ঈদুল আজহায় বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান: ১২ ঘণ্টায় বর্জ্য অপসারণের কঠোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকা, গাজীপুরসহ দেশের সমস্ত বিভাগীয় শহর ও গ্রামীণ জনপদে ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। তবে কোরবানির ঈদের আনন্দের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় যে চ্যালেঞ্জটি সামনে আসে, তা হলো পশুর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সুরক্ষা। প্রতি বছরই বিপুল সংখ্যক পশু কোরবানির ফলে সৃষ্ট বর্জ্য দ্রুত অপসারণ করা না হলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
এই জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি বিবেচনা করে আসন্ন ঈদুল আজহায় কোরবানির বর্জ্য সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টার মধ্যে অপসারণ করার জন্য ঢাকা ও গাজীপুরসহ দেশের সকল সিটি কর্পোরেশন এবং পৌরসভাকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এই পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে শতভাগ সফল করতে এবার প্রশাসনের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিদেরও সরাসরি মাঠে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার মূল বার্তা: জবাবদিহিতা ও মাঠপর্যায়ে উপস্থিতি
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জারি করা এই বিশেষ নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ঈদের দিন পশু কোরবানির পর থেকে পরবর্তী ১২ ঘণ্টার মধ্যে দেশের প্রতিটি কোণা থেকে বর্জ্য পরিষ্কার করতে হবে। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এবারের বর্জ্য অপসারণ প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল ও পরিকল্পিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এবারের নির্দেশনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন, বর্জ্য অপসারণ ও সার্বিক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্য (এমপি), সিটি কর্পোরেশনের মেয়র (অথবা দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক) এবং পৌরসভার চেয়ারম্যানরা নিজে উপস্থিত থেকে তদারকি করবেন। কোনো এলাকায় পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে গাফিলতি দেখা গেলে তার দায় সরাসরি স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। জনপ্রতিনিধিদের সরাসরি সম্পৃক্ততার কারণে এই পরিচ্ছন্নতা অভিযান আরও বেশি সমন্বিত ও কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে উচ্চপর্যায়ের পরিদর্শন ও প্রস্তুতি
প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশনগুলোতে জরুরি বৈঠক ও প্রস্তুতি পরিদর্শন শুরু হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি দল বিশেষ পরিদর্শন কর্মসূচি পরিচালনা করে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিক অবকাঠামো এবং ঈদের দিনের কর্মপরিকল্পনা যাচাই করতে এই পরিদর্শনের আয়োজন করা হয়।
পরিদর্শনকালে সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রীর সাথে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের এক বিশাল বহর উপস্থিত ছিলেন। এই পরিদর্শনের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রধানমন্ত্রীর ১২ ঘণ্টার আলটিমেটাম বাস্তবায়নে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের সক্ষমতা ও প্রস্তুতি কতটুকু, তা সরেজমিনে খতিয়ে দেখা।
পরিদর্শনকালে উপস্থিত উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ
গাজীপুরের এই গুরুত্বপূর্ণ মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন কার্যক্রমে অংশ নেন একঝাঁক শীর্ষ জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। উপস্থিত ছিলেন:
- এম. মঞ্জুরুল করিম রনি, সংসদ সদস্য (গাজীপুর-২ আসন)।
- শওকত হোসেন সরকার, প্রশাসক, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন।
- ইসরাইল হাওলাদার, কমিশনার, গাজীপুর মহানগর পুলিশ (জিএমপি)।
- সোহেল হাসান, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন।
- মো: শাহরিয়ার নজির, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক), গাজীপুর।
- সাজ্জাত হোসেন, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)।
এছাড়াও স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা এই সময় উপস্থিত ছিলেন। পরিদর্শন শেষে কর্মকর্তারা জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে তারা একটি সুনির্দিষ্ট 'অ্যাকশন প্ল্যান' তৈরি করেছেন।
আরও পড়ুন: চিৎকার না দিলে আমাকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলার চেষ্টা করতো
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও সচেতনতা
১২ ঘণ্টার মধ্যে বিশাল পরিমাণের এই বর্জ্য অপসারণ করা চাট্টিখানি কথা নয়। এজন্য ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনসহ গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন এবার আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। বর্জ্য সংগ্রহের জন্য লাখ লাখ পচনশীল পলিথিন বা ব্যাগ সাধারণ মানুষের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সাথে কোরবানির পশুর রক্ত দ্রুত ধুয়ে ফেলার জন্য ব্লিচিং পাউডার এবং তরল জীবাণুনাশক ছিটানোর জন্য পর্যাপ্ত জনবল ও বিশেষ গাড়ির ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা সাধারণ জনগণের প্রতিও বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন। নির্দিষ্ট স্থানে পশু কোরবানি দেওয়া এবং বর্জ্যগুলো যত্রতত্র না ফেলে সিটি কর্পোরেশনের নির্ধারিত ব্যাগে বা ডাস্টবিনে রাখার জন্য নাগরিকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। জনসচেতনতা ছাড়া সরকারের এই ১২ ঘণ্টার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অসম্ভব বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা ও ট্রাফিক পরিকল্পনা
কোরবানির ঈদের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম যাতে নির্বিঘ্নে চলতে পারে, সেজন্য পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনও বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। গাজীপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার জানান, ঈদের দিন এবং পরবর্তী সময়ে বর্জ্যবাহী ট্রাকগুলো যাতে দ্রুত যাতায়াত করতে পারে, সেজন্য ট্রাফিক রুট সচল রাখা হবে। একই সাথে পশুর হাট এবং কোরবানি পরবর্তী সময়ে যেকোনো ধরনের চাঁদাবাজি বা বিশৃঙ্খলা রোধে পুলিশ কঠোর অবস্থানে থাকবে।
উপসংহার
প্রধানমন্ত্রীর এই ১২ ঘণ্টার মধ্যে বর্জ্য অপসারণের নির্দেশ দেশের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও মেয়রদের সরাসরি মাঠে থাকার নির্দেশনার ফলে কাজের গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এখন দেখার বিষয়, স্থানীয় প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আসন্ন ঈদুল আজহায় দেশের শহরগুলো কত দ্রুত তাদের পরিচ্ছন্ন রূপ ফিরে পায়। পরিবেশ সুরক্ষায় আমাদের সকলের দায়িত্বশীল আচরণই পারে এই ঈদকে আনন্দময় ও স্বাস্থ্যকর করে তুলতে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।