ব্রেকিং নিউজ

কুমিল্লায় ফুটপাতে ঘুমন্ত নারীকে ধর্ষণ: সিসিটিভি ফুটেজ ভাইরালের পর মূলহোতা খোকন গ্রেফতার

কুমিল্লায় ফুটপাতে ঘুমন্ত নারীকে ধর্ষণ: সিসিটিভি ফুটেজ ভাইরালের পর মূলহোতা খোকন গ্রেফতার
ছবি: সংগৃহীত

অপরাধ ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

কুমিল্লা প্রতিনিধি: কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলায় এক অসহায় ও ভাসমান নারীকে ফুটপাতে ঘুমন্ত অবস্থায় পাশবিক নির্যাতনের এক লোমহর্ষক ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। উপজেলার বিজয়পুর বাজার এলাকায় ঘটে যাওয়া এই ঘৃণ্য অপরাধের একটি সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর জেলাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় ওঠে। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নড়েচড়ে বসে স্থানীয় প্রশাসন। জেলা পুলিশের একাধিক টিম মাঠে নেমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘটনার মূল অপরাধী খোকন (৫০) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে।

আরও পড়ুন: তেহরানে আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রথম জানাজা সম্পন্ন: লাখো মানুষের ঢল ও ভূ-রাজনীতিতে নতুন মোড়

সমাজ সচেতন মহল এই ঘটনাকে চরম নৈতিক অবক্ষয় হিসেবে দেখছেন এবং অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

যেভাবে প্রকাশ্যে এলো এই পাশবিকতার ঘটনা

স্থানীয় বাসিন্দা এবং পুলিশ প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটেছিল গত ৩০ জুন (২০২৬) তারিখের শেষ রাতে অর্থাৎ ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে। কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে অবস্থিত অত্যন্ত ব্যস্ততম এলাকা বিজয়পুর বাজার। সেখানকার একটি স্থানীয় কনফেকশনারি দোকানের সামনের ফুটপাতে এক মধ্যবয়সী অসহায় নারী প্রতিদিনের মতো রাতে ঘুমাচ্ছিলেন।

ঘটনার দিন ভোরে জনমানবহীন রাস্তার সুযোগ নিয়ে এক মধ্যবয়সী ব্যক্তি সেখানে আসে এবং ঘুমন্ত নারীর ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। ঘটনা ঘটানোর পর পরই অভিযুক্ত ব্যক্তি দ্রুত স্থান ত্যাগ করে গা ঢাকা দেয়। প্রাথমিক অবস্থায় বিষয়টি কেউ জানতে না পারলেও, গত শনিবার (৪ জুলাই) ওই এলাকার একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ধারণকৃত ফুটেজ হঠাৎ করেই ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি দেখার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয় এবং নেটিজেনরা অপরাধীকে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি তোলেন।

সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও অভিযুক্তের পরিচয়

ভাইরাল হওয়া সিসিটিভি ফুটেজটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে অপরাধীর নিখুঁত পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয় সদর দক্ষিণ মডেল থানা পুলিশ। ভিডিওর টাইমস্ট্যাম্প অনুযায়ী, ভোর ৪টা ৮ মিনিটের দিকে সাদা রঙের শার্ট এবং লুঙ্গি পরিহিত এক ব্যক্তি ওই ঘুমন্ত নারীর পাশে এসে দাঁড়ায়। চারপাশে কোনো মানুষ না থাকার সুযোগে সে ওই নারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং জোরপূর্বক তাকে ধর্ষণ করে।

লজ্জাজনক এই কর্মকাণ্ড শেষ করে সে নির্বিকারভাবে হেঁটে চলে যায়। এর ঠিক কিছু সময় পর বাজারের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন নৈশপ্রহরী বা পাহারাদার ওই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় ভুক্তভোগী নারীকে সেখানে পড়ে থাকতে দেখেন।

পরবর্তীতে সিসিটিভি ফুটেজের ছবি ও স্থানীয় তথ্যদাতাদের সহায়তায় পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, এই জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িত ব্যক্তি আর কেউ নয়, সে বিজয়পুর বাজার সংলগ্ন দুর্গাপুর এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা খোকন। স্থানীয় একাধিক সূত্র দাবি করেছে, খোকন এলাকায় কোনো ভালো কাজের সাথে জড়িত নয়। সে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় জুয়া খেলার সিন্ডিকেট পরিচালনা করে আসছিল এবং একজন চিহ্নিত জুয়াড়ি হিসেবে তার কুখ্যাতি রয়েছে।

পুলিশের ঝটিকা অভিযান ও বরুড়া থেকে গ্রেফতার

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর কুমিল্লার পুলিশ সুপারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নেন। সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশের একটি বিশেষ আভিযানিক দল মাঠে নামে। প্রযুক্তির সহায়তা এবং গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানা যায়, ঘটনার পর থেকে খোকন এলাকা ছেড়ে পালিয়ে অন্য উপজেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে আত্মগোপন করেছে।

শনিবার সন্ধ্যার দিকে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, অভিযুক্ত খোকন কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার ঝলম এলাকায় লুকিয়ে আছে। তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে একটি ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে তাকে অবরুদ্ধ ও গ্রেফতার করা হয়।

ওসি রকিবুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করে বলেন:

"ভিডিওটি আমাদের নজরে আসার সাথে সাথেই আমরা অপরাধীকে শনাক্ত করতে সক্ষম হই। আমাদের একাধিক টিম অভিযানে অংশ নেয় এবং মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বরুড়ার ঝলম এলাকা থেকে তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়। তার বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়েরসহ প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আজ রবিবার (৫ জুলাই) কুমিল্লার বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হচ্ছে।"

ভুক্তভোগীর চিকিৎসাসেবা ও পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপ

এই অমানবিক ঘটনার শিকার হওয়া নারীর শারীরিক ও মানসিক সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে প্রশাসন। অসহায় ওই নারী বর্তমানে পুলিশি তত্ত্বাবধানে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

আরও পড়ুন: সব জেলাকে রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত করার মহাপরিকল্পনা: নেত্রকোনায় রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিব

সহকারী পুলিশ সফল (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস এই বিষয়ে জানান, পুলিশ শুধুমাত্র অপরাধীকে গ্রেফতার করেই তাদের দায়িত্ব শেষ করেনি। ভুক্তভোগী নারীর প্রকৃত পরিচয় জানার চেষ্টা চলছে, কারণ তিনি একজন ভাসমান ও সহায়সম্বলহীন নারী বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

ইতিমধ্যেই পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সাথে আদালতের মাধ্যমে তাকে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে বা নিরাপদ হেফাজতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশ কর্মকর্তা মোস্তাইন বিল্লাহ আরও বলেন, এ ধরনের সামাজিক অপরাধের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে এবং অপরাধী যাতে কোনোভাবেই ছাড় না পায়, সে জন্য আদালতে নিখুঁত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও সচেতনতার দাবি

কুমিল্লার বিজয়পুর বাজারের মতো একটি জনাকীর্ণ এলাকার মহাসড়কের পাশে ফুটপাতে এমন ঘটনা ঘটায় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে। স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ফুটপাতে বা খোলা জায়গায় যারা রাত যাপন করেন, বিশেষ করে ভাসমান নারীরা সমাজে সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত। তাদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাতের বেলা পুলিশি টহল আরও জোরদার করা প্রয়োজন। একই সাথে বাজার কমিটিগুলোকে আরও বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং নৈশপ্রহরীদের দায়িত্ব পালনে আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও খোকনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের দাবিতে সরব রয়েছে কুমিল্লার সর্বস্তরের মানুষ।

সংক্ষিপ্ত সংবাদ সূত্র: কুমিল্লা জেলা পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন