শাহজাদপুরে চরাঞ্চলে গৃহবধূর নিথর দেহ উদ্ধার, যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের অভিযোগ

শাহজাদপুরে চরাঞ্চলে গৃহবধূর নিথর দেহ উদ্ধার, যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের অভিযোগ
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: সুফিয়ান নোমান / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার যমুনা নদীবেষ্টিত দুর্গম সোনাতনী ইউনিয়নের বড় চামতারা গ্রামে রত্না খাতুন (২৩) নামের এক তরুণী গৃহবধূর চাঞ্চল্যকর মৃত্যু ঘিরে চরম ধোঁয়াশা ও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, যৌতুকের নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় রত্নার ওপর পাশবিক শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে তাকে বিষপানে আত্মহননে বাধ্য করা হয়েছে অথবা সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। হৃদয়বিদারক এই ঘটনার পর নিহতের শোকার্ত পিতা মো. শাহজাহান আলী বাদী হয়ে শাহজাদপুর থানায় একটি লিখিত এজাহার দায়ের করেছেন। দায়েরকৃত এজাহারে নিহতের স্বামীসহ মোট ছয়জন আসামির নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৩ থেকে ৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। দুর্গম চরাঞ্চলের এই ঘটনায় পুরো এলাকা জুড়ে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

আরও পড়ুন: স্পেন উপকূলে ২৬ দিন ভেসে থাকা নৌকা উদ্ধার, ৮০ জনের মৃত্যুর আশঙ্কা

শাহজাদপুর থানা পুলিশ ও এজাহার সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে নিহতের স্বামী মো. আব্দুল কাদেরকে (৩০)। এজাহারভুক্ত অন্য পাঁচ আসামি হলেন— মো. আবু সাঈদ (৩৭), মো. আব্দুস সামাদ (৩২), মো. তুষ্ট শেখ (৫৫), মো. আব্দুল আলীম (৩৭) এবং মোছা. রহিমা খাতুন (৩০)। এজাহারনামীয় অভিযুক্ত সকল ব্যক্তিই শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ইউনিয়নের যমুনা চরাঞ্চলীয় বড় চামতারা গ্রামের স্থায়ী অধিবাসী। নিহত রত্নার স্বজনদের স্পষ্ট দাবি, যৌতুকের অর্থের লোভে পড়ে আসামিরা দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধভাবে রত্না খাতুনের ওপর শারীরিক ও মানসিক প্রহার অব্যাহত রেখেছিল, যা শেষ পর্যন্ত তাঁর অকাল মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মর্মান্তিক এই ঘটনার পেছনের ইতিহাস তুলে ধরে নিহতের পিতা মো. শাহজাহান আলী জানান, আনুমানিক চার বছর পূর্বে শাহজাদপুর উপজেলার গুধিবাড়ী গ্রাম থেকে স্বীয় কন্যা রত্না খাতুনের সাথে বড় চামতারা গ্রামের বাসিন্দা মো. আব্দুল কাদেরের পারিবারিকভাবে শুভ বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল। তাঁদের চার বছরের দাম্পত্য জীবনে কনা খাতুন নামে তিন বছর বয়সী এক নিষ্পাপ কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। তবে সন্তান জন্মের পরও রত্নার সংসারে সুখ-শান্তির মুখ দেখা মেলেনি। বিয়ের পর থেকেই রত্নার স্বামী কোনো বৈধ কর্মসংস্থানে লিপ্ত না হয়ে নিয়মিত ক্ষতিকর জুয়া খেলায় আসক্ত হয়ে পড়েন। জুয়ার খরচ চালাতে এবং নিজের অসৎ চাহিদা মেটাতে স্বামী ও তাঁর পরিবারের লোকজন যৌতুকের অর্থের জন্য গৃহবধূর ওপর চাপ তৈরি করতে শুরু করেন।

আরও পড়ুন: মেহেরপুরে অন্যায্য টোল ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কাঁচাবাজারে ধর্মঘট

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, আব্দুল কাদের ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের পরামর্শে রত্নার কাছে দুই লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে প্রতিনিয়ত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো। মর্মান্তিক এই ঘটনার আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ দিন আগে রত্না বাবার বাড়িতে এসে আশ্রয় নেন এবং আকুল হয়ে জানান যে, যৌতুকের টাকা না নিলে তাকে আর সংসারে ফিরতে দেওয়া হবে না। পরবর্তীতে শিশু সন্তানের কথা চিন্তা করে গত ২২ আগস্ট রত্নাকে পুনরায় স্বামী আব্দুল কাদেরের ভিটায় পাঠানো হয়। কিন্তু গত ২৯ আগস্ট সকালে আবারও যৌতুকের টাকার দাবিতে রত্নার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। এরপর বেলা ১১টার দিকে মোবাইল ফোনে স্বজনদের রত্নার মৃত্যুর সংবাদ দেওয়া হয়।

খবর পেয়ে নিহতের স্বজনরা তাৎক্ষণিকভাবে আব্দুল কাদেরের বাড়িতে গিয়ে টিনের ঘরের বারান্দায় রত্না খাতুনের নিথর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। এই বিষয়ে শাহজাদপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, সংবাদ পাওয়ামাত্রই পুলিশ সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। সুরতহালকালে নিহতের শরীরের একাধিক স্থানে আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন মিলেছে। মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের উদ্দেশ্যে সিরাজগঞ্জ বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হস্তগত হলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হবে এবং সে অনুযায়ী আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

শাহজাদপুরের যমুনার দুর্গম চরাঞ্চলে এক তরুণী গৃহবধূর এমন নির্মম ও রহস্যজনক মৃত্যুতে স্থানীয় সর্বস্তরের মানুষের মাঝে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সচেতন সমাজ ও সাধারণ নাগরিকেরা এই অকাল প্রয়াণের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। মাতৃহীন হয়ে পড়া তিন বছরের অবুঝ শিশুকন্যা কনা খাতুনের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে এবং অপরাধের সঠিক বিচার নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসনের নিকট দ্রুততম সময়ে দায়ী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের জোর আবেদন জানিয়েছেন নিহতের স্বজন ও এলাকাবাসী।

সূত্র: শাহজাদপুর থানা পুলিশ ও নিহতের পরিবার।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন