ইতালিতে বিশ্বযুদ্ধোত্তর দীর্ঘতম সরকারের নতুন রেকর্ড গড়লেন জর্জিয়া মেলোনি

ইতালিতে বিশ্বযুদ্ধোত্তর দীর্ঘতম সরকারের নতুন রেকর্ড গড়লেন জর্জিয়া মেলোনি
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: আব্দুস ছাত্তার (শামীম) / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে ইউরোপের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক ও অনন্য নজির স্থাপন করেছেন ইতালির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা, ঘনঘন সরকার পতন ও দলীয় মেরুকরণের জন্য পরিচিত দেশটিতে তাঁর নেতৃত্বাধীন প্রশাসন একক মেয়াদে টানা সর্বাধিক দিন ক্ষমতায় থাকার নতুন রেকর্ড গড়েছে। শুক্রবার (০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬) মেলোনির কট্টর ডানপন্থি দল 'ব্রাদার্স অব ইতালি' পরিচালিত সরকার এই অভূতপূর্ব সফলতা অর্জন করে। বিগত প্রায় আট দশকের বিশ্বযুদ্ধোত্তর ইতিহাসে যেখানে ইতালি প্রায় ৬৮টি ভিন্ন ভিন্ন সরকারের উত্থান-পতন অবলোকন করেছে, সেখানে মেলোনি প্রশাসনের এই নিরবচ্ছিন্ন পথচলা ইউরোপীয় রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আল জাজিরার বিশেষ প্রতিবেদনে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই ঐতিহাসিক অর্জনের তথ্য উঠে এসেছে।

আরও পড়ুন: বিমানবন্দর সড়কে অপরাধ রদে বসছে শতাধিক উচ্চপ্রযুক্তির সিসিটিভি ক্যামেরা

এর পূর্বে ইতালির আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে চার দফায় বিচ্ছিন্নভাবে সবচেয়ে বেশি দিন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকার দীর্ঘ রেকর্ডটি জমা ছিল দেশটির প্রয়াত প্রবীণ রাজনীতিবিদ সিলভিও বেরলুসকোনির ঝুলিতে। তবে কোনো নির্দিষ্ট একক মেয়াদে নিরবচ্ছিন্নভাবে টানা ১ হাজার ৪১২ দিন ক্ষমতায় থাকার যে অনন্য রেকর্ড বেরলুসকোনির ছিল, মেলোনি ও তাঁর দল এবার সেই বহু বছরের পুরনো রেকর্ডটিকেও পেছনে ফেলে এক নতুন উচ্চতা স্পর্শ করেছে। উল্লেখ্য, ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতায় আরোহণ করেছিলেন জর্জিয়া মেলোনি। সেই বিজয়ের পর থেকে নানা রাজনৈতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ সংকট দক্ষতার সাথে সামলে নিয়ে তিনি নিজের প্রশাসনিক অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করতে সক্ষম হয়েছেন।

মেলোনি সরকারের এই রেকর্ড অর্জন প্রসঙ্গে ব্রাদার্স অব ইতালির তরুণ আইনপ্রণেতা গ্রাৎসিয়া দি মাজ্জো জানান যে, ইতালীয় রাজনীতির ইতিহাস বিবেচনায় মেলোনির এই অর্জন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দি মাজ্জো স্মরণ করিয়ে দেন যে, জর্জিয়া মেলোনি হলেন ইতালির সুদীর্ঘ ইতিহাসে প্রথম কোনো নারী যিনি প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হয়েছেন। কোনো প্রকার বিশেষ সুবিধা বা রাজনীতির শর্টকাট ছাড়াই কেবল কট্টর ডানপন্থি রাজনৈতিক আদর্শকে ধারণ করে দীর্ঘ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তাকে এই পদে পৌঁছাতে হয়েছে। তাছাড়াও, অতীতে বেনিটো মুসোলিনির ফ্যাসিবাদের কারণে ডানপন্থি রাজনীতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে যে আতঙ্ক বিদ্যমান ছিল, ক্ষমতায় আসার আগেই নিজের দূরদর্শী সিদ্ধান্তের দ্বারা দলকে সেই বিতর্কিত আদর্শ থেকে দূরে রাখার স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছিলেন মেলোনি।

আরও পড়ুন: বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চিঠি

তবে মেলোনি প্রশাসনের টানা দীর্ঘদিন টিকে থাকাকে ইতালীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রকৃত স্থিতিশীলতা হিসেবে দেখতে নারাজ দেশের অনেক প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদ। রোমের প্রখ্যাত রোমা ত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমকালীন ইতিহাসের শিক্ষক পাওলো কারুসি বলেন, কেবল ক্ষমতায় টিকে থাকার সময়কাল দিয়ে একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা পরিমাপ করা যায় না। তিনি জানান, মেলোনি সরকারের দীর্ঘদিন প্রশাসনিক ক্ষমতায় টিকে থাকার পেছনে ২০১৮ সালের বিশেষ নির্বাচনি আইনটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। উক্ত আইনের সুবাদে ডানপন্থি জোট সহজেই সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। এছাড়া ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থে দলটি নির্বাচনের পূর্বে দেওয়া বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি থেকে কৌশলগতভাবে সরে এসেছে বলেও তিনি দাবি করেন।

অপরদিকে বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা শিক্ষক পিয়েরো ইনিয়াজির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সরকারের এই দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারেনি। বরং ২০২৬ অর্থবছরে ইতালির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নামমাত্র শূন্য দশমিক ৬ শতাংশে সীমিত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা সমগ্র ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধির হার এবং সর্বোচ্চ সরকারি ঋণের চরম ঝুঁকি তৈরি করছে। শুধু অর্থনৈতিক সংকটই নয়, নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করা ও যেকোনো ধরনের প্রতিবাদ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে মেলোনি প্রশাসন ইতোমধ্যে অন্তত ৫২টি নতুন অপরাধ আইন প্রণয়ন করায় বিরোধী দলগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে।

সূত্র: আল জাজিরা ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন