কলাপাড়ায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পুকুরে ট্যুরিস্ট বাস, আহত ১৩

কলাপাড়ায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পুকুরে ট্যুরিস্ট বাস, আহত ১৩
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: আব্দুস ছাত্তার (শামীম) / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে ঢাকা থেকে পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটামুখী একটি বিলাসবহুল ডাবল ডেকার স্লিপার বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়ক সংলগ্ন গভীর পুকুরে নিমজ্জিত হওয়ার এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকাল আনুমানিক সাড়ে সাতটার দিকে কলাপাড়া-কুয়াকাটা আঞ্চলিক মহাসড়কের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ খলিলপুর স্ট্যান্ড সংলগ্ন স্থানে এই আকস্মিক দুর্ঘটনাটি ঘটে। যাত্রীবাহী বাসটি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে চলন্ত অবস্থায় হঠাৎ করে চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে যানটি মহাসড়ক থেকে ছিটকে পড়ে পার্শ্ববর্তী একটি জলাশয়ে তলিয়ে যায়। দুর্ঘটনা কবলিত ওই বাসটিতে থাকা অন্তত দুই ডজন যাত্রী পানিবন্দী হয়ে তীব্র আতঙ্ক ও জীবনের চরম ঝুঁকিতে পড়েন। স্থানীয় বাসিন্দাদের তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তা ও কলাপাড়া ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের দ্রুত উদ্ধার অভিযানের ফলে কোনো প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলেও অন্তত ১৩ জন যাত্রী মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন।

আরও পড়ুন: নরসিংদীর শিবপুরে ছেলের নৃশংস হামলায় বাবার মৃত্যু

দুর্ঘটনাকবলিত বাসটির বিবরণ ও যাত্রী পরিচিতি বিশ্লেষণ করে জানা যায়, ‘আইকনিক পরিবহন’ নামের বিলাসবহুল ওই দূরপাল্লার স্লিপার কোচটি রাজধানীর ঢাকা থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন পর্যটক নিয়ে সাগরকন্যা কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল। বাসটিতে ভ্রমণরত যাত্রীদের অধিকাংশ যাত্রীই ছিলেন বাংলাদেশের স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী, যারা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কুয়াকাটায় দলবদ্ধভাবে ঘুরে বেড়াতে ও বিনোদনের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন। ঢাকা থেকে দীর্ঘ রাতের সফর শেষে সকালের আলো ফুটতেই গন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছানোর মুহূর্তে কলাপাড়ার খলিলপুর এলাকায় পৌঁছালে মারাত্মক বিপত্তি ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দূরপাল্লার বাসটি আঁকাবাঁকা ও সরু সড়ক অতিক্রমকালে আকস্মিকভাবে বাম পাশের খাদে গড়িয়ে পড়ে গভীর পুকুরের পানিতে সম্পূর্ণ তলিয়ে যায়। পানির প্রবল চাপে বাসের স্বয়ংক্রিয় দরজা ও জানালাপত্র আঁটসাঁট হয়ে বন্ধ হয়ে পড়ায় ভেতরে থাকা যাত্রীরা দীর্ঘক্ষণ আটকে থেকে চরম শ্বাসকষ্ট ও প্রাণভয়ে চিৎকার করতে থাকেন।

বিকট শব্দে ভারী যানবাহন পুকুরে পড়ে যাওয়ার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে স্থানীয় অধিবাসীরা কালবিলম্ব না করে দ্রুত উদ্ধার তৎপরতায় এগিয়ে আসেন। ঘটনা সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পরপরই কলাপাড়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একটি দক্ষ উদ্ধারকারী টিম অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে স্থানীয় জনতাকে সাথে নিয়ে সমন্বিতভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে। বাসের ভেতরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আটকে থাকা যাত্রীদের অক্ষত অবস্থায় বের করে আনতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বিশেষ উদ্ধার সরঞ্জাম ব্যবহার করে বাসের শক্ত ও মোটা কাঁচ ভেঙে ফেলেন। জানালা ও পেছনের জরুরি বহির্গমন অংশ ভেঙে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে একের পর এক আটকে থাকা যাত্রীদের উদ্ধার করে ডাঙ্গায় নিয়ে আসা হয়। দ্রুত ও সাহসিকতার সাথে পরিচালিত এই উদ্ধার কার্যক্রমে বড় ধরনের সম্ভাব্য প্রাণহানি ও মানবিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পান বাসের ভেতরে থাকা সকল আরোহী। তবে বাসের গ্লাস ভাঙার সময় এবং দুর্ঘটনাকালীন প্রচণ্ড ঝাঁকুনি ও ধাক্কায় অন্তত ১৩ জন যাত্রী শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক আঘা প্রাপ্ত হয়ে রক্তাক্ত হন।

আরও পড়ুন: কিশোরগঞ্জে কনেকে তুলে নেওয়ার পর তামান্নার ভিডিও বার্তা

উদ্ধারকৃত আহতদের তাৎক্ষণিকভাবে প্রাথমিক সেবা প্রদান করে ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় পুলিশের সুসংগঠিত সহায়তায় নিকটস্থ কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয় এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা বিভাগে ভর্তি করা হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকদের সূত্রে জানা গেছে, ভর্তি হওয়া আহত ১৩ জন যাত্রীর মধ্যে অন্তত ৬ জনের শারীরিক অবস্থা বেশ আশঙ্কাজনক ও জটিল। তাঁদের শরীরে গুরুতর হাড় ভাঙা, মাথায় মারাত্মক আঘাত এবং অভ্যন্তরীণ নানা জখমের আলামত প্রত্যক্ষ করা গেছে। কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানিয়েছেন যে, গুরুতর আহতদের শারীরিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং পর্যবেক্ষণ শেষে প্রয়োজনে উন্নত ও জটিল চিকিৎসার উদ্দেশ্যে পটুয়াখালী জেলা সদর হাসপাতাল কিংবা বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণে উদ্ধারকৃত অন্যান্য যাত্রী ও প্রাক্তন জবি শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র মানসিক ট্রমা ও আতঙ্ক বিরাজ করতে দেখা গেছে।

দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই কলাপাড়া থানা পুলিশের একটি চৌকস দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক মহাসড়কে স্বাভাবিক যানবাহন চলাচল বজায় রাখতে দায়িত্ব পালন করে। স্থানীয় অধিবাসীদের প্রাথমিক অভিযোগ, মহাসড়কের ওই নির্দিষ্ট মোড়ে অসাবধানতাবশত অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো এবং চালকের তীব্র ক্লান্তি ও অসতর্কতাই মূলত এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছে। ঘটনার পর পরই সুযোগ বুঝে দুর্ঘটনাকবলিত আইকনিক পরিবহনের বেপরোয়া চালক ও তাঁর সহকারী (হেলপার) এলাকা ছেড়ে দ্রুত কৌশলে চম্পট দেয়। স্থানীয় জনতা ও ক্ষতিগ্রস্ত পর্যটকরা এই দায়িত্বজ্ঞানহীন চালকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন যাতে দূরপাল্লার মহাসড়কগুলোতে চালকের খামখেয়ালিপনায় যাত্রী সাধারণের মূল্যবান জীবন বারবার ঝুঁকিতে না পড়ে।

দুর্ঘটনা পরবর্তীতে গৃহীত আইনি ও প্রশাসনিক তদারকি সম্পর্কে কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান যে, দুর্ঘটনার বার্তা পাওয়া মাত্রই পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা অতি দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে সফলতার সাথে যৌথ উদ্ধার কাজ সম্পন্ন করেছে। একই সাথে পানিতে ডুবে যাওয়া ক্ষতিগ্রস্ত বাসটি উদ্ধারকাজের সুবিধার্থে রশিসংযুক্ত ক্রেন ও উদ্ধারকারী যানবাহনের সাহায্যে টেনে ডাঙায় তোলার প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, ঘটনার পর থেকে পলাতক থাকা বাসের চালক ও হেলপারকে শনাক্ত ও অতি দ্রুত গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই পুলিশের অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী একটি প্রাতিষ্ঠানিক মামলা দায়েরের আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। বর্তমানে দুর্ঘটনাস্থলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ জোরদার রয়েছে এবং মহাসড়কে যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও নিরাপদ রয়েছে।

সূত্র: ফায়ার সার্ভিস ও কলাপাড়া থানা পুলিশ।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন