নরসিংদীর শিবপুরে ছেলের নৃশংস হামলায় বাবার মৃত্যু

নরসিংদীর শিবপুরে ছেলের নৃশংস হামলায় বাবার মৃত্যু
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: আব্দুস ছাত্তার (শামীম) / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলায় সুপ্রভাতে এক হৃদয়বিদারক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে গেছে পুরো এলাকা। নিজ ঘরের ভেতর পারিবারিক কলহ কিংবা আকস্মিক উন্মত্ততায় আপন জ্যেষ্ঠ পুত্রের হাতে করুণভাবে প্রাণ হারিয়েছেন ৬১ বছর বয়সী বৃদ্ধ পিতা আব্দুল বাছেদ। শুক্রবার (০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬) ভোররাতের দিকে উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ভরতেরকান্দী পূর্বপাড়া গ্রামে চরম নির্মম এই অপরাধ সংঘটিত হয়। পিতাকে রক্ষা করতে গিয়ে ঘাতক বড় ভাইয়ের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর জখম হয়েছেন নিহতের ছোট ছেলে এবং নিজ স্ত্রী। চিকিৎসাধীন অবস্থায় উদ্ধারকারীরা মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করার পর পুরো গ্রাম জুড়ে এক শোকাবহ ও থমথমে পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। যে বয়সে সন্তানের পরম স্নেহ ও আশ্রয়ে জীবনের শেষ দিনগুলো অতিবাহিত করার কথা ছিল, সেই বয়সে স্বীয় সন্তানের হাতেই মর্মান্তিক পরিণতি বরণ করতে হলো বৃদ্ধ পিতাকে। মর্মান্তিক এই ঘটনাটি স্থানীয় অধিবাসীদের গভীর উদ্বেগে নিপতিত করেছে।

আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে চরাঞ্চলে গৃহবধূর নিথর দেহ উদ্ধার, যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের অভিযোগ

পারিবারিক ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, ঘটনার সময় গভীর রাতে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা নিজ নিজ কক্ষে সুষুপ্ত অবস্থায় ছিলেন। নিহতের ছোট ছেলে ও কন্যাদের অভিযোগ অনুযায়ী, ভোররাত চারটার পর হঠাৎ করেই পরিবারের সবাইকে চমকে দিয়ে প্রবীণ পিতা আব্দুল বাছেদের শয়নকক্ষে প্রবেশ করে তাঁর বড় ছেলে ৩৫ বছর বয়সী সাকিল। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে প্রবীণ বাবার ওপর আকস্মিক ও নৃশংস হামলা শুরু করে। সাকিলের তীব্র আক্রমণ ও目标的 আর্তচিৎকার শুনে পাশে থাকা ছোট ভাই এবং মা দ্রুত ছুটে আসেন। তাঁরা দুজন জীবন বাজি রেখে পিতাকে বাঁচানোর চেষ্টা করলে উন্মত্ত সাকিল তাদের ওপরও ধারালো অস্ত্র নিয়ে চড়াও হয়, যার ফলে ছোট ভাই ও মা মারাত্মক রক্তাত্মক জখমপ্রাপ্ত হন। একপর্যায়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও গুরুতর জখমের কারণে ঘটনাস্থলেই প্রবীণ আব্দুল বাছেদ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

ভোররাতের এই করুণ আর্তনাদ ও হট্টগোলের শব্দ শুনে প্রতিবেশীরা অতি দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে ধাবিত হন এবং রক্তাপ্লুত অবস্থায় পরিবারটিকে দেখতে পান। স্থানীয় জনগণ দ্রুত শিবপুর থানা পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করলে ভোরেই আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর একটি বিশেষ দল দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। পুলিশ প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ শেষে ঘটনাস্থল থেকে ঘাতকের হাতে নিহত আব্দুল বাছেদের নিথর মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে। পরবর্তীতে মৃতদেহের প্রাতিষ্ঠানিক ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে মরদেহটি নরসিংদী সদর হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করা হয়। একই সময়ে ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়া নিহতের স্ত্রী ও ছোট ছেলেকে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়, যেখানে তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

আরও পড়ুন: কাহালুতে ৫০ পিস টাপেন্টাডলসহ আটক ২ মাদক কারবারি

নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে ইতোমধ্যেই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করেছে শিবপুর থানা পুলিশ। শিবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ কোহিনূর মিয়া বিষয়টি নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, ভরতেরকান্দী এলাকায় পারিবারিক অভ্যন্তরে জন্ম নেওয়া এই নৃশংসতায় পুত্রের হাতেই পিতার নির্মম মৃত্যু ঘটেছে। হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত সাকিল ঘটনার পরপরই কৌশল অবলম্বন করে এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেছে। পলাতক সাকিলকে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের একাধিক দল মাঠে নেমেছে এবং সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হচ্ছে। তিনি আরও জানান, প্রাথমিক ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর এবং পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক মামলা দায়েরের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত বেগবান করা হবে।

এদিকে প্রবীণ বাবার এমন মর্মান্তিক প্রয়াণ ও পরিবারের ওপর নেমে আসা এই পৈশাচিক ট্রাজেডিতে স্বজনদের অব্যাহত আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে ভরতেরকান্দী গ্রামের বাতাস। নিহতের কান্নার রোলে কেঁদে উঠছেন প্রতিবেশীরাও। স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ অধিবাসীরা এই নৃশংস ঘটনায় গভীর ক্ষোভ ও হতবাক অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। সামাজিক নিরাপত্তা ও পারিবারিক মূল্যবোধের এমন চরম অবক্ষয় নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন এলাকার সচেতন নাগরিক সমাজ। প্রবীণ বয়সে যেখানে কনিষ্ঠ বা জ্যেষ্ঠ সন্তানের কাঁধই ছিল একমাত্র ভরসা, সেখানে এমন অপরাধ কেবল একটি পরিবারকে ধ্বংস করেনি, বরং গোটা সমাজের বিবেককে কাঁপিয়ে দিয়েছে। স্থানীয়রা অবিলম্বে ঘাতক পুত্র সাকিলকে গ্রেপ্তার করে সর্বোচ্চ শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন, যেন ভবিষ্যতে কেউ নিজের জন্মদাতা পিতা-মাতার ওপর এমন পৈশাচিক হামলা চালানোর সাহস না পায়।

বর্তমান সমাজে পারিবারিক কলহ, মনস্তাত্ত্বিক বিশৃঙ্খলা ও নৈতিক অবক্ষয়ের হার যে কতটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, নরসিংদীর এই মর্মান্তিক ঘটনাটি তারই একটি জ্বলন্ত প্রমাণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। স্থানীয় বিশিষ্ট সমাজসেবকরা মনে করছেন, পারিবারিক সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং মানসিকভাবে বিপথগামী তরুণদের কাউন্সিলিং নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একই সাথে প্রবীণ নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পুলিশ প্রশাসন নিশ্চিত করেছে যে অত্যন্ত দ্রুত সময়ের মধ্যেই আসামিকে আইনের মুখোমুখি করা হবে এবং উপযুক্ত শাস্তির বিধান নিশ্চিত করে ভুক্তভোগী পরিবারটিকে ন্যায়বিচার এনে দেওয়া হবে।

সূত্র: শিবপুর থানা পুলিশ ও স্বজন।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন