প্রতিবেদন: আব্দুস ছাত্তার (শামীম) / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালার ত্রিশুর জেলায় ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক এক সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত আটজন উদীয়মান তরুণ শিক্ষার্থী ঘটনাস্থলেই সকরুণভাবে প্রাণ হারিয়েছেন। মর্মান্তিক এই পথ দুর্ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছে পার্শ্ববর্তী তামিলনাড়ু রাজ্যের শিক্ষার্থীদের বহনকারী একটি দ্রুতগামী যানবাহনের সাথে জাতীয় মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মালবাহী ভারী লরির মারাত্মক সংঘর্ষের ফলে। শনিবার (০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬) স্থানীয় পুলিশের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা বিষয়টির সত্যতা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে অবগত করেছেন। বিভীষিকাময় এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে রাজ্যের কৈপামঙ্গলম সংলগ্ন পানাম্বিকুন্নু নামক এলাকায়, গভীর রাতে যখন জাতীয় মহাসড়কে দূরপাল্লার যানবাহনের চলাচল কিছুটা শিথিল ছিল। অকালে ঝরে যাওয়া এই আট তরুণ প্রাণের করুণ প্রয়াণে সমগ্র এলাকা জুড়ে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং প্রতিবেশী তামিলনাড়ুতেও শোকাবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
আরও পড়ুন: গাজাবাসীকে সরিয়ে দেওয়ার ইসরায়েলি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান যুক্তরাষ্ট্রের
স্থানীয় পুলিশ ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর সূত্র থেকে প্রাপ্ত বিস্তারিত তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার গভীর রাতে আনুমানিক ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনাকবলিত পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। তামিলনাড়ু রাজ্য থেকে আসা একদল তরুণ শিক্ষার্থী একটি যাত্রীবাহী সুনির্দিষ্ট দূরপাল্লার যানবাহনে করে কেরালার ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণ শেষে নিজেদের গন্তব্যের দিকে প্রত্যাবর্তন করছিলেন। পথিমধ্যে গাড়িটি গুরুভায়ুর শহর এলাকা থেকে দ্রুতগতিতে কোডুঙ্গাল্লুরের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। যাত্রা পথে কৈপামঙ্গলম অঞ্চলের পানাম্বিকুন্নু এলাকায় পৌঁছালে চালক হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন অথবা রাতের গভীর অন্ধকারে মহাসড়কের পাশে থামিয়ে রাখা বিশালাকৃতির লরিটিকে সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে ব্যর্থ হন। এর ফলে দ্রুতগামী গাড়িটি প্রচণ্ড গতিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লরিটির পেছনের অংশে সজোরে আছড়ে পড়ে। ধাক্কার তীব্রতা এতটাই ভয়ংকর ছিল যে ছোট গাড়িটি দুমড়ে-মুচড়ে এক মুহূর্তে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
সংঘর্ষের প্রচণ্ডতম শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে উঠলে গভীর রাতে আশেপাশের বাসাবাড়ির ঘুমন্ত মানুষ চরম আতঙ্কে ঘর থেকে বাইরে বের হয়ে আসেন। তারা দ্রুত অকুস্থলে পৌঁছে চূর্ণবিচূর্ণ বাহনটির অভ্যন্তরে একাধিক রক্তাক্ত ও বিকৃত দেহ নিথর অবস্থায় আটকে থাকতে দেখেন। পরবর্তীতে জানা যায়, যানটিতে অবস্থানরত আটজন আরোহীর প্রত্যেকেই তীব্র আঘাতের কারণে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন। প্রাথমিক পর্যায়ে স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধারকাজ চালানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন, তবে লোহার কাঠামোর সাথে দেহগুলো শক্তভাবে আটকে থাকার কারণে সাধারণ উপায়ে তাদের বের করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় বিলম্ব না করে স্থানীয় কৈপামঙ্গলম থানা পুলিশ এবং ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ সার্ভিস বিভাগকে তাৎক্ষণিকভাবে দুর্ঘটনা সংক্রান্ত জরুরি বার্তা প্রদান করা হয়।
আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে জাতীয় স্কুল ও মাদ্রাসা ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ
সংবাদ পাওয়ার পরপরই ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ সার্ভিসের বিশেষায়িত দল এবং পুলিশ বাহিনীর একাধিক চৌকস দল অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস কর্মী এবং স্থানীয় অধিবাসীদের যৌথ উদ্যোগে মেটাল কাটার ও অত্যাধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম ব্যবহার করে গাড়িটির দরজা ও ওপরের অংশ কেটে ভেতর থেকে নিথর দেহগুলো একে একে বের করে আনা সম্ভব হয়। সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির প্রয়োজনীয় প্রাথমিক কাজ শেষ করে দেহগুলো অবিলম্বে ত্রিশুর সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমাগারে পাঠানোর সুব্যবস্থা করা হয়। হাসপাতালের কর্তব্যরত ডাক্তাররা তাদের পরীক্ষা শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে সকলকেই মৃত বলে ঘোষণা করেন।
ঘটনাস্থল থেকে দুর্ঘটনাকবলিত বাহনটির যে নম্বরপ্লেট উদ্ধার করা হয়েছে, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পুলিশ নিশ্চিত হতে পেরেছে যে গাড়িটি তামিলনাড়ু রাজ্যে নিবন্ধিত। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে জোরালো ধারণা তৈরি হয়েছে যে, প্রাণ হারানো সকল ব্যক্তিই তামিলনাড়ুর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ছিলেন, যারা অবকাশ যাপনের জন্য একসাথে ভ্রমণ বের হয়েছিলেন। নিহতদের সাথে থাকা মানিব্যাগ, ব্যবহৃত মোবাইল ফোন এবং প্রাপ্ত নথিপত্রের আলোকে প্রত্যেকের সঠিক ব্যক্তিগত পরিচয় জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে তামিলনাড়ু পুলিশ ও সম্ভাব্য স্বজনদের কাছে খবর পাঠানোর তৎপরতা শুরু হয়েছে যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে লাশ সনাক্ত করে স্বজনদের হাতে অর্পণ করা যায়।
কেরালা ও তামিলনাড়ুর সংযোগকারী জাতীয় মহাসড়কগুলোতে রাতের বেলা অপরিকল্পিতভাবে লরি পার্কিং করা এবং গতিসীমা লঙ্ঘনের কারণে বিগত কয়েক দিনে একাধিক আশঙ্কাজনক সড়ক দুর্ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এই ঘটনায় কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি বা চালকের অসতর্কতা ছিল কিনা, তা নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখতে কেরালা মোটর যান বিভাগ এবং পুলিশ যৌথ আইনি তদন্ত চালু করেছে। তরুণ শিক্ষার্থীদের এমন আকস্মিক ও হৃদয়বিদারক মৃত্যুতে তাঁদের সহপাঠী ও শিক্ষাঙ্গনে কান্নার রোল পড়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দ্রুত লাশ পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
সূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ও কেরালা পুলিশ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।