মালয়েশিয়ার ইপোহে ইমিগ্রেশনের সাঁড়াশি অভিযান, বাংলাদেশিসহ ১৭৫ প্রবাসীকে আটক

মালয়েশিয়ার ইপোহে ইমিগ্রেশনের সাঁড়াশি অভিযান, বাংলাদেশিসহ ১৭৫ প্রবাসীকে আটক
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: আব্দুস ছাত্তার (শামীম) / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়ার পেরাক রাজ্যের ইপোহ অঞ্চলে নজিরবিহীন এক চিরুনি অভিযান পরিচালনা করে বিপুল সংখ্যক অবৈধ প্রবাসীকে আইনানুগ হেফাজতে নিয়েছে দেশটির অভিবাসন বিভাগ (জাবাতান ইমিগ্রেশন মালয়েশিয়া)। শুক্রবার (০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬) রাতে এলাকার বিভিন্ন শিল্প কারখানা, উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠান এবং ব্যস্ততম ফুড কোর্টগুলোতে আকস্মিক এই সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়। এনফোর্সমেন্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে পুরো এলাকা জুড়ে চরম বিশৃঙ্খলা ও হুড়োহুড়ি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। উক্ত অভিযানে বিভিন্ন দেশের মোট ৩০৫ জন বিদেশী শ্রমিকের নথিপত্র এবং কাজের অনুমোদন নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়। এদের মধ্যে অনিয়ম ও অভিবাসন আইন সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘনের অপরাধে ১৭৫ জনকে ঘটনাস্থল থেকেই গ্রেপ্তার করা হয়, যাদের মধ্যে সিংহভাগই বাংলাদেশের নাগরিক বলে ইমিগ্রেশন প্রশাসন নিশ্চিত করেছে।

আরও পড়ুন: সরকারি হাসপাতাল দালালমুক্ত করতে কঠোর আইনি ব্যবস্থার নির্দেশ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

অভিযান পরিচালনাকারী বিশেষ দলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য বিবরণী অনুযায়ী, সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইপোহার একাধিক শিল্পাঞ্চল ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রে এই পরিদর্শনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। বহু দিন ধরে কিছু স্থানীয় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান নিয়মবহির্ভূতভাবে নথিহীন ও ভুয়া কাগজপত্রধারী অভিবাসীদের কম মজুরিতে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত রাখছিল। এমন গোপন খবর পাওয়ার পর শুক্রবার গভীর রাতে ইমিগ্রেশন বিভাগের চৌকস টিম পরিদর্শনের নামে একযোগে একাধিক জায়গায় প্রবেশ করে। হঠাৎ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে আতংকিত হয়ে অনেক শ্রমিক চারদিকে ছুটাছুটি শুরু করেন এবং আইনপ্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে পলায়নের আপ্রাণ চেষ্টা চালান।

আটক এড়াতে প্রবাসীদের উদ্ভাবনী ও ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে লুকিয়ে থাকার দৃশ্য দেখে খোদ অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তারাও স্তম্ভিত হয়ে পড়েন। গ্রেপ্তার থেকে বাঁচতে কিছু শ্রমিক চরম প্রাণঝুঁকি নিয়ে কারখানা ভবনের ওপরের তলার ফাঁকা জায়গা, পুরোনো কাঠের তক্তার স্তূপ, এমনকি ব্যবহৃত বিষাক্ত শিল্পবর্জ্যের বড় বড় ড্রাম ও পাত্রের ভেতরে অবস্থান নেন। আবার কাউকে কাউকে প্রাঙ্গণের কাঠের আলমারি ও সরু ওয়্যারড্রবের ভেতর গুটিসুটি মেরে লুকিয়ে থাকতে দেখা যায়। তবে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞ ও সূক্ষ্ম তল্লাশির মুখে তাদের সেই কৌশল সফল হয়নি। এক এক করে সকল গোপন স্থান থেকে তাদের বের করে এনে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং পরিশেষে নথিপত্রহীনদের আটক করা হয়।

আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জে এসএসসি উত্তীর্ণদের সংবর্ধনা ও দিকনির্দেশনামূলক মতবিনিময়

ইমিগ্রেশন বিভাগের প্রাথমিক অনুসন্ধানে আটককৃতদের নথিপত্রে চরম অনিয়ম ও বড় ধরনের আইনগত ত্রুটি উন্মোচিত হয়েছে। কর্মকর্তাদের দাবি, আটক হওয়া ১৭৫ জনের একটি বড় অংশেরই মালয়েশিয়ায় বসবাসের আইনগত বৈধ কোনো কাগজপত্র বা কর্মসংস্থানের অনুমতিপত্র (ওয়ার্ক পারমিট) ছিল না। আবার অনেকের ভিসার মেয়াদ অনেক আগেই উত্তীর্ণ হয়ে গেলেও তারা অবৈধভাবে সেখানে অবস্থান করছিলেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কয়েকজন প্রবাসী এক নিয়োগকর্তার নামে অনুমোদিত কাজের ভিসা ব্যবহার করে গোপনে অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অধীন কাজ করছিলেন, যা মালয়েশীয় শ্রম আইন অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ। এছাড়া অভিযানে জালিয়াতি করে তৈরি করা ভুয়া অস্থায়ী কর্মসংস্থান ভ্রমণ পাস (পিএলকেএস) ব্যবহারের প্রমাণও উদ্ধার করেছেন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা।

মালয়েশিয়ার অভিবাসন আইন ২০০৩ ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ধারা অনুযায়ী আটককৃতদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। উদ্ধারকৃত ভুয়া কাগজপত্র ও জালিয়াতি চক্রের সাথে কোনো আন্তর্জাতিক বা স্থানীয় মানবপাচারকারী সিন্ডিকেট যুক্ত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে নিবিড় তদন্ত শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। অভিবাসন বিভাগের পক্ষ থেকে পুনরায় স্পষ্ট বার্তা প্রদান করে বলা হয়েছে যে, কোনো অবস্থাতেই অবৈধ উপায়ে বসবাসকারী বা পারমিটহীন কর্মীদের ছাড় দেওয়া হবে না। একই সাথে যেসকল স্থানীয় মালিক ও কারখানা কর্তৃপক্ষ অবৈধ অভিবাসীদের আশ্রয় ও কর্মসংস্থান প্রদান করছে, তাদের বিরুদ্ধেও চরম কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়া সরকার দেশটিকে অবৈধ অভিবাসীমুক্ত করার লক্ষে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন রাজ্য ও শিল্পাঞ্চলে চিরুনি অভিযান পরিচালনা করে আসছে। বিশেষ করে কুয়ালালামপুর, জোহর বারু, পেনাং এবং পেরাক অঞ্চলে প্রায় প্রতিদিনই পরিচালিত হচ্ছে এমন সাড়াসি অভিযান। বৈদেশিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের এই ধরনের আটক ও আইনি জটিলতায় পড়া দেশের ভাবমূর্তির জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনই সংশ্লিষ্ট প্রবাসী পরিবারগুলোর জন্য চরম বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষজ্ঞরা প্রবাসীদের সর্বদা বৈধ কাগজপত্র নবায়ন করে চলার এবং যেকোনো প্রলোভনে পড়ে ভুয়া ভিসা ও অবৈধ নিয়োগকর্তার কাছে কাজ না করার জোর তাগিদ দিয়েছেন।

সূত্র: মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশন বিভাগ।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন