প্রতিবেদন: আব্দুস ছাত্তার (শামীম) / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার জনমিতি পরিবর্তন এবং সেখানকার অধিবাসীদের অন্য দেশে বা ভূখণ্ডে গণ-পুনর্বাসনের বিতর্কিত প্রস্তাব ঘিরে মিত্র দেশ ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক অভূতপূর্ব কূটনৈতিক মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। তেল আবিবের উগ্র রাজনৈতিক নীতির তোয়াক্কা না করে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ইসরায়েলি আবেদনকে কঠোর ভাষায় সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, গাজার স্থায়ী অধিবাসীদের তাদের জন্মভূমি থেকে উচ্ছেদ করার যেকোনো পরিকল্পনাকে আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি ও মার্কিন কূটনৈতিক অবস্থানের চরম পরিপন্থী হিসেবে গণ্য করা হয়। ইসরায়েলের নীতিনির্ধারকদের এই প্রস্তাব আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করায় ওয়াশিংটন প্রকাশ্যে এর তীব্র বিরোধিতা প্রকাশ করেছে।
আরও পড়ুন: আশুলিয়ায় সাভারের বন্ধ ঘরে শিশুসহ ৩ জনের গলিত মরদেহ উদ্ধার, হত্যার আলামত
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক এক উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী বক্তব্যে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ দাবি করেন যে, গাজা উপত্যকায় চলমান বহুমুখী সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হলো সেখানকার সমগ্র ফিলিস্তিনি জনসংখ্যাকে অন্য কোনো রাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে স্থানান্তর করা। তবে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা প্রধানের এমন বিতর্কিত মন্তব্যের পরপরই জোরালো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। শুক্রবার এক বিশেষ বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক দায়িত্বশীল প্রতিনিধি কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরাকে জানান, মার্কিন প্রশাসন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বহুল আলোচিত ২০ দফার বিশদ 'শান্তি রূপরেখা' অনুসরণ করেই মধ্যপ্রাচ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। ওই ঐতিহাসিক রূপরেখার ওপর ভিত্তি করেই বিগত সময়ে গাজায় কার্যকর যুদ্ধবিরতি অর্জিত হয়েছিল।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওই মুখপাত্র আল জাজিরাকে আরও বিশদভাবে পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত শান্তি পরিকল্পনার নির্দিষ্ট ১২ নম্বর দফায় অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছে যে, গাজা উপত্যকার কোনো ফিলিস্তিনি নাগরিককে নিজ বাসভূমি ত্যাগে বাধ্য করা যাবে না। যদি কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় অন্য কোথাও যেতে চান, তবে তিনি স্বাধীনভাবে যেতে পারবেন এবং পরবর্তীতে নিজ মাতৃভূমিতে নির্বিঘ্নে ফিরে আসার পূর্ণ অধিকার বজায় রাখবেন। মার্কিন প্রশাসন ফিলিস্তিনি জনগণকে গাজার স্বীয় ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে অবস্থান করতে উৎসাহিত করবে এবং একটি উন্নত ও নিরাপদ নতুন গাজা গড়ে তোলার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রদান করবে।
আরও পড়ুন: মেহেরপুরে অন্যায্য টোল ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কাঁচাবাজারে ধর্মঘট
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই প্রতিনিধি জোর দিয়ে উল্লেখ করেন যে, গাজার আপামর জনগণকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে অপসারিত করা, স্বভূমি থেকে বিতাড়িত করা কিংবা ভিন্ন কোনো স্থানে নিয়ে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে না এবং ভবিষ্যতেও তা মেনে নেবে না। তবে মার্কিন প্রশাসনের এমন কঠোর বার্তা প্রকাশ পাওয়া সত্ত্বেও নিজের অবস্থানে অনড় রয়েছেন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ। তিনি এক বিভ্রান্তিকর মন্তব্যে দাবি করেছেন যে, ট্রাম্প গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবটি পুরোপুরি বাতিল করেননি, বরং পরিস্থিতির সাপেক্ষে এটি সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছেন। কাটজের মতে, এই অভিবাসন ছাড়া গাজা সংকটের প্রকৃত ও দীর্ঘস্থায়ী কোনো সমাধান নেই।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, যদি ইসরায়েলের এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়, তবে তা হবে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জাতিগত নির্মূলের নজির। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সামরিক সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেও বেশি আর্থিক ও সামরিক সহায়তা দিয়েছে। তবে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘আরব সেন্টার’-এর গবেষক ইউসেফ মুনাওয়ার মনে করেন, ইসরায়েলের একটি অংশ বিশ্বাস করে যে ফিলিস্তিনিদের সাথে সহাবস্থান অসম্ভব। তাঁর মতে, ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার এই অপচেষ্টা কেবল গাজাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এর ক্ষতিকর প্রভাব পশ্চিম তীর এবং ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ওপরও গভীরভাবে পড়বে।
সূত্র: আল জাজিরা ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।