ব্রেকিং নিউজ

ইরানিদের কান্না দেখে ট্রাম্পের বিস্ময়: 'ভেবেছিলাম মানুষ খামেনিকে ঘৃণা করে'

ইরানিদের কান্না দেখে ট্রাম্পের বিস্ময়: 'ভেবেছিলাম মানুষ খামেনিকে ঘৃণা করে'
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

ওয়াশিংটন ডিএস: ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রয়াণে দেশটির সাধারণ মানুষের আবেগঘন প্রতিক্রিয়া এবং রাষ্ট্রীয় শোকের গভীরতা দেখে তীব্র বিস্ময় ও স্তম্ভিত হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেহরানের রাজপথে লাখ লাখ মানুষের অশ্রুসিক্ত চোখ এবং প্রিয় নেতার কফিন ছুঁয়ে কান্নার দৃশ্য পশ্চিমা বিশ্বের হিসাব-নিকাশকে ওলটপালট করে দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ধারণা ছিল যে, ইরানের সাধারণ জনগণ হয়তো তাদের সর্বোচ্চ নেতার ওপর ক্ষুব্ধ বা অসন্তুষ্ট। কিন্তু খামেনির শেষ বিদায়ের ঐতিহাসিক সমাগম সেই ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করেছে বলে মনে করছেন খোদ ট্রাম্প।

আরও পড়ুন: মানুষকে হত্যা করা গেলেও আদর্শকে নয়: ট্রাম্পের হুমকির জবাবে গর্জে উঠল ইরান

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম 'অ্যাক্সিওস' (Axios)-কে দেওয়া এক বিশেষ এবং চাঞ্চল্যকর সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ জনমত নিয়ে নিজের এই মানসিক পরিবর্তনের কথা খোলামেলাভাবে প্রকাশ করেছেন।

ট্রাম্পের সরল স্বীকারোক্তি: ‘ভেবেছিলাম মানুষ তাকে ঘৃণা করে’

বিখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক ও বিশ্লেষক বারাক রাভিদকে দেওয়া এক বিশেষ টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর চিরচেনা আক্রমণাত্মক সুরের বাইরে গিয়ে এক ভিন্ন ধরনের বিস্ময় প্রকাশ করেন। ইরানের জানাজা ও বিদায়ী অনুষ্ঠানের ফুটেজ এবং গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো দেখার পর ট্রাম্প বলেন, “আমি আসলে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু আশা করেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম ইরানের সাধারণ মানুষ তাকে (খামেনি) চরম ঘৃণা করে এবং তার শাসনামল নিয়ে অতিষ্ঠ। কিন্তু রাজপথে মানুষের এই আহাজারি ও কান্না দেখে আমি সত্যিই অবাক হয়েছি।”

হোয়াইট হাউসের এই শীর্ষ নেতার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, মার্কিন নীতিনির্ধারকরা ইরানের সামাজিক ও ধর্মীয় মনস্তত্ত্ব বুঝতে কতটা বড় ধরনের ভুল করেছিলেন। ট্রাম্পের এই মন্তব্য বিশ্বব্যাপী কূটনীতিবিদদের মধ্যে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে, কারণ এটি আমেরিকার গোয়েন্দা তথ্যের দুর্বলতাকেও এক প্রকার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।

সামরিক সামর্থ্যের দম্ভ ও আলোচনার অজুহাত

সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর স্বভাবসুলভ সামরিক শক্তির দম্ভ প্রদর্শন করতে ছাড়েননি। তিনি অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষায় দাবি করেন, ওয়াশিংটনের কাছে এমন বিধ্বংসী সামরিক প্রযুক্তি রয়েছে যার মাধ্যমে তেহরানের ওই বিদায়ী অনুষ্ঠানে উপস্থিত কোটি কোটি মানুষকে এক মুহূর্তের মধ্যে পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দেওয়া সম্ভব।

তবে কেন তিনি বা তাঁর সামরিক বাহিনী এই মুহূর্তে কোনো ধরনের বড় পদক্ষেপ বা বিমান হামলা পরিচালনা করেনি, তার একটি অদ্ভুত ব্যাখ্যাও দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, “আমি যদি এই মুহূর্তে আমার সামরিক হুমকি কার্যকর করতাম এবং সেখানে কোনো বড় ধরনের হামলা চালাতাম, তবে পরবর্তীতে আমাদের সাথে টেবিল টক বা দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করার মতো কোনো মানুষই ইরানে অবশিষ্ট থাকত না।” মূলত এই আলোচনার পথ খোলা রাখার জন্যই মার্কিন বাহিনী কোনো প্রকার আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেয়নি বলে তাঁর দাবি।

সাময়িক যুদ্ধবিরতি ও আলোচনা স্থগিতের সিদ্ধান্ত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে এই শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি অধ্যায়। ট্রাম্প অ্যাক্সিওসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক তথ্য ফাঁস করেছেন। তিনি জানান যে, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা পুরোপুরি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সব ধরনের চলমান পারস্পরিক আলোচনা বা কূটনৈতিক যোগাযোগ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এই সংকটকালীন সময়ে দুই দেশের সামরিক অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, “আমরা একটি অলিখিত সমঝোতায় পৌঁছেছি যে, এই শেষ বিদায়ের পবিত্র বা রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার সময় কোনো পক্ষই অন্য পক্ষকে লক্ষ্য করে গুলি চালাবে না বা কোনো উসকানিমূলক আক্রমণ করবে না।” এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি বা স্থবিরতা প্রমাণ করে যে, পর্দার আড়ালে দুই দেশের কূটনীতিকরা পরিস্থিতি যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়, সে জন্য তৎপর রয়েছেন।

১ কোটিরও বেশি মানুষের সমাগমের ঐতিহাসিক রেকর্ড

এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের এই শেষ বিদায় অনুষ্ঠানটি আধুনিক মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম সমাগমে পরিণত হতে যাচ্ছে। বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ পরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে খামেনির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ইতিমধ্যেই বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল, কূটনীতিক এবং রাষ্ট্রপ্রধানরা তেহরানে এসে পৌঁছেছেন।

আরও পড়ুন: তেহরানে আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রথম জানাজা সম্পন্ন: লাখো মানুষের ঢল ও ভূ-রাজনীতিতে নতুন মোড়

ইরানের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, রাজধানী তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আয়োজিত এই শোক পদযাত্রায় অন্তত ১ কোটিরও বেশি মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমবেত হবেন। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ সামরিক জোটের সরাসরি হুমকির মুখেও এত বিশাল সংখ্যক মানুষের রাস্তায় নেমে আসা ইরানের ভেতরের ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী শক্তির এক বিশাল বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও ভবিষ্যত সমীকরণ

ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই "বিস্ময় প্রকাশ" এবং ইরানের প্রতি নরম-গরম সুর মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে এক নতুন মোড় নিতে পারে বলে ধারণা করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। ট্রাম্পের এই সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণ করে তারা কয়েকটি প্রধান দিক চিহ্নিত করেছেন:

  • মার্কিন ধারণার পরিবর্তন: ইরানের শাসনব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থার অভাব রয়েছে বলে পশ্চিমা মিডিয়া যে প্রচার চালিয়ে আসছিল, এই ঘটনার পর মার্কিন প্রশাসনকে সেই নীতি পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে।

  • ইসরায়েলের ওপর চাপ: ইরান যদি অভ্যন্তরীণভাবে এতটা সুসংগঠিত এবং নেতার প্রতি অনুগত থাকে, তবে এককভাবে ইসরায়েল বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ইরানে শাসন পরিবর্তন (Regime Change) করা প্রায় অসম্ভব।

  • কূটনৈতিক দরকষাকষি: খামেনির দাফন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর যখন পুনরায় আলোচনা শুরু হবে, তখন ইরান টেবিল টকে অনেক বেশি সুবিধাজনক ও শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে।

পরিশেষে বলা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সাক্ষাৎকারটি এটিই প্রমাণ করে যে, যুদ্ধক্ষেত্রের অস্ত্রের চেয়ে একটি দেশের জনগণের মনস্তাত্ত্বিক ঐক্য ও আবেগ অনেক বেশি শক্তিশালী, যা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পরাশক্তিকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

সংক্ষিপ্ত সংবাদ সূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।

1 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন