তেহরানে আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রথম জানাজা সম্পন্ন: লাখো মানুষের ঢল ও ভূ-রাজনীতিতে নতুন মোড়

তেহরানে আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রথম জানাজা সম্পন্ন: লাখো মানুষের ঢল ও ভূ-রাজনীতিতে নতুন মোড়
ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

তেহরান, ইরান: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং ইরানের দীর্ঘকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বিদায়ী আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকস্মিক সামরিক হামলার দীর্ঘ চার মাস পর, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় এবং কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর প্রথম জানাজা নামাজ সম্পন্ন হলো। রাজধানী তেহরানের ঐতিহাসিক ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায় অনুষ্ঠিত এই জানাজায় লাখো মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। শোকের আবহে নিমজ্জিত গোটা ইরান রাষ্ট্র এখন এক নতুন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও তীব্র ক্ষোভের মধ্য দিয়ে সময় পার করছে।

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর সূত্র অনুযায়ী, এই প্রথম জানাজা অনুষ্ঠানটি কেবল একটি ধর্মীয় রীতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি হয়ে উঠেছিল পশ্চিমা শক্তি ও তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে ইরানের রাজনৈতিক শক্তির এক বিশাল মহড়া।

স্মরণকালের বৃহত্তম জানাজা ও কান্নার রোল

রবিবার (৫ জুলাই) ভোরে তেহরানের আকাশ যখন সবেমাত্র আলো ফুটতে শুরু করেছে, তখন থেকেই লাখ লাখ ইরানি নাগরিক কালো পোশাকে সজ্জিত হয়ে ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। স্থানীয় সময় সকাল ৭টা বাজার আগেই পুরো মসজিদ প্রাঙ্গণ এবং এর আশেপাশের সড়কগুলো জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

আরও পড়ুন: জুলাই আন্দোলন অবমাননার অভিযোগ: শাওন ও মাহিসহ তিন অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় জিডি

সকাল ঠিক ৭টায় যখন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং তাঁর সঙ্গে নিহত হওয়া অপর চার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মরদেহবাহী কফিনগুলো একে একে চত্বরে নামানো হয়, তখন উপস্থিত জনতার মাঝে এক আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রিয় নেতাকে শেষবারের মতো দেখতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ। জানাজায় অংশ নেওয়া সাধারণ ইরানি নাগরিকদের ক্ষোভের মূল লক্ষ্য ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান মিত্র ইসরায়েল। সমবেত জনতা বিভিন্ন ধরনের ক্ষোভমিশ্রিত স্লোগানের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিশোধের দাবি জানান।

জানাজায় ইমামতি ও শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ (IRNA) জানিয়েছে, প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার এই প্রথম জানাজা নামাজে ইমামতি করেন দেশটির প্রখ্যাত ও বর্ষীয়ান ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানী। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে এই নামাজ সম্পন্ন হয়।

এই বিশাল জানাজা নামাজে ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামরিক শীর্ষ নেতৃত্বের প্রায় সবাই উপস্থিত ছিলেন। দেশের এই কঠিন পরিস্থিতিতে জাতীয় সংহতি প্রদর্শনের জন্য তারা কফিনের সারির সম্মুখভাগে অবস্থান নেন। জানাজায় উপস্থিত প্রধান ব্যক্তিত্বদের মধ্যে ছিলেন:

  • ইরানের নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান

  • পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ

  • বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেইন মোহসেনি এজেই

  • ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) কুদস ফোর্সের প্রধান কমান্ডার ইসমাইল কানি

কুদস ফোর্সের কমান্ডারের উপস্থিতি আলাদাভাবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে, কারণ এই বাহিনীটিই ইরানের আঞ্চলিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থার কঠোর কড়াকড়ি

চার মাস আগের সেই ভয়াবহ হামলার ঘটনার পর থেকে ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছিল। ফলস্বরূপ, এই জানাজা অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে তেহরানজুড়ে এক অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়। আইআরজিসি এবং ইরানের নিয়মিত পুলিশ বাহিনীর হাজার হাজার সদস্যকে পুরো মোসাল্লা প্রাঙ্গণ এবং তেহরানের প্রবেশপথগুলোতে মোতায়েন করা হয়। ড্রোনের মাধ্যমে আকাশপথ পর্যবেক্ষণ এবং আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার সাহায্যে পুরো রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানটি সুরক্ষিত রাখা হয়, যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর বা নাশকতামূলক ঘটনা না ঘটতে পারে।

১০০ দেশের প্রতিনিধি ও সাতদিনের রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি

মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ বাহিনীর বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চার মাস পর এই শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হওয়া নিয়ে কূটনৈতিক মহলে নানা গুঞ্জন রয়েছে। তবে ইরান সরকার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে। গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া এই বিদায়ী ও শোক প্রক্রিয়া আগামী সাত দিন ধরে চলবে বলে রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, প্রয়াত এই শীর্ষ নেতাকে শ্রদ্ধা জানাতে বিশ্বের অন্তত ১০০টি দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল এবং কূটনীতিকরা তেহরানে এসে পৌঁছেছেন। এর মধ্যে রাশিয়ার প্রতিনিধি, চীনের বিশেষ দূত এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রতিরোধকামী সংগঠনের (যেমন হিজবুল্লাহ, হামাস ও হুতি) শীর্ষস্থানীয় নেতারা রয়েছেন।

আরও পড়ুন: আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দাফন হয়ে গেছে, আর ফেরার সুযোগ নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, এই সাতদিনের দীর্ঘ কর্মসূচিতে পর্যায়ক্রমে প্রায় ২ কোটি মানুষ অংশ নিতে পারেন, যা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম মানব সমাগম হিসেবে রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে।

পরবর্তী জানাজা ও চূড়ান্ত দাফনের সময়সূচি

তেহরানের এই প্রথম জানাজাটি ছিল দীর্ঘ বিদায় প্রক্রিয়ার একটি সূচনা মাত্র। ইরান সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, মরদেহবাহী কফিনগুলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য নিয়ে যাওয়া হবে। আগামী দিনগুলোতে যেসব স্থানে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে এবং চূড়ান্ত দাফন সম্পন্ন হবে তার একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা নিচে দেওয়া হলো:

  • তেহরান ও কোম: তেহরানের আনুষ্ঠানিকতা শেষে কফিন নিয়ে যাওয়া হবে ইরানের পবিত্র ধর্মীয় নগরী কোমে, যেখানে তাঁর দীর্ঘ শিক্ষা ও রাজনৈতিক জীবনের বহু স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে।

  • ইরাকের কারবালা ও নাজাফ: শিয়া সম্প্রদায়ের অন্যতম পবিত্র স্থান ইরাকের নাজাফ এবং কারবালা শহরেও এই মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে বিশেষ ধর্মীয় আচার ও জানাজা অনুষ্ঠিত হবে, যা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক ও ধর্মীয় সম্পর্ককে আরও জোরালো করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

  • মাশহাদে চূড়ান্ত দাফন: সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা এবং দীর্ঘ সফর শেষে আগামী ৯ জুলাই আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মরদেহ তাঁর প্রিয় জন্মস্থান মাশহাদে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানেই ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজার সংলগ্ন এলাকায় রাষ্ট্রীয় পূর্ণ মর্যাদায় তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে।

উপসংহার ও ভূ-রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির এই মহাপ্রয়াণ এবং তাঁর পরবর্তী জানাজায় লাখো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব কতটা গভীর ছিল। মার্কিন-ইসরায়েল জোটের হামলার শিকার হয়ে তাঁর এই চলে যাওয়া মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। নতুন রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ানের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সর্বোচ্চ নেতার শূন্যতা পূরণ করে নতুন রাজনৈতিক পথ তৈরি করা। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে ৯ জুলাইয়ের দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর ইরানের পরবর্তী সামরিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপের দিকে।

সংক্ষিপ্ত সংবাদ সূত্র: ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন