স্পেন উপকূলে ২৬ দিন ভেসে থাকা নৌকা উদ্ধার, ৮০ জনের মৃত্যুর আশঙ্কা

স্পেন উপকূলে ২৬ দিন ভেসে থাকা নৌকা উদ্ধার, ৮০ জনের মৃত্যুর আশঙ্কা
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: আব্দুস ছাত্তার (শামীম) / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে টানা ২৬ দিন ধরে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ভাসতে থাকা একটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসীবাহী কাঠের ট্রলার উদ্ধার করেছে স্পেনের জরুরি উদ্ধারকারী দল। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া থেকে ইউরোপের ভূখণ্ডে পৌঁছানোর তীব্র আশায় উত্তাল সাগরে পাড়ি জমানো এই কাঠের বাহনটিতে শতাধিক অভাগা অভিবাসপ্রত্যাশী আরোহী ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য ও সুপেয় পানির প্রচণ্ড অভাব এবং সাগরের বিকট ঢেউয়ের মুখে পড়ে ট্রলারটি দিকভ্রষ্ট হয়ে গভীর মহাসাগরে নিখোঁজ হয়ে যায়। স্পেনের বিখ্যাত ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের অদূরে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধারকারী দল ৪৪ জন আরোহীকে চরম মুমূর্ষু অবস্থায় জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয় এবং ৫টি ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে। তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ক্যামিনান্দো ফ্রন্টেরাস’-এর দেওয়া তথ্য মতে, এই মর্মান্তিক সমুদ্রে ভাসমান দুর্ঘটনায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ৮০ জন অভিবাসীর প্রানহানি ও সলিল সমাধি ঘটেছে বলে প্রবল আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন: উল্টো পথে মন্ত্রীর গাড়ি, ট্রাফিক পুলিশের ৬ হাজার টাকা জরিমানা

স্প্যানিশ মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘ক্যামিনান্দো ফ্রন্টেরাস’ নিশ্চিত করেছে যে, গত ৭ আগস্ট গাম্বিয়ার উপকূলীয় এলাকা থেকে আনুমানিক এক শতাধিক যাত্রী নিয়ে এই ছোট কাঠের নৌকাটি ইউরোপ মহাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিল। ইউরোপে উন্নত জীবনযাপন ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার আশায় নিজেদের জীবনকে বড় বাজির মুখে ঠেলে দিয়ে নারী, শিশু এবং তরুণদের একটি বড় দল এই ভয়ংকর সমুদ্রযাত্রায় শামিল হয়েছিল। কিন্তু যাত্রার শুরুতেই প্রতিকূল আবহাওয়া ও ট্রলারের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এটি মূল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। সাগরের মাঝপথে ট্রলারের প্রয়োজনীয় জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ায় পানির তীব্র স্রোতে অনির্দিষ্ট গন্তব্যে ভাসতে থাকে নৌকাটি। দিনে দিনে নৌকায় মজুদ থাকা খাবার ও পানি ফুরিয়ে গেলে চরম পানিশূন্যতা ও অনাহারে একের পর এক যাত্রী সাগরের বুকে ঢলে পড়েন বলে জীবিত উদ্ধার হওয়া প্রত্যক্ষদর্শীরা উদ্ধারকারী দলকে জানিয়েছেন।

সমুদ্রসীমায় নিয়মিত টহল চলাকালীন স্প্যানিশ কোস্টগার্ড ও উদ্ধারকারী টিমের সদস্যরা দিকভ্রষ্ট এই ভাসমান নৌকাটিকে দেখতে পান। কালবিলম্ব না করে বিশেষ উদ্ধারকারী জাহাজ প্রেরণের মাধ্যমে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হয়। নৌকায় বেঁচে থাকা ৪৪ জন যাত্রীর শারীরিক অবস্থা ছিল মারাত্মক সংকটজনক ও শোচনীয়। দীর্ঘদিন অনাহারে থাকার কারণে তাদের অনেকেই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছিলেন। উদ্ধারকারী দলটি ৪৪ জন জীবিত আরোহী ও ৫টি মরদেহ স্পেনের গ্রান ক্যানারিয়ার আর্গুইনেগুইন বন্দরে নিয়ে আসে। সেখানে অপেক্ষমাণ জরুরি স্বাস্থ্যসেবা দল মুমূর্ষু রোগীদের দ্রুত চিকিৎসার জন্য স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করে। জীবিত উদ্ধার হওয়া বেশ কয়েকজন এখনো গুরুতর শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে।

আরও পড়ুন: বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চিঠি

নিখোঁজ থাকা বাকি যাত্রীদের উদ্ধারে আশপাশের সমুদ্র এলাকায় ব্যাপক অনুসন্ধান চালালেও অধিকাংশের কোনো সন্ধান মেলেনি। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, অনাহারে মৃত্যুবরণ করা অনেক যাত্রীর দেহ উত্তাল সাগরের ঢেউয়ে ভেসে গেছে। গাম্বিয়া থেকে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জমুখী এই আটলান্টিক সমুদ্র রুটটিকে আন্তর্জাতিক অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক ও প্রাণঘাতী পথ হিসেবে গণ্য করা হয়। দারিদ্র্য ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ থেকে বাঁচতে প্রতি বছর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দালালের খপ্পরে পড়ে এসব ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় সাগরে নামেন। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়া, দীর্ঘ পথ ও দিকভুলের কারণে প্রায়শই ঘটে এমন হৃদয়বিদারক ট্রাজেডি।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর জরিপ অনুযায়ী, আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে বিগত বছরগুলোতে হাজার হাজার আফ্রিকান অভিবাসীর প্রাণহানি ঘটেছে কিংবা তারা নিখোঁজ হয়েছেন। নিরাপদ আইনি ব্যবস্থার অভাব ও নিজ দেশে চরম দারিদ্র্যের কারণে তরুণেরা বাধ্য হয়ে এই মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছেন। স্পেনের মানবাধিকার কর্মীরা এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নজরদারি ও সমুদ্র উদ্ধার কার্যক্রম বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তারা জোর দিয়ে বলেছেন, নিয়মিত উদ্ধার অভিযান না বাড়ালে এবং মানবপাচার প্রতিরোধ না করলে আটলান্টিক মহাসাগরের এই মানবিক বিপর্যয় বন্ধ করা সম্ভব হবে না।

সূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন