ধানমন্ডিতে ২৬ জন আটক: শেখ হাসিনাকে ফেরানোর ‘শপথ’ ও পুলিশের তৎপরতা

ধানমন্ডিতে ২৬ জন আটক: শেখ হাসিনাকে ফেরানোর ‘শপথ’ ও পুলিশের তৎপরতা

ধানমন্ডিতে ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা: শেখ হাসিনাকে ফেরানোর ‘শপথ’ নিতে গিয়ে আটক ২৬

জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

​রাজধানীর রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও উত্তেজনা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। ঢাকার ঐতিহাসিক ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এবং এর আশেপাশের এলাকায় জড়ো হওয়ার চেষ্টাকালে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং এর বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের ২৬ জন নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে একটি বিশেষ ‘শপথ নেওয়ার পরিকল্পনা’ ছিল তাদের। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ধানমন্ডি ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

​জুমার নামাজের পর ঝটিকা মিছিলের প্রস্তুতি ও পুলিশি অভিযান

​পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (২২ মে) জুমার নামাজের পর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এবং তার সংলগ্ন বিভিন্ন গলিতে হঠাৎ করেই কিছু লোক জড়ো হতে শুরু করে। ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, আটক ব্যক্তিরা ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় একত্রিত হয়ে একটি ঝটিকা মিছিল বের করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

​গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ আগে থেকেই ওই এলাকায় সতর্ক অবস্থানে ছিল। মিছিলের প্রস্তুতি নেওয়ার মুহূর্তে পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে ঘটনাস্থল এবং এর আশেপাশের এলাকা থেকে ২৬ জনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। ওসির তথ্যমতে, আটককৃতদের মধ্যে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ এবং ছাত্রলীগের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকর্মী রয়েছেন। বর্তমানে তাদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং পূর্ববর্তী কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য যাচাই-বাছাই (Verification) করা হচ্ছে।

​আটকের নেপথ্যে শেখ হাসিনার 'দেশে ফেরার' বার্তা

​এই আকস্মিক জমায়েত এবং নেতাকর্মীদের জড়ো হওয়ার পেছনে একটি বড় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সম্প্রতি ভারতের অন্যতম শীর্ষ গণমাধ্যম 'হিন্দুস্তান টাইমস'-কে ইমেইলে দেওয়া একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে নিজের দেশে ফেরার প্রসঙ্গে কথা বলেছেন বর্তমানে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

​উক্ত সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেন যে, তিনি ‘শিগগিরই দেশে ফিরবেন’। তাঁর এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং রাজনৈতিক মহলে ছড়িয়ে পড়ার পর দলটির তৃণমূল ও মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা তৈরি হয়। পুলিশের দাবি, শেখ হাসিনার সেই বার্তার ওপর ভিত্তি করেই মূলত আজ রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে নেতাকর্মীরা একত্রিত হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, যাতে তারা শেখ হাসিনাকে স্বদেশে ফিরিয়ে আনার আন্দোলন জোরদার করার জন্য একটি সম্মিলিত ‘শপথ’ নিতে পারেন।

আরও পড়ুন: কোরবানির বর্জ্য ১২ ঘণ্টায় অপসারণের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

কোরবানির বর্জ্য ১২ ঘণ্টায় অপসারণের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

​ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের রাজনৈতিক গুরুত্ব ও বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি

​বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে পরিচিত। গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এই এলাকাটিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সবসময়ই বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করে আসছে।

​আজকের এই ঘটনার পর ধানমন্ডি এবং এর আশেপাশের প্রধান সড়কগুলোতে পুলিশের টহল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি, বিশৃঙ্খলা বা আইনভঙ্গের চেষ্টা রুখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তল্লাশি করা হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সর্বোচ্চ সায়লেন্ট অ্যালার্টে রয়েছে।

​কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের তৎপরতা ও আইনি অবস্থান

​৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর (যেমন যুবলীগ ও ছাত্রলীগ) কার্যক্রমে আইনি নিষেধাজ্ঞা ও কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। এই অবস্থায় দলটির যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক সমাবেশ, মিছিল বা ঝটিকা কর্মসূচিকে বেআইনি হিসেবে গণ্য করছে বর্তমান প্রশাসন।

​আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, নিষিদ্ধ বা কার্যক্রম স্থগিত থাকা কোনো সংগঠনের ব্যানারে রাস্তায় নেমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করা হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ধানমন্ডিতে আজকের এই অভিযান তারই একটি অংশ। আটককৃতদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে থানা সূত্রে জানা গেছে।

​রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন

​রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং মাঠপর্যায়ে নেতাকর্মীদের এই ধরনের ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা নির্দেশ করে যে, দলটির ভেতরে এখনো একটি সুপ্ত সাংগঠনিক তৎপরতা সচল রাখার চেষ্টা চলছে। তবে বর্তমান সরকারের কঠোর অবস্থান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের কারণে এই ধরনের প্রচেষ্টা সফল হতে পারছে না। আগামী দিনগুলোতে রাজধানীর নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রশাসনকে আরও দীর্ঘমেয়াদী কৌশল গ্রহণ করতে হতে পারে।

​উপসংহার

​ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের আজকের এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি শান্ত নয় এবং পর্দার আড়ালে নানা ধরনের কৌশলগত মেরুকরণ চলছে। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের গ্রেফতারের এই ঘটনা আগামী দিনগুলোতে দেশের রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলে, তা দেখার বিষয়। তবে সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা, যেকোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডই হোক না কেন, তা যেন সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতি বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি না ঘটায়।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন