসড়ক এবং সংলগ্ন অলিগলিকে শতাধিক অত্যাধুনিক সিসিটিভি (ক্লোজড সার্কিট টেলিভিশন) ক্যামেরার নিবিড় নজরদারির আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার এই সুদূরপ্রসারী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপে বিমানবন্দর কেন্দ্রিক দীর্ঘদিনের সক্রিয় ভাসমান ও দুর্ধর্ষ অপরাধী চক্রগুলোর অপরাধমূলক কার্যক্রম একেবারে শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন দায়িত্বশীল প্রশাসনিক কর্মকর্তারা।
আরও পড়ুন: কক্সবাজার সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ৪০ হাজার পিস ইয়াবাসহ যুবক গ্রেফতার
বিমানবন্দর থানা পুলিশ সূত্রে পাওয়া বিস্তারিত বিবরণ অনুযায়ী জানা গেছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশফেরত প্রবাসী ও তাদের আত্মীয়স্বজনদের লক্ষ্য করে একশ্রেণির পেশাদার অপরাধী চক্র ক্রমান্বয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। কিছুদিন পূর্বে কাওলা এলাকায় এক প্রবাসীর বোনের প্রেরিত মূল্যবান স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থ ছিনতাইয়ের একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় বিমানবন্দর থানা পুলিশ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মহাসড়কে স্থাপিত পূর্বের সিসিটিভি ফুটেজ নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে জড়িত মূল অপরাধীদের শনাক্ত করতে সক্ষম হয় এবং স্বল্পতম সময়ে তাদের গ্রেপ্তার করে মালামাল উদ্ধার করে। এই সফল অভিযানের পরপরই পুরো বিমানবন্দর মহাসড়ক এলাকাকে শতভাগ আধুনিক সিসিটিভি নজরদারির আওতায় নিয়ে আসার প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা চরমভাবে অনুধাবন করা হয় এবং সে লক্ষ্যে এই বৃহৎ নিরাপত্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ দ্রুত ত্বরান্বিত করা হয়েছে।
বর্তমানে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নবনির্মিত থার্ড টার্মিনালের সম্মুখভাগ থেকে শুরু করে প্রধান গোলচত্বর এলাকা পর্যন্ত আনুমানিক ২৫টি উচ্চপ্রযুক্তির নাইট ভিশন সিসি ক্যামেরা সফলভাবে কার্যকর রয়েছে। তবে নতুন করে বাস্তবায়নাধীন সমন্বিত নিরাপত্তা প্রকল্পের ফলে উত্তরার ক্রাউন প্লাজা এলাকা থেকে শুরু করে জসিম উদ্দিন মোড় পর্যন্ত রাস্তার উভয় পাশ সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় আসবে। শুধু তাই নয়, বিমানবন্দর রেলস্টেশন, সংলগ্ন রেলপথ অতিক্রম করে ঐতিহ্যবাহী হজ ক্যাম্প এলাকা পর্যন্ত সুবিশাল ভৌগোলিক অঞ্চলের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরা বসানোর কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। এই ক্যামেরাগুলোর মাধ্যমে দিন কিংবা গভীর রাতেও যেকোনো সন্দেহভাজন গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
আরও পড়ুন: তারেক রহমানের ১৯তম কারামুক্তি দিবস আজ
নিরাপত্তা জোরদারকরণের বিষয়ে বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলাম তালুকদার জানিয়েছেন, প্রিয় জন্মভূমিতে আসা প্রবাসীদের সামগ্রিক নিরাপত্তা দেওয়া পুলিশের অন্যতম অগ্রাধিকার। কাওলা থেকে জসিম উদ্দিন মোড় পর্যন্ত প্রায় একশত উন্নতমানের সিসি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ ত্বরান্বিত করা হচ্ছে। এই সুসংগঠিত নজরদারি ব্যবস্থা চালু হলে যেকোনো বিশৃঙ্খলাকারী বা অপরাধীকে তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে। তিনি আরও জানান যে, এই ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থার প্রধান সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুম সরাসরি থানা ও স্থানীয় নিরাপত্তা ফাঁড়ির সাথে যুক্ত থাকবে, ফলে যেকোনো অঘটন ঘটার সাথে সাথে পুলিশি রেসপন্স টিম তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারবে।
স্থানীয় বাসিন্দা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দীর্ঘকালীন অনুসন্ধানে প্রকাশ পেয়েছে যে, বিমানবন্দর সংলগ্ন এই বিশাল আন্তর্জাতিক এলাকায় মূলত তিন ধরনের সুসংগঠিত অপরাধী চক্র সক্রিয় থেকে অপরাধ সংঘটন করে আসছিল। এর মধ্যে প্রথমটি হলো সশস্ত্র ছিনতাইকারী চক্র। এরা বিমানবন্দরের সামনের মোড়, কাওলার প্রবেশমুখ এবং আশেপাশের দূরপাল্লার বাস কাউন্টার এলাকায় দিন-রাত সমানতালে সুযোগ বুঝে অস্ত্র উঁচিয়ে সাধারণ পথচারী ও দূর দূরান্ত থেকে আসা প্রবাসীদের মালামাল ও অর্থ ছিনতাই করত। দ্বিতীয়টি হলো চালকবেশী ডাকাত চক্র। তারা বিমানবন্দরে গাড়ি না থাকা বা স্বজনদের অপেক্ষায় থাকা প্রবাসীদের অত্যন্ত কম ভাড়ার লোভ দেখিয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত গাড়ি বা ট্যাক্সিতে তুলত। পরবর্তীতে নির্জন পথে গিয়ে নিজেদের অন্য সহযোগীদের গাড়িতে তুলে প্রবাসীদের মারাত্মক শারীরিক নির্যাতন করে সঙ্গে থাকা পাসপোর্ট, বৈদেশিক মুদ্রা ও মালামাল লুট করে রাস্তায় ফেলে পালিয়ে যেত।
এছাড়া তৃতীয় বিপজ্জনক গ্রুপটি হলো অজ্ঞান পার্টি বা চেতনাপ্রদানকারী চক্র। তারা নিজেদেরও বিদেশফেরত কিংবা বন্ধুভাবাপন্ন যাত্রী হিসেবে জাহির করে প্রবাসীদের সাথে ভুয়া সখ্য গড়ে তুলত। পরবর্তীতে সুকৌশলে প্রবাসীদের বিস্কুট, জুস বা কোমল পানীয়ের সাথে তীব্র নেশাজাতীয় অথবা চেতনানাশক কেমিক্যাল খাইয়ে সর্বস্ব লুটে নিয়ে তাদের অচেতন অবস্থায় ফেলে রেখে চম্পট দিত। এসব বহুমুখী অপরাধ নির্মূল করতে এখন পুলিশি নজরদারি অভূতপূর্ব মাত্রায় উন্নীত করা হয়েছে। প্রতিদিন পোশাকি পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি সাদা পোশাকে বিপুলসংখ্যক গোয়েন্দা সদস্য মাঠে নিয়োজিত রয়েছেন। একই সাথে বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)-এর বিশেষ গোয়েন্দা ইউনিটকে সার্বক্ষণিক সর্বোচ্চ সজাগ ও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি অপরাধের সুযোগ হ্রাস করতে পুরো বিমানবন্দর এলাকা থেকে প্রবাসীদের বিরক্তকারী ভবঘুরে, ভাসমান টোকাই ও অবৈধ হকারদের সরাতে নিয়মিত বিশেষ চিরুনি অভিযান পরিচালনা করছে পুলিশ।
দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার হিসেবে বিমানবন্দর এলাকার নিরাপত্তা বজায় রাখা কেবল প্রবাসীদের সুরক্ষার জন্যই জরুরি নয়, বরং এটি বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের সার্বিক ভাবমূর্তির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই কঠোর অবস্থানের ফলে প্রবাসী যাত্রী, তাদের স্বজন এবং সাধারণ পথচারীরা নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তায় যাতায়াত করতে পারবেন। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, অপরাধী যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তাদের চিহ্নিত করে স্থায়ীভাবে নির্মূল না করা পর্যন্ত এই বিশেষ নজরদারি কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হবে।
সূত্র: বিমানবন্দর থানা পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।