সোনারগাঁয়ে মসজিদ ফান্ডের হিসাব কেন্দ্র করে যুবককে কুপিয়ে জখম ও বাড়িতে তাণ্ডব

সোনারগাঁয়ে মসজিদ ফান্ডের হিসাব কেন্দ্র করে যুবককে কুপিয়ে জখম ও বাড়িতে তাণ্ডব
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: আব্দুস ছাত্তার (শামীম) / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী জামপুর ইউনিয়নে ধর্মীয় উপাসনালয়ের আর্থিক হিসাব-নিকাশ সংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ সংঘাতের জেরে মো. হোসেন (৪০) নামে এক স্থানীয় বাসিন্দার বসতবাড়িতে হামলা ও তাণ্ডব চালনোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দুর্বৃত্তরা তাঁকে ধারালো দেশীয় অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে মারাত্মকভাবে রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত করার পাশাপাশি পরিবারে অরাজকতা সৃষ্টি করতে ভাঙচুর, লুটপাট ও গুলিবর্ষণ করেছে বলে ভুক্তভোগী স্বজনরা দাবি করেছেন। শুক্রবার (০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬) আনুমানিক সন্ধ্যার দিকে জামপুর ইউনিয়নের উত্তরপাড়া এলাকায় অবস্থিত বস্তল উত্তরপাড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ এলাকায় অনাকাঙ্ক্ষিত এই সহিংস ঘটনাটি সংঘটিত হয়। লোকালয়ে প্রকাশ্যে সংঘটিত এই তাণ্ডবের কারণে বর্তমানে পুরো বস্তল এলাকা জুড়ে অধিবাসীদের মাঝে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।

আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতি হয়ে প্রথমবার নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে দুই দিনের সফরে মির্জা ফখরুল

আহত যুবক মো. হোসেন বস্তল উত্তরপাড়া অঞ্চলের স্থায়ী অধিবাসী দাইয়ানের পুত্র। বর্তমানে তিনি রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে অত্যন্ত সংকটজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। স্থানীয় সূত্রে ও প্রত্যক্ষদর্শীদের থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বস্তল উত্তরপাড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সার্বিক আয়-ব্যয় ও সংরক্ষিত ফান্ডের হিসাব-নিকাশ নিয়ে একই এলাকার জামাল উদ্দিনের ছেলে রোকনের সাথে হোসেনের তীব্র কথাকাটাকাটি ও তর্কবিতর্ক শুরু হয়। প্রাথমিক এই কথাকাটাকাটির ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে রোকন চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য সুযোগ খুঁজতে থাকে। শুক্রবার সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে অভিযুক্ত রোকন ও তাঁর একাধিক সহযোগী দেশীয় মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অতর্কিতভাবে হোসেনের বসতবাড়িতে হামলা চালায়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা মতে, হামলাকারীরা বাড়িতে প্রবেশ করেই কোনো কিছু বুঝে ওঠার সুযোগ না দিয়ে মো. হোসেনকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করে। ধারালো অস্ত্রের উপরিউপরি আঘাতে হোসেনের শরীরের একাধিক স্থান মারাত্মকভাবে কেটে যায় এবং তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ওই আশঙ্কাজনক মুহূর্তে হোসেনকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে তাঁর পরিবারের সদস্যরা ও স্বজনরা আর্ত চিৎকার করে এগিয়ে এলে হামলাকারীরা তাদের ওপরও চড়াও হয় এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করে তাড়িয়ে দেয়। মূল ভুক্তভোগীকে মারাত্মকভাবে জখম করার পর দুর্বৃত্তরা ঘরের ভেতরে ঢুকে তাণ্ডব চালাতে থাকে এবং বিভিন্ন কক্ষের মূল্যবান আসবাবপত্র, জানালা ও জিনিসপত্র ভাঙচুর করে বিপুল ক্ষ ক্ষয়ক্ষতি সাধিত করে।

আরও পড়ুন: উল্টো পথে মন্ত্রীর গাড়ি, ট্রাফিক পুলিশের ৬ হাজার টাকা জরিমানা

ভুক্তভোগীর স্বজনদের গুরুতর অভিযোগ, তাণ্ডব চালিয়ে ক্ষান্ত না হয়ে দুর্বৃত্তরা ঘরের সিন্দুক ভেঙে জমিয়ে রাখা কয়েক লাখ টাকা নগদ অর্থ এবং মূল্যবান স্বর্ণালংকার লুট করে চম্পট দেয়। কেবল তা-ই নয়, হামলা শেষে চলে যাওয়ার সময়ে পুরো এলাকা জুড়ে আতঙ্ক বিস্তার করতে সন্ত্রাসীরা ঘরের বাইরের দেয়ালে লক্ষ্য করে অন্তত তিন রাউন্ড আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলিবর্ষণ করে বলে পরিবারটি দাবি জানিয়েছে। বিকট গুলির শব্দে রাতের অন্ধকারে আশেপাশের বাসাবাড়ির সাধারণ মানুষ চরম আতঙ্কে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করেন এবং পুরো উত্তরপাড়া গ্রামে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির অবতারণা ঘটে।

সন্ত্রাসীরা স্থান ত্যাগ করার পর স্থানীয় অধিবাসীরা ও ভুক্তভোগী পরিবার মারাত্মক আহত অবস্থায় মো. হোসেনকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। তবে তাঁর শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁকে অবিলম্বে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে হাসপাতালের আইসিইউ ও জরুরি বিভাগে তিনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন। আহত হোসেনের বোন ইয়াসমিন অভিযোগ করে জানান, মসজিদে সাধারণ মুসল্লিদের গচ্ছিত টাকার হিসাব চাওয়ার অপরাধেই তাঁর নির্দোষ ভাইকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে কোপানো হয়েছে এবং ঘর থেকে নগদ টাকা ও গহনা লুট করা হয়েছে। তিনি অবিলম্বে জড়িত হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

খবর পাওয়ার পরপরই সোনারগাঁ উপজেলার তালতলা বাজার পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের উপপরিদর্শক (এসআই) সেলিমের নেতৃত্বে পুলিশের একটি চটপটে আভিযানিক দল দ্রুত অকুস্থলে পৌঁছে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনার পর থেকে প্রধান অভিযুক্ত রোকনসহ তাঁর সকল সহযোগী আত্মগোপনে থাকায় তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তালতলা তদন্ত কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা ইনচার্জ জসিম উদ্দীন জানান, পুলিশের দল দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং বসতবাড়িতে হামলা ও আসবাবপত্র ভাঙচুরের বিষয়ের সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলিবর্ষণের বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো আলামত বা তথ্য মেলেনি। বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, সহিংসতার সাথে জড়িত কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না। একটি ধর্মীয় উপাসনালয়ের হিসাব চাওয়া কেন্দ্র করে এমন বর্বরোচিত হামলায় জড়িতদের দ্রুত চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার জন্য পুলিশ প্রশাসনের প্রতি জোর আকুল আবেদন জানিয়েছেন এলাকার সচেতন নাগরিক ও ধর্মপ্রাণ সাধারণ মুসল্লিরা।

সূত্র: স্থানীয় পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন