হাইওয়েতে গভীর রাতে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা: 'চিৎকার না দিলে ধর্ষণের চেষ্টা করত'—চিত্রনায়িকা ফারিন খান
চলচিত্র ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের বিনোদন জগতের পরিচিত মুখ এবং চিত্রনায়িকা ফারিন খান গভীর রাতে ঢাকা থেকে জামালপুর যাওয়ার পথে এক ভয়াবহ ও ট্রমাটিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। হাইওয়ের একটি পেট্রোল পাম্পের ওয়াশরুমে অজ্ঞাত পরিচয়ের এক ব্যক্তির আকস্মিক হামলার শিকার হতে যাচ্ছিলেন তিনি। নিজের বুদ্ধিমত্তা, সাহস এবং তাৎক্ষণিক চিৎকারের কারণে সে যাত্রায় বড় ধরনের বিপদ থেকে রক্ষা পেলেও, সেই রাতের দুঃসহ স্মৃতি ও মানসিক যন্ত্রণা এখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছে এই অভিনেত্রীকে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক দীর্ঘ ও আবেগঘন পোস্টের মাধ্যমে নিজের জীবনের এই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে এনেছেন ফারিন খান। একই সঙ্গে তিনি বর্তমান সমাজে নারীদের সার্বিক নিরাপত্তা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
১৩ মে রাতের সেই দুঃসহ ঘটনাপট
ঘটনাটি ঘটেছিল গত ১৩ মে, আনুমানিক রাত সোয়া ৩টার দিকে। ফারিন খান পেশাগত বা ব্যক্তিগত কারণে ঢাকা থেকে গাড়িযোগে জামালপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। দীর্ঘ পথযাত্রার একপর্যায়ে প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দিতে তিনি হাইওয়ের পাশে অবস্থিত একটি ফিলিং স্টেশন বা পেট্রোল পাম্পের ওয়াশরুমে প্রবেশ করেন।
ফারিন তাঁর ফেসবুক পোস্টে সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে লেখেন, “ভেতরে যাওয়ার কয়েক মিনিট পর হঠাৎই আমার মনে হলো, পেছনের দিকে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। মুহূর্তের মধ্যে তাকিয়ে দেখি, ভেন্টিলেটর (ভেনটিলেশন উইন্ডো) দিয়ে দুটো হাত ঠিক আমার গলার কাছে চলে এসেছে। আমি যদি সঠিক সময়ে সাহসিকতার সঙ্গে চিৎকার না দিতাম, তবে হয়তো লোকটা আমাকে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলত, সব লুটপাট করত এবং এরপর ধর্ষণের চেষ্টা করত।”
চালকের ভূমিকা এবং হামলাকারীর পালিয়ে যাওয়া
ফারিনের তীব্র চিৎকার ও চেঁচামেচি শুনে গাড়িতে থাকা তাঁর ব্যক্তিগত চালক (ড্রাইভার) অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে আসেন। চালককে আসতে দেখে এবং বেগতিক পরিস্থিতি বুঝে অজ্ঞাতপরিচয় সেই হামলাকারী ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
পরবর্তীতে ফারিন খান যখন তাঁর চালকের কাছে বিষয়টি নিয়ে জানতে চান, তখন চালক একটি অদ্ভুত তথ্যের কথা উল্লেখ করেন। চালক জানান, তিনি ফারিন ওয়াশরুমে ঢোকার ঠিক আগেই এক ব্যক্তিকে অনেকগুলো ডিমের খোসা হাতে নিয়ে ওয়াশরুমের পেছনের দিকে যেতে দেখেছিলেন। সে সময় চালক ভেবেছিলেন, লোকটা হয়তো ময়লা বা আবর্জনা ফেলতে যাচ্ছে, তাই তিনি আর বাড়তি কোনো সন্দেহ করেননি। কিন্তু ফারিনের চিৎকার শোনার পরই তিনি বুঝতে পারেন যে, ওই ব্যক্তি আসলে কোনো ভালো উদ্দেশ্যে সেখানে যায়নি।
আরও পড়ুন: ঝিনাইদহে উত্তেজনা: নাসীরুদ্দীনকে আইনের আওতায় আনার দাবি ছাত্রদলের
মানসিক ট্রমা ও চাপা যন্ত্রণা
বাইরে থেকে নিজেকে শক্ত ও স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করলেও, এই ঘটনার পর ভেতরে ভেতরে চরম মানসিক অবসাদ ও ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন ফারিন খান। ঘটনার পরদিন সকালে তিনি তাঁর শুটিং ইউনিটের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে বিষয়টি শেয়ার করেছিলেন।
ফারিন বলেন, “ওপরে ওপরে আমি যতই সাহস দেখাই না কেন, আমি জানি সেই রাতে আমি ভেতরে ভেতরে কতটা ভয় পেয়েছিলাম। এটি আমার জীবনের সবচেয়ে বিশ্রী এবং ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। প্রথমে ভেবেছিলাম বিষয়টি নিয়ে কাউকে কিছু বলব না, কারণ আল্লাহ তো আমাকে রক্ষা করেছেনই। কিন্তু এই ঘটনার পর আমার মনে যে তীব্র ক্ষোভ, খারাপ লাগা এবং মানসিক যন্ত্রণা তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবেই চেপে রাখা সম্ভব নয়।”
নারীদের নিরাপত্তা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন
নিজের জীবনের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে চিত্রনায়িকা ফারিন খান দেশের কর্মজীবী নারী এবং সাধারণ মেয়েদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু সামাজিক প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা যেসব মেয়েরা কাজের প্রয়োজনে দিন-রাত বাইরে থাকি, তাদের প্রতিনিয়ত এই ধরনের নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। বাস্তব চিত্র এটাই যে, এই দেশে নারীরা আসলেই নিরাপদ নয়।”
অভিনেত্রী সমাজে নারীদের পোশাক নিয়ে অবান্তর সমালোচনা এবং ভিকটিম ব্লেমিং (Victim Blaming) সংস্কৃতির তীব্র নিন্দা জানান। তিনি তাঁর পোস্টে লেখেন, “যে সমাজে বা দেশে একজন নারীর পোশাক দেখে তার চরিত্র বিচার করা হয়, সেই দেশে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের পেছনেও অনেকেই নারীর দোষ খুঁজে বেড়ায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই ধরনের অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার খুব কমই দেখা গেছে, যার কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যায় এবং এই ধরনের অপরাধ কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছে না।”
চলচ্চিত্রে ফারিন খানের ক্যারিয়ার
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়া প্রযোজিত ‘ধ্যাততেরিকি’ সিনেমার মাধ্যমে ঢালিউড বা বাংলা চলচ্চিত্রে ফারিন খানের জমকালো অভিষেক ঘটেছিল। সেই বাণিজ্যিক সফল সিনেমায় তিনি জনপ্রিয় অভিনেতা আরিফিন শুভর বিপরীতে প্রধান নারী চরিত্রে অভিনয় করে দারুণ প্রশংসিত এবং আলোচিত হয়েছিলেন। প্রথম ছবি মুক্তির পর দর্শকদের মাঝে বিপুল সাড়া জাগালেও পরবর্তীতে অজানা কারণে রূপালী পর্দায় বা চলচ্চিত্রে তাঁকে আর নিয়মিত দেখা যায়নি। তবে বড় পর্দা থেকে দূরে থাকলেও ফারিন খান নাটক, ওভিসি (OVC) এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বা ওয়েব কনটেন্টে নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন এবং ওয়ান অফ দ্য রাইজিং স্টার হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন।
উপসংহার
চিত্রনায়িকা ফারিন খানের সাথে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি আরও একবার প্রমাণ করে যে, দেশের হাইওয়ে এবং দূরপাল্লার যাতায়াত রুটগুলোতে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর। রাতের বেলা হাইওয়ের পেট্রোল পাম্প বা সার্ভিস স্টেশনগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা প্রহরী থাকা কতটা জরুরি, এই ঘটনাটি তারই বার্তা দেয়। সেলিব্রেটি বা সাধারণ নারী—নিরাপত্তার অধিকার সবার সমান। প্রশাসন ও হাইওয়ে পুলিশের উচিত এই ধরনের জনাকীর্ণ ও নিঃসঙ্গ স্থানগুলোতে নজরদারি বাড়ানো, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো নারীকে এমন চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ট্রমার শিকার হতে না হয়।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।