আশুলিয়ায় সাভারের বন্ধ ঘরে শিশুসহ ৩ জনের গলিত মরদেহ উদ্ধার, হত্যার আলামত

আশুলিয়ায় সাভারের বন্ধ ঘরে শিশুসহ ৩ জনের গলিত মরদেহ উদ্ধার, হত্যার আলামত
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: আব্দুস ছাত্তার (শামীম) / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

ঢাকার অদূরে শিল্পাঞ্চল সাভারের আশুলিয়ায় একটি বন্ধ ভাড়া বাসা থেকে এক শিশু ও নারী-পুরুষসহ একই পরিবারের তিনজনের গলিত মরদেহ উদ্ধারকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ও ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শনিবার (০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬) রাতে আশুলিয়ার মধ্য জামগড়া এলাকার একটি আবাসিক ভবনের বন্ধ কক্ষ থেকে এই তিনজনের মৃতদেহ উদ্ধার করে আশুলিয়া থানা পুলিশ। দীর্ঘ সময় আবদ্ধ কক্ষে থাকার কারণে মরদেহগুলোতে মারাত্মক পচন ধরে চারপাশে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের খবরের ভিত্তিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে কপাট ভেঙে বিছানার ওপর থেকে মৃতদেহগুলো উদ্ধার করে। প্রাথমিক আলামত ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা মনে করছে যে, এটি একটি সুপরিকল্পিত ও নির্মম হত্যাকাণ্ড। অনাকাঙ্ক্ষিত এই ঘটনার পর থেকে সমগ্র আশুলিয়া জুড়ে চরম থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে।

আরও পড়ুন: মালয়েশিয়ার ইপোহে ইমিগ্রেশনের সাঁড়াশি অভিযান, বাংলাদেশিসহ ১৭৫ প্রবাসীকে আটক

স্থানীয় অধিবাসী ও অন্যান্য ভাড়াটিয়াদের দেওয়া তথ্য থেকে জানা গেছে, আশুলিয়ার মধ্য জামগড়া এলাকার উক্ত ভাড়া ফ্ল্যাটের নির্দিষ্ট কক্ষটির দরজা এবং জানালা দীর্ঘদিন ধরেই সব সময় ভেতর বা বাহির থেকে বন্ধ থাকত। অন্য ভাড়াটিয়ারা মনে করেছিলেন যে হয়তো কক্ষের অধিবাসীরা কাজের প্রয়োজনে বাইরে গেছেন। কিন্তু গত শুক্রবার রাতের দিকে হঠাৎ করেই বন্ধ ঘরের ভেতর থেকে এক অস্বস্তিকর পচা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। শনিবার দুর্গন্ধ ক্রমশ পুরো ভবনের করিডোরে ছড়িয়ে পড়লে প্রতিবেশীদের মনে চরম সন্দেহের সৃষ্টি হয়। তারা দরজায় বারবার ধাক্কাধাক্কি ও ডাকাডাকি করেও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাননি। পরবর্তীতে বাড়ির মালিককে বিষয়টি জানানো হয় এবং স্থানীয়দের সহায়তায় অতি দ্রুত আশুলিয়া থানায় পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

খবর পাওয়ামাত্রই আশুলিয়া থানা পুলিশ এবং অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর ফরেনসিক টিম তড়িৎ গতিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ প্রতিনিধিরা স্থানীয় অধিবাসীদের উপস্থিতিতে অবরুদ্ধ কক্ষটির দরজা উন্মোচন করে এক ভয়াল দৃশ্য দেখতে পান। ঘরের ভেতরে একই বিছানার ওপর তিনটি পৃথক নিথর দেহ পাশাপাশি পড়ে ছিল। নিহতদের মধ্যে একজন পুরুষ, একজন নারী এবং একটি ছোট শিশু রয়েছে। তাদের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে তারা স্বামী, স্ত্রী এবং তাদের শিশু সন্তান। তবে মরদেহগুলোতে তীব্র পচন ধরে আকৃতি বিকৃত হয়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে কারো চেহারা চেনা সম্ভব হয়নি।

আরও পড়ুন: স্পেন উপকূলে ২৬ দিন ভেসে থাকা নৌকা উদ্ধার, ৮০ জনের মৃত্যুর আশঙ্কা

সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির সময় পুলিশ অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ আলামত প্রত্যক্ষ করেছে। নিহত পুরুষের গলার চারপাশে একটি সুতি গামছা শক্তভাবে প্যাঁচানো ছিল, যা গলায় ফাঁস দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্তরা বা পরিচিত কেউ ঘরে প্রবেশ করে তিনজনকে শ্বাসরোধে হত্যা শেষে দরজা বাইরে থেকে আটকে পালিয়ে গেছে। কয়েক দিন আগের ঘটনা হওয়ায় লাশের শরীরে পচন ধরে বিকট দুর্গন্ধ ছড়ায়। সিআইডির টিম ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা নমুনা ও ফিঙ্গারপ্রিন্টসহ প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করেছে।

আশুলিয়া থানার তদন্তকারীরা জানান, নিহতদের সঠিক পরিচয় উদ্ঘাটন এবং এই হত্যাকাণ্ডের মূল অপরাধীদের খুঁজে বের করতে চারমুখী তদন্ত শুরু হয়েছে। পুলিশ খতিয়ে দেখছে এরা কত দিন আগে বাসাটি ভাড়া নিয়েছিলেন এবং বাড়ির মালিকের কাছে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র জমা ছিল কিনা। শিল্পাঞ্চল সাভারে বহু শ্রমিক বসবাস করার কারণে সঠিক তথ্য না নিয়ে বাসা ভাড়ার প্রবণতা দেখা যায়। তবে জাতীয় তথ্যভাণ্ডার ও আধুনিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

একই ঘর থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই জামগড়া এলাকায় চরম আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, লাশগুলো উদ্ধার শেষে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক রিপোর্ট পাওয়ার পরই মৃত্যুর সঠিক কারণ ও সময় জানা যাবে। এ ঘটনায় জড়িত ঘাতকদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করার জোরালো আশ্বাস দিয়েছে পুলিশ প্রশাসন।

সূত্র: আশুলিয়া থানা পুলিশ ও স্থানীয় অধিবাসী।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন