প্রতিবেদন: আব্দুস ছাত্তার (শামীম) / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
রাজধানী ঢাকার অত্যন্ত ব্যস্ততম সার্কিট হাউজ রোডে ট্রাফিক আইন অমান্য করে উল্টো পথে গাড়ি চালানোর অপরাধে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের সরকারি পতাকাবাহী গাড়ির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকাল ৯টা ৮ মিনিটের দিকে সার্কিট হাউস রোড সংলগ্ন এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর এমন নজিরবিহীন ও সাহসিক পদক্ষেপে সড়ক নিরাপত্তা বজায় রাখতে আইনের সমপ্রয়োগের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো। ডিএমপি ট্রাফিক সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, উল্টো রাস্তায় গাড়ি চালানোর কারণে ডিএমপি অধ্যাদেশের অধীন নির্দিষ্ট ধারায় ড্রাইভারকে অভিযুক্ত করে দুটি পৃথক মামলায় সর্বমোট ৬ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে জাতীয় স্কুল ও মাদ্রাসা ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ
ঘটনার সুনির্দিষ্ট বিবরণ বিশ্লেষণ করে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকালে যখন রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে সচিবালয়মুখী যানবাহনের প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়, ঠিক সেই মুহূর্তে একটি পতাকাবাহী বিলাসবহুল গাড়ি সার্কিট হাউজ সড়ক ধরে সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে উল্টো দিক দিয়ে সচিবালয়ের গন্তব্যে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছিল। তৎকালীন সময়ে সেখানে দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক পুলিশের কর্তব্যরত কর্মকর্তা ও সদস্যগণ তৎক্ষণাৎ গাড়িটির গতিপথ রোধ করে সেটিকে থামিয়ে দেন। ট্রাফিক পুলিশের অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৮-২১২৫ রেজিস্ট্রেশন নম্বরযুক্ত ওই গাড়িটি মূলত বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মাননীয় মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের দাপ্তরিক ব্যবহৃত বাহন। গাড়িটি থামানোর পর চালককে ডিএমপি ট্রাফিক আইন ও সড়ক পরিবহন বিধিমালার সুস্পষ্ট ধারা লংঘনের বিষয়টি অবহিত করা হয় এবং সাথে সাথেই আইনের যথাযথ প্রয়োগ ঘটানো হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সূত্রমতে জানা গেছে, ঘটনার সময় বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত স্বশরীরে ওই গাড়ির ভেতরেই উপবিষ্ট ছিলেন। ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা গাড়িটি আটক করার পর চালককে বিনীতভাবে জানান যে, রাজধানীর রাস্তায় কোনো ধরনের বিশেষ অগ্রাধিকার ছাড়া উল্টো পথে যানবাহন পরিচালনা সরাসরি আইনের গুরুতর ব্যাঘাত ঘটায়। ফলে কোনো রকম শিথিলতা প্রদর্শন না করে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক কর্মকর্তা তাত্ক্ষণিকভাবে অনস্পট কেস স্লিপ ইস্যু করেন। ট্রাফিক আইন ভঙ্গের দুটি সুনির্দিষ্ট উপধারায় ৩ হাজার টাকা করে দুটি মামলায় সর্বমোট ৬ হাজার টাকার জরিমানা জমা দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করা হয়। সরকারি আমলা ও ভিআইপি প্রটোকল থাকা সত্ত্বেও পুলিশ বাহিনীর এরূপ কঠোর আইনি অবস্থান সাধারণ পথচারীদের মাঝে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
আরও পড়ুন: মেহেরপুরে অন্যায্য টোল ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কাঁচাবাজারে ধর্মঘট
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাফিক পুলিশ যখন সার্কিট হাউস রোডে উল্টো পথে আসা মন্ত্রীর গাড়িটি থামিয়ে আইনি নথিপত্র প্রস্তুত করছিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই পাশের নির্ধারিত সড়ক দিয়ে দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল ও সুরক্ষাবহর পূর্ণাঙ্গ ট্রাফিক নির্দেশনা মেনে স্বাভাবিক গতিতে সচিবালয়ের দিকে অতিক্রম করছিল। দেশের শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত সরকার প্রধান যেখানে নিজে সাধারণ ট্রাফিক সিগন্যাল ও নিয়মনীতি অনুসরণ করে চলাচল করছেন, সেখানে কোনো মন্ত্রী বা পদস্থ কর্মকর্তার এমন বেপরোয়া ভঙ্গিতে উল্টো পথে গাড়ি চালানো অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় হিসেবে গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। এই দৃশ্য সরাসরি প্রত্যক্ষকারী পথচারীরা পুলিশের দায়িত্বশীল ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
বাংলাদেশের সড়ক ব্যবস্থাপনার ইতিহাসে কোনো ক্ষমতাসীন ক্যাবিনেট মন্ত্রীর দাপ্তরিক গাড়ির বিরুদ্ধে উল্টো পথে চলার কারণে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মামলা দায়ের ও আর্থিক জরিমানা আদায়ের ঘটনা এটাই প্রথম। অতীতেও বিভিন্ন সরকারের মেয়াদে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য কিংবা উচ্চপদস্থ আমলাদের গাড়ি যানজট এড়াতে কিংবা দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর অজুহাতে উল্টো পথে যাতায়াত করতে দেখা গেছে। এসব ঘটনা বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচিত হলেও ক্ষেত্রবিশেষে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ থেকে পুলিশ বিরত থাকত। তবে এবার প্রধানমন্ত্রীর কঠোর ট্রাফিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার নীতির আলোকে কোনো শিথিলতা প্রদর্শন না করে সরাসরি আইনি নোটিশ ইস্যু করা হয়েছে, যা দেশের প্রশাসন ও রাজনীতিবিদদের জন্য এক স্পষ্ট বার্তা বহন করে।
ঢাকা ট্রাফিক পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করে জানান যে, আইনের চোখে দেশের প্রত্যেক নাগরিক সমান—এই নীতিকে বাস্তবে রূপ দিতেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যেখানে প্রধানমন্ত্রী নিজে সকল ট্রাফিক বিধিবিধান মেনে সচিবালয়ে আসা-যাওয়া করেন এবং তীব্র যানজটের মধ্যেও ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলায় আস্থাশীল থাকেন, সেখানে মন্ত্রী, সচিব কিংবা অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উল্টো পথে গাড়ি চালানো কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি দেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি সুনির্দিষ্ট বার্তা প্রতিষ্ঠা করেছে যে, পদ মর্যাদা যত উঁচুই হোক না কেন, গণপরিবহন ব্যবস্থা ও সড়ক আইন অমান্য করে কেউ পার পাবে না।
রাজধানীর যানজট নিরসন এবং সড়ক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে গঠিত এই দৃষ্টান্তমূলক আইনি পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নাগরিক সমাজ ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কর্মীরা। তারা মনে করেন, ভিআইপি সংস্কৃতির নামে সাধারণ সড়ক ব্যবহারকারীদের ভোগান্তিতে ফেলা বন্ধ করতে এটি একটি স্থায়ী মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন স্তর থেকে নিচু স্তর পর্যন্ত সড়ক আইন যথাযথভাবে পালনের সংস্কৃতি গড়ে উঠলেই কেবল ঢাকা শহরের যানজট ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধ সম্ভব হবে। সরকারি গাড়ি ও নীতি-নির্ধারকরা যদি সঠিকভাবে ট্রাফিক শৃঙ্খলা অনুসরণ করেন, তবে সাধারণ যানবাহন চালকরাও আইন মানতে উৎসাহিত হবেন।
সূত্র: ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।