স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ঐতিহাসিক সংস্কারের পথে ইসি: কাগজের পোস্টার ও দলীয় প্রতীক সম্পূর্ণ বাতিল
নির্বাচনী ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতি ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ও অভূতপূর্ব পরিবর্তনের রূপরেখা ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সফল ধারাবাহিকতা ও স্বচ্ছতা অক্ষুণ্ন রাখার প্রত্যয় নিয়ে এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও আমূল সংস্কার আনা হচ্ছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পরিবেশ দূষণকারী কাগজের পোস্টার ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নির্বাচনকে আরও সহজ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য করতে অনলাইন মনোনয়নপত্র দাখিলের বাধ্যবাধকতা এবং ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের বিধানটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে, আসন্ন এই নির্বাচনগুলো সম্পূর্ণ নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে কোনো রাজনৈতিক দলীয় প্রতীক ব্যবহার করার সুযোগ থাকবে না।
সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ‘বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা’ (বাসস)-কে দেওয়া এক বিশেষ ও একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ। তিনি জানান, নির্বাচন ব্যবস্থাকে অবাধ, নিরপেক্ষ, ব্যয়সাশ্রয়ী এবং সহিংসতামুক্ত করার লক্ষ্যেই নির্বাচন বিধিমালায় এই যুগান্তকারী সংশোধনীর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিধিমালায় বড় পরিবর্তন: ইভিএম ও অনলাইন মনোনয়নপত্রের বিদায়
জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানান, নির্বাচন কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধিমালায় প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী কিছু পরিবর্তন আনার কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, পূর্ববর্তী নিয়ম পরিবর্তন করে অনলাইনে বাধ্যতামূলক মনোনয়নপত্র দাখিলের বর্তমান বিধানটি সম্পূর্ণ বাতিল করা হবে। এর পাশাপাশি, প্রযুক্তিগত বিতর্ক ও জনআস্থার বিষয়টি বিবেচনা করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইভিএম (EVM) ব্যবহারের নিয়মও আর থাকছে না। অর্থাৎ, আসন্ন নির্বাচনগুলো সনাতন ও ঐতিহ্যবাহী ব্যালট পেপারের মাধ্যমেই অনুষ্ঠিত হবে।
একই সঙ্গে, স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনগুলো সম্পূর্ণ নির্দলীয় কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা হচ্ছে। এর ফলে কোনো প্রার্থীই কোনো রাজনৈতিক দলের নাম বা প্রতীক ব্যবহার করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। এই সিদ্ধান্ত গ্রামীণ ও স্থানীয় রাজনীতিতে দলীয় বিভেদ এবং সংঘাত অনেকটাই কমিয়ে আনবে বলে আশা করছে কমিশন। উপরন্তু, অতীতে নির্দলীয় বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকার ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর জমা দেওয়ার যে কঠিন বাধ্যবাধকতা ছিল, সেটিও সংশোধনীর মাধ্যমে পুরোপুরি বাতিল করা হচ্ছে। এর ফলে যোগ্য ও সাধারণ নাগরিকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ আরও সুগম হবে।
জামানত বৃদ্ধি ও কড়া আইনি বিধিমালা
নির্বাচন কমিশনের খসড়া বিধিমালা অনুযায়ী, উপজেলা নির্বাচন ছাড়া স্থানীয় সরকারের অন্যান্য সব স্তরের (যেমন সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ) নির্বাচনে প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হবে। তবে এই জামানতের পরিমাণ ঠিক কতটা বৃদ্ধি পাবে, তা এখনই সুনির্দিষ্ট করে না জানালেও জুন মাসের মধ্যে চূড়ান্ত বিধিতে তা উল্লেখ করা হবে বলে জানান তিনি।
আব্দুর রহমানেল মাছউদ আরও বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো ধরনের প্রবাসী ভোট বা পোস্টাল ভোটের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে না। একই সঙ্গে আইনি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইনের চোখে ফেরারি বা পলাতক আসামিরা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। বিশেষ করে, দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা বা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের মামলায় যাদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে, তারা কোনোভাবেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা পাবেন না।
কমিশনের এই সিদ্ধান্তগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো, অপরাধী ও আইনি জটিলতায় থাকা ব্যক্তিদের নির্বাচনি প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা এবং একটি পরিচ্ছন্ন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
আরও পড়ুন: শাহজাদপুর স্থানীয় নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা
অক্টোবরে ভোট শুরুর রোডম্যাপ
নির্বাচন শুরুর সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার জানান, পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটির পরপরই সংশোধিত বিধিমালা চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হবে এবং আগামী জুন মাসের মধ্যেই পুরো বিধি প্রণয়নের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করা হবে। যদি সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়, তবে নির্বাচন কমিশন আগামী অক্টোবর মাস থেকেই মাঠপর্যায়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করতে পারবে বলে জোরালো আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। এই বছরের শেষ প্রান্তিকে দেশের একটি বড় অংশে ভোট উৎসবের আমেজ লক্ষ্য করা যাবে।
সুষ্ঠু নির্বাচনের ৪টি মূল স্তম্ভ
একটি সম্পূর্ণ সহিংসতাহীন, সুষ্ঠু ও মডেল নির্বাচন উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ চারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর বিশেষ আলোকপাত করেছেন:
১. সরকারের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি
একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য রাষ্ট্র বা সরকারের সদিচ্ছা সবচেয়ে বড় শক্তি। সরকারকে অবশ্যই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকতে হবে এবং নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
২. রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ
নির্বাচনে সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তা যেন মারামারি বা হানাহানির রূপ না নেয়। দেশের স্বার্থে এবং গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখতে রাজনৈতিক দলগুলোকে মাঠপর্যায়ে চরম সংযম ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।
৩. নির্বাচন কমিশনের আপসহীন মনোভাব
নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিজে নিরপেক্ষ থাকতে শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, যদিও ইসির নিজস্ব কোনো সশস্ত্র বা দৃশ্যমান শক্তি নেই; তবুও নীতি, আইন ও নৈতিক দৃঢ়তার জায়গা থেকে কমিশনকে প্রয়োজনে কঠোর ‘হুংকার’ দিতে হবে, যাতে পুরো নির্বাচনি প্রক্রিয়া কলঙ্কমুক্ত থাকে।
৪. মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সততা ও নেতৃত্ব
নির্বাচনী দায়িত্বে লাখ লাখ মানুষ জড়িত থাকেন। প্রিসাইডিং অফিসার, রিটার্নিং অফিসার থেকে শুরু করে পোলিং স্টাফদের সততা ও নেতৃত্ব এখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। একজন প্রিসাইডিং অফিসার যদি দৃঢ়ভাবে বলেন যে তিনি তাঁর কেন্দ্রে কোনো জাল ভোট বা অনিয়ম হতে দেবেন না, তবে তাঁর সততা ও ব্যক্তিত্বের গুণেই সেই কেন্দ্র সুরক্ষিত থাকবে।
সহিংসতা রোধে কঠোর হুঁশিয়ারি ও রেফারি অ্যানালজি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মাঠপর্যায়ের সহিংসতা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে এই জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার বলেন, সহিংসতা মূলত আইন-শৃঙ্খলার একটি গুরুতর বিষয়। কেউ যদি ভোটকেন্দ্রে বা তার বাইরে সংঘর্ষ সৃষ্টি করে, তবে দেশের প্রচলিত দণ্ডবিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। তবে তিনি মনে করেন, শুধু আইনের কঠোর প্রয়োগ দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর থেকে একটি স্পষ্ট ও ইতিবাচক প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে।
একটি চমৎকার রূপক ব্যবহার করে তিনি বলেন, “সহযোগিতা না করলে আমরা কী করব? খেলোয়াড় যদি সারাদিন ফাউল করে, রেফারি কয়টা ফাউল ধরবে?” তিনি মনে করিয়ে দেন যে, বিগত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের বড় রাজনৈতিক দল ও জোটগুলো আচরণবিধি কঠোরভাবে মেনে চলেছিল। ভোটের দিন কেন্দ্র দখল বা ব্যালট ছিনতাইয়ের ঘটনা খুব একটা দেখা যায়নি, যার পুরো কৃতিত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর।
তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ভোটের পরিবেশ সুষ্ঠু রাখতে মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হবে। রিটার্নিং ও প্রিসাইডিং অফিসাররা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করবেন। তবে কোনো স্তরে কোনো ধরনের অনিয়ম বা ভেজালের প্রমাণ পাওয়া গেলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে আইন অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে পুরো ভোটকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা কমিশনের রয়েছে এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় সেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপসংহার
নির্বাচন কমিশনের এই নতুন উদ্যোগগুলো বাংলাদেশের স্থানীয় নির্বাচন ব্যবস্থাকে আরও পরিবেশবান্ধব, ব্যয়নিয়ন্ত্রিত এবং সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কাগজের পোস্টার নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে যেমন পরিবেশ রক্ষা পাবে, তেমনি দলীয় প্রতীক না থাকায় মাঠপর্যায়ের চিরচেনা রাজনৈতিক সহিংসতা অনেকটাই কমে আসবে। এখন জুনের চূড়ান্ত বিধিমালা প্রণয়ন এবং অক্টোবরের মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নের দিকেই তাকিয়ে আছে দেশের সাধারণ ভোটাররা।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।