ঝিনাইদহে চরম উত্তেজনা: নাসীরুদ্দীনের ওপর হামলা, অস্ত্র নিয়ে মব সৃষ্টির অভিযোগে আটকের দাবি ছাত্রদলের
রাজনীতি ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা ঝিনাইদহের স্থানীয় রাজনীতিতে হঠাৎ করেই তীব্র উত্তেজনা ও সংঘাতের চিত্র ফুটে উঠেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ঝিনাইদহ সফরকে কেন্দ্র করে আজ শুক্রবার জুমার নামাজের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ, ডিম নিক্ষেপ এবং ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের ঝড় উঠেছে রাজনৈতিক মহলে।
বিকেলে জেলা ছাত্রদলের পক্ষ থেকে শহরে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়, যেখান থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী অস্ত্র প্রদর্শন করে এলাকায় 'মব' বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। অবিলম্বে তাঁকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছে ছাত্রদল নেতারা।
মসজিদের সামনে ডিম নিক্ষেপ ও সংঘর্ষের সূত্রপাত
প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্থানীয় সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, আজ শুক্রবার (২২ মে) দুপুরে জাতীয় নাগরিক পার্টির নির্ধারিত কর্মসূচিতে অংশ নিতে ঝিনাইদহ শহরে এসেছিলেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। জুমার নামাজ আদায়ের জন্য তিনি শহরের ঐতিহাসিক পুরাতন কালেক্টরেট জামে মসজিদে যান। নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ আহমেদের সঙ্গে তিনি কুশল বিনিময় ও কথা বলছিলেন।
ঠিক এই মুহূর্তে ওত পেতে থাকা একদল যুবক হঠাৎ করেই নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপ করতে শুরু করে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুহূর্তের মধ্যে সেখানে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এনসিপি এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীরা দ্রুত নাসীরুদ্দীনকে কর্ডন করে বা ঘিরে ধরে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র ইটপাটকেল নিক্ষেপ, লাঠিপেটা এবং পাল্টাপাল্টি স্লোগান শুরু হয়। এই ত্রিমুখী সংঘর্ষে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্রদলের অন্তত পাঁচজন নেতা-কর্মী কমবেশি আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
এনসিপির পক্ষ থেকে পরিকল্পিত হামলার অভিযোগ
এই অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ঝিনাইদহ জেলা এনসিপির যুগ্ম সমন্বয়ক হামিদ পারভেজ গণমাধ্যমকে জানান, তাদের মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সাংগঠনিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে ঝিনাইদহে এসেছিলেন। কিন্তু জুমার নামাজ শেষে ধর্মীয় উপাসনালয়ের সামনে থেকে বের হওয়ার সময় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে এই কাপুরুষোচিত হামলা চালিয়েছেন।
হামিদ পারভেজ দাবি করেন, এই হামলায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ছাড়াও কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব তারেক রেজা এবং জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি সাইদুর রহমানসহ তাদের বেশ কয়েকজন সক্রিয় কর্মী আহত হয়েছেন। এই রাজনৈতিক হামলার বিচার চেয়ে ইতিমধ্যেই এনসিপির পক্ষ থেকে ঝিনাইদহ সদর থানায় একটি আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ দায়ের করার প্রস্তুতি চলছে বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন।
অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগ তুলে ছাত্রদলের বিক্ষোভ ও সমাবেশ
এদিকে, দুপুরের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার প্রতিবাদে এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ এনে বিকেল বেলা ঝিনাইদহ জেলা ছাত্রদলের ব্যানারে শহরে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে মিলিত হয়।
সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি ইমরান হোসেন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দেশের বিভিন্ন স্থানে কৃত্রিম 'মব' বা অনাকাঙ্ক্ষিত জনতা সৃষ্টি করে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে চান। আজকেও তিনি পবিত্র জুমার নামাজ শেষে মব সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে বিপুলসংখ্যক বহিরাগত লোকজন নিয়ে অপতৎপরতা চালাচ্ছিলেন।”
ছাত্রদল সভাপতি এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলে বলেন, “দুপুরে যখন সংঘর্ষ শুরু হয়, তখন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সাথে থাকা লোকজন কিংবা তিনি নিজে আগ্নেয়াস্ত্র বের করে রাজপথে মহড়া দিয়েছেন। একটি অরাজনৈতিক সংগঠনের নেতার কাছে বা কর্মসূচিতে এই ধরনের অবৈধ অস্ত্র কোথা থেকে এল, তা প্রশাসনকে খতিয়ে দেখতে হবে।” ছাত্রদল নেতারা অনতিবিলম্বে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে তাঁর অস্ত্রের উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানান।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের বক্তব্য
ঝিনাইদহ শহরের এই আকস্মিক উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনার পর পুরো এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও দাঙ্গা দমন বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের নতুন সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা এড়াতে শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে পুলিশের কড়া নজরদারি লক্ষ্য করা গেছে।
ঝিনাইদহ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাউজ্জামান সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জানান, ঘটনার খবর পাওয়ার সাথে সাথেই পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে এবং বর্তমানে শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, “এনসিপির পক্ষ থেকে যদি কোনো সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়, তবে তদন্ত সাপেক্ষে আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি, বিকেলে বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে অস্ত্র প্রদর্শনের যে গুরুতর অভিযোগটি করা হয়েছে, সেটিও পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছে। সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান যাচাই করে এ বিষয়ে সত্যতা নিশ্চিত করা হবে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও নতুন দল বা সংগঠনের আত্মপ্রকাশকে কেন্দ্র করে এক ধরনের মাঠপর্যায়ের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঝিনাইদহের এই ঘটনাটি মূলত তারই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক শক্তি ছাত্রদলের মধ্যেকার এই দূরত্ব মাঠপর্যায়ে এক ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের মধ্যেকার এই ভুল বোঝাবুঝি বা সংঘাত রাজপথে রূপ না দিয়ে নিয়মতান্ত্রিক সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করা, যাতে সাধারণ জনগণের জানমালের কোনো ক্ষতি না হয়।
উপসংহার
ঝিনাইদহ শহরের এই উত্তেজনা এখন আইনি প্রক্রিয়ার দিকে মোড় নিচ্ছে। একদিকে এনসিপির হামলার অভিযোগ এবং অন্যদিকে ছাত্রদলের অবৈধ অস্ত্র প্রদর্শনের পাল্টা দাবি—এই দুই সমীকরণের সত্যতা উদঘাটন করা এখন স্থানীয় প্রশাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সাধারণ নাগরিকদের প্রত্যাশা, পুলিশ কোনো রাজনৈতিক প্রভাবে না গিয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করবে এবং দোষীদের আইনের আওতায় এনে ঝিনাইদহের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখবে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।