যমুনার তীরে আড়াইশত বছরের ঐতিহ্য: শাহজাদপুরের কৈজুরী নৌকার হাট

যমুনার তীরে আড়াইশত বছরের ঐতিহ্য: শাহজাদপুরের কৈজুরী নৌকার হাট
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

যমুনার তীরে আড়াইশত বছরের ঐতিহ্য: শাহজাদপুরের কৈজুরী নৌকার হাট

নদীমাতৃক বাংলাদেশের ইতিহাস ও লোকজ ঐতিহ্য নদীর সাথেই অতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। উত্তরবঙ্গের প্রখ্যাত শিল্প ও সাহিত্য কেন্দ্র সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলা এমনই এক অনন্য ভূখণ্ড, যা যমুনা নদীর সাথে নিজ অস্তিত্ব বজায় রেখে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই উপজেলার যমুনা নদীর কোলঘেঁষে বসা ঐতিহাসিক কৈজুরী নৌকার হাট বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ হাটগুলোর একটি। আনুমানিক আড়াইশ বছর আগে শুরু হওয়া এই হাটটি আজও তার প্রাচীন বৈশিষ্ট্য, আভিজাত্য এবং বাণিজ্যিক গুরুত্ব বজায় রেখে সচল রয়েছে, যা আধুনিক যুগের পরিবর্তনশীলতার মাঝে এক বিরল দৃষ্টান্ত।

কালের আবর্তে যাতায়াত ব্যবস্থার বৈপ্লবিক আধুনিকায়ন হয়েছে, তৈরি হয়েছে নতুন নতুন পাকা রাস্তাঘাট ও সেতু। কিন্তু চরাঞ্চল ও নদীবেষ্টিত জনপদের মানুষের কাছে নৌকার প্রয়োজনীয়তা এখনো একটুও কমে যায়নি। বর্ষার মৌসুমে যখন চারদিকের চরাঞ্চল প্লাবিত হয় এবং প্লাবনভূমির দিগন্তজুড়ে জলরাশি থৈ থৈ করে, তখন নদীপার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষের মূল ভূখণ্ডের সাথে যোগাযোগের প্রধান এবং একমাত্র মাধ্যম হয়ে ওঠে নৌকা। আর এই নৌকার চাহিদা মেটাতে প্রতি বছর নির্দিষ্ট মৌসুমে জমজমাট হয়ে ওঠে কৈজুরী ইউনিয়নের এই প্রাচীন হাটের প্রতিটি প্রান্ত।

আরও পড়ুন: মদনে মোবাইল কোর্টের অভিযান: তিন মাদকসেবীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলেরও আগে থেকে যমুনা তীরবর্তী এই কৈজুরী এলাকায় নদীপথে মালামাল পরিবহনের সুবিধার্থে বিভিন্ন স্থান থেকে কাঠমিস্ত্রী ও কারিগররা এসে নৌকা বিক্রি শুরু করেন। পরবর্তীতে সেই ছোট পরিসর থেকে সময়ের স্রোতে এটি এক বিশাল নৌকার হাটে রূপান্তরিত হয়। শাহজাদপুর ছাড়াও পার্শ্ববর্তী জেলা পাবনা, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, জামালপুর এবং বগুড়ার দূর-দূরান্ত থেকে শত শত ক্রেতা ও বিক্রেতা এই হাটে ভিড় জমান। বিশাল যমুনা নদীর পানি যখন বর্ষায় বৃদ্ধি পেতে থাকে, ঠিক তখনই কৈজুরী নৌকার হাটে তৈরি হয় এক অভাবনীয় উৎসবমুখর পরিবেশ।

কৈজুরী হাটে বিভিন্ন আকার ও ধরনের কাঠ দিয়ে তৈরি নৌকা দেখতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে বিশেষ করে কোষা, ডিঙ্গি, পালতোলা নৌকা এবং চরাঞ্চলে চলাচলের উপযোগী বিশেষ ধরনের ট্রলার বা মালামাল বহনের উপযোগী সাধারণ দেশি নৌকাগুলো বেশি বিক্রি হয়। কারিগররা জানান, শাল, কড়ই, জিলপি, রেনট্রি, মেহগনি এবং আম কাঠ দিয়ে তারা দীর্ঘস্থায়ী ও মজবুত নৌকা তৈরি করেন। একটি ছোট ডিঙ্গি নৌকা থেকে শুরু করে বড় আকারের মালামাল বহনের নৌকাগুলোর দামও কাঠের মান ও আকারের ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন হয়। হাটে আসা অভিজ্ঞ কারিগররা জানান, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এই ঐতিহ্যবাহী পেশাকে আগলে রেখেছেন, যা কেবল জীবিকা নয়, বরং তাদের রক্তের সাথে মিশে থাকা একটি শিল্প।

হাটের দিনগুলোতে যমুনার তীরে সারি সারি সাজিয়ে রাখা নতুন নৌকার দৃশ্য যেকোনো পথিকের চোখ জুড়িয়ে দেয়। নদীর ওপর ভেসে থাকা নতুন কাঠের সুবাস আর হাটের হাজারো মানুষের কলকাকলি চারপাশের পরিবেশকে এক ভিন্ন রূপ দান করে। স্থানীয় চরাঞ্চলের কৃষক, জেলে এবং সাধারণ ব্যবসায়ীরা কেবল নিজেদের দৈনন্দিন যাতায়াত বা পণ্য পরিবহনের জন্যই নয়, বরং বন্যা ও প্লাবনের সময় পরিবারের নিরাপত্তার স্বার্থেও এই হাট থেকে নৌকা কিনে থাকেন। ফলে কৈজুরী নৌকার হাট কেবল একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবেই নয়, বরং চরাঞ্চলীয় জনগোষ্ঠীর দুর্যোগ মোকাবিলার এক অনন্য আশ্রয়স্থল হিসেবেও কাজ করে।

আরও পড়ুন: এনায়েতপুরে পরকীয়ায় বাধা দেওয়ায় ব্যবসায়ীর ওপর হামলা ও লুটপাট

তবে বর্তমান যুগে আধুনিক বিজ্ঞানের ছোঁয়া আর প্রযুক্তির বিকাশের ফলে যান্ত্রিক নৌকার আগমন ঘটেছে সত্যি, কিন্তু হস্তশিল্পে নির্মিত ঐতিহ্যবাহী কাঠের ডিঙ্গি ও কোষা নৌকার কদর এখনো ফুরিয়ে যায়নি। যমুনার ভাঙন এবং নানাবিধ প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েও কৈজুরী নৌকার হাট যেভাবে তার সোয়া দুই শতাব্দীর পুরোনো ইতিহাস রক্ষা করে চলেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। আধুনিক প্রযুক্তির আগ্রাসনে যখন অনেক প্রাচীন লোকজ ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে, তখন এই নৌকার হাটটি বাংলাদেশের নদীভিত্তিক সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল স্মারক হিসেবে টিকে রয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, কৈজুরী নৌকার হাট কেবল কাঠ ও নৌকার বেচাকেনার স্থান নয়, এটি নদীর সাথে মানুষের আত্মিক টান ও শাহজাদপুরের শতবছরের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক। স্থানীয় জনগণ এবং ঐতিহ্যপ্রেমীদের দাবি, এই আড়াইশ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী হাটটির অবকাঠামোগত মান উন্নয়ন ও নিরাপত্তা জোরদার করা হলে এটি পর্যটন শিল্পের ক্ষেত্রেও একটি সম্ভাবনাময় কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। যত দিন যমুনায় পানি থাকবে এবং নদীভিত্তিক জীবনধারা প্রবহমান থাকবে, তত দিন কৈজুরী নৌকার হাট তার এই ঐতিহাসিক গৌরব নিয়ে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে।


সূত্র: স্থানীয় প্রতিনিধি ও সরেজমিন তথ্য, দিগন্ত বাংলা নিউজ।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন