আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
তেহরান, ইরান: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ আরও কয়েক ডিগ্রি বাড়িয়ে দিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার নতুন এক কূটনৈতিক যুদ্ধ। ইরানের সদ্যপ্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা এবং শোক প্রকাশে অংশ নেওয়া লাখ লাখ সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া এক উসকানিমূলক ও অহংকারপূর্ণ সামরিক হুমকির কড়া জবাব দিয়েছে তেহরান। আর্মেনিয়ায় নিযুক্ত ইরানের দূতাবাস সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে লক্ষ্য করে এক নজিরবিহীন ও কঠোর ভাষায় কূটনৈতিক বার্তা পাঠিয়েছে, যা বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
আরও পড়ুন: কুমিল্লায় ফুটপাতে ঘুমন্ত নারীকে ধর্ষণ: সিসিটিভি ফুটেজ ভাইরালের পর মূলহোতা খোকন গ্রেফতার
ইরানি কূটনীতিকদের সাফ কথা, কোনো সামরিক শক্তি বা মারণাস্ত্র দিয়ে একটি জাতির আদর্শ এবং চেতনাকে চিরতরে স্তব্ধ বা ধ্বংস করা যায় না।
ট্রাম্পের সেই বিতর্কিত ও অহংকারপূর্ণ বক্তব্য
ঘটনার সূত্রপাত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম 'অ্যাক্সিওস' (Axios)-কে দেওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে। মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষনেতা ট্রাম্প অত্যন্ত দাম্ভিকতার সাথে দাবি করেন যে, তেহরানে অনুষ্ঠিত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ঐতিহাসিক জানাজা অনুষ্ঠানে যে লাখ লাখ মানুষের সমাগম হয়েছিল, তাদের সবাইকে এক নিমেষে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ার মতো অত্যাধুনিক ও বিধ্বংসী সামরিক সামর্থ্য ওয়াশিংটনের রয়েছে।
ট্রাম্প তাঁর সাক্ষাৎকারে আরও যোগ করেন, তিনি চাইলে সেই জানাজা চত্বরে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালাতে পারতেন। কিন্তু পরবর্তীতে হোয়াইট হাউসের সাথে আলোচনার জন্য বা কোনো চুক্তি করার জন্য ইরানের কোনো প্রতিনিধি বা মানুষ অবশিষ্ট থাকবে না—মূলত এই একক অজুহাতে তিনি মার্কিন বাহিনীকে সেই সম্ভাব্য ভয়াবহ আক্রমণ চালানো থেকে বিরত রেখেছিলেন। ট্রাম্পের এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকারী বক্তব্য প্রকাশের পরপরই বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও কূটনৈতিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় ওঠে।
ইরানি দূতাবাসের পাল্টা আঘাত: "মানুষ নশ্বর, আদর্শ অমর"
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই উসকানিমূলক বক্তব্যের জবাবে চুপ থাকেনি তেহরান। আর্মেনিয়ায় অবস্থিত ইরানি দূতাবাস তাদের অফিসিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার)-এ একটি অত্যন্ত কড়া ও সুদীর্ঘ আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করে। মার্কিন অহংকারকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে ইরানি দূতাবাস তাদের বার্তায় অত্যন্ত দার্শনিক ও রাজনৈতিক ভাষায় পাল্টা আক্রমণ করে।
দূতাবাস তাদের লিখিত বার্তায় স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছে:
"কোনো মানুষকে শারীরিকভাবে চিরতরে হত্যা করা বা পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়তো সম্ভব, কিন্তু সেই মানুষের ভেতরে থাকা চেতনা, আদর্শ এবং দর্শনকে কোনোদিন কোনো মারণাস্ত্র দিয়ে মুছে ফেলা যায় না। আপনারা ক্ষমতার দম্ভে এবং অন্যায়ভাবে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে শারীরিকভাবে হত্যা করেছেন ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে আপনারা সুগন্ধি ও আতরের একটি পবিত্র পাত্রকে ভেঙে ফেলেছেন মাত্র। পাত্রটি ভেঙে যাওয়ার কারণে তার ভেতরে থাকা সুবাস বা সুগন্ধ এখন আর এক জায়গায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা চারদিকের বাতাসে তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং সমগ্র অঞ্চলের মুক্তিকামী মানুষকে অনুপ্রাণিত করছে।"
ইতিহাস ও সভ্যতা নিয়ে ট্রাম্পকে তীব্র কটাক্ষ
ইরানি দূতাবাস তাদের কূটনৈতিক বিবৃতির পরবর্তী অংশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক দীনতাকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেছে। তারা দাবি করেছে, ইরানের সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং রাষ্ট্রীয় এই অভূতপূর্ব শোক প্রকাশের গভীর তাৎপর্য অনুধাবন করার মতো মানসিক পরিপক্বতা মার্কিন প্রশাসনের নেই।
আরও পড়ুন: মানবিকতায় অনন্য রোনালদো: ভেনিজুয়েলায় পা হারানো শিশুর স্বপ্ন পূরণ করলেন সিআরসেভেন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সংকীর্ণ বিশ্বদর্শনকে দায়ী করে দূতাবাসের পক্ষ থেকে বলা হয়, ট্রাম্প বা মার্কিন নীতিনির্ধারকরা এই গভীর আত্মিক সম্পর্ক এবং ত্যাগের মহিমা কখনোই বুঝতে পারবেন না। কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের না আছে কোনো প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী মানব সভ্যতা, না আছে কোনো গৌরবময় দীর্ঘ ইতিহাস কিংবা ন্যূনতম নৈতিক সম্মানবোধ। একটি বহিরাগত সংস্কৃতির দেশের পক্ষে হাজার বছরের পারস্য সভ্যতার ঐতিহ্য এবং প্রতিরোধ সংস্কৃতি অনুধাবন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি ও বর্তমান পরিস্থিতি
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই বাকযুদ্ধ কেবল কথার লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ চার মাস আগের সেই ভয়াবহ মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ হামলা, যার ফলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হয়েছিলেন। সেই ক্ষোভ ও প্রতিশোধের আগুন এখনো ইরানি জনগণের মনে দাউ দাউ করে জ্বলছে। তেহরানের জানাজায় উপস্থিত কোটি কোটি মানুষের সরকারবিরোধী স্লোগান এবং মার্কিন পতাকায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলে মার্কিনবিরোধী মনোভাব এখন তুঙ্গে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের মতো একজন বিশ্বনেতার মুখে "জানাজায় উপস্থিত সাধারণ মানুষকে নিশ্চিহ্ন করার" হুমকি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচারের চরম লঙ্ঘন বলে মনে করছেন অনেক নিরপেক্ষ রাষ্ট্রনায়ক। ইরান ইতিমধ্যেই রাশিয়ার মতো পরাশক্তি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অক্ষ শক্তির (Axis of Resistance) সাথে তাদের সামরিক যোগাযোগ আরও জোরদার করেছে। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, ওয়াশিংটন এবং তেহরানের এই চরমমুখী অবস্থান যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তবে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বরং সমগ্র বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
সংক্ষিপ্ত সংবাদ সূত্র: আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম অ্যাক্সিওস ও আইআরএনএ।

চমৎকার নিউজ
উত্তরমুছুনএকটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।