রতনকান্দি হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের বিদায়লগ্নে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

রতনকান্দি হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের বিদায়লগ্নে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

একটি শিক্ষাজীবনের দীর্ঘ কর্মময় অধ্যায়ের পূর্ণাহুতি যেখানে হওয়ার কথা ছিল সহকর্মীদের ভালোবাসার স্মৃতি, পুষ্পস্তবক ও বিদায়ী সংবর্ধনার মাধ্যমে, সেখানে এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে চরম অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে নিজের শেষ কর্মদিবস পার করলেন সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী রতনকান্দি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া। গত ৩১ আগস্ট ২০২৬ ছিল তাঁর চাকরির প্রাতিষ্ঠানিক শেষ দিন। দীর্ঘ বছরের পেশাগত জীবনের ইতি টানার এই অন্তিম মুহূর্তটি যেখানে আবেগঘন পরিবেশ তৈরির কথা ছিল, সেখানে তা রূপ নিয়েছে অডিট জটিলতা ও বিদ্যালয়ের গচ্ছিত অর্থ তছরুপের গুরুতর অভিযোগে। শেষ দিনে আনন্দের সাথে অব্যাহতি পাওয়ার বদলে প্রশাসনিকভাবে তাঁর শেষ কর্মদিবসটি বিদায় সংবর্ধনাহীন এক বিতর্কিত অধ্যায়ে রূপ নিয়েছে।

আরও পড়ুন: সপ্তাহের মধ্যেই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশা রুহুল কবির রিজভীর

বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ ও স্থানীয় সূত্র থেকে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকালে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের স্থায়ী ফান্ড ও ছাত্র-ছাত্রীদের থেকে সংগৃহীত ফি আত্মসাতের অভিযোগ সামনে আসে। অর্থ সংক্রান্ত বৈষম্যের বিষয়টি ধরা পড়ার পর সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তা ও পরিচালনা কমিটির কাছে বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ দলিল উপস্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে সব নথিপত্র মেলাতে না পেরে নিজের ভুলত্রুটি বা হিসাবের অসঙ্গতি দূরীকরণে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য প্রধান শিক্ষক লিখিতভাবে ১০ কর্মদিবসের বর্ধিত সময় চেয়ে নিয়েছেন। এই অডিট প্রক্রিয়া নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে শেষ দিনেও প্রাতিষ্ঠানিক অব্যাহতি পত্র দেওয়া সম্ভব হয়নি, ফলে চাকুরির অন্তিম দিনেও তিনি ঝুলন্ত অবস্থায় রয়ে গেলেন।

প্রধান শিক্ষকের অবসরগ্রহণের সময় এমন আর্থিক কেলেঙ্কারির গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লে বিদ্যালয়ের সহকর্মী শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় অভিভাবকদের মাঝে তীব্র গুঞ্জন ও আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সহকর্মীদের অনেকের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বিদ্যালয়ের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠায় আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সংবর্ধনা আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। একটি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের পর শেষ লগ্নে এসে তহবিল তছরুপের মতো অভিযোগে জড়িয়ে পড়াটা বিদ্যালয়ের সার্বিক ভাবমূর্তির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন সচেতন অভিভাবক মহল।

আরও পড়ুন: রায়গঞ্জের নিমগাছি বাজারে অগ্নিকাণ্ডে ৭ দোকান ছাই, ক্ষতি ১০ লাখ

গোলাম কিবরিয়ার অতীত প্রশাসনিক আচরণের বিভিন্ন বিষয়ও এখন স্থানীয় জনতার মুখে মুখে ফিরছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের বেতন বা ফি মওকুফের বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ও অনমনীয় মনোভাব প্রদর্শন করতেন। দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা কোনো আর্থিক ছাড় চাইলে তিনি তা বিবেচনা করতেন না। এমনকি সরকারি উপবৃত্তির আওতায় থাকা মেধাবী ও দুস্থ শিক্ষার্থীদের থেকেও নিয়মিত বেতন আদায় করা হতো বলে বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় অধিবাসীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তুলছেন, যে শিক্ষক অভাবী শিক্ষার্থীদের ফি মওকুফে একবিন্দু সহানুভূতি দেখাননি, তাঁর বিরুদ্ধেই এখন বিদ্যালয়ের বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠছে কেন?

তবে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ মহল ও আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কোনো ব্যক্তির ওপর উত্থাপিত অভিযোগই চূড়ান্ত সত্য নয়। সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ও অডিট টিমের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত এবং হিসাব যাচাইয়ের পরই প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হবে। আগামী ১০ দিনের মধ্যে প্রধান শিক্ষক গোলাম কিবরিয়া যদি তাঁর জমা দেওয়া নথিপত্রের পক্ষে সঠিক ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা প্রদান করতে সক্ষম হন, তবেই বিষয়টি সুরাহা পাবে। বিদায়লগ্নে এমন অভিযোগের পাহাড় মাথায় নিয়ে অবসর নেওয়া যেকোনো শিক্ষকের জন্য যেমন বেদনার, তেমনি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন হওয়াই সময়ের দাবি।

সূত্র: বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ ও স্থানীয় অডিট সূত্র।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন