শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড: শেখ হাসিনা ও জেনারেল আজিজসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন জমা!

শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড: শেখ হাসিনা ও জেনারেল আজিজসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন জমা!
ছবি: সংগৃহীত
 ঢাকা ব্যুরো, ১৯ জুলাই ২০২৬:

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কজনক ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হিসেবে পরিচিত ২০১৩ সালের ৫ মে’র মতিঝিল শাপলা চত্বরের নৃশংস গণহত্যার ঘটনার আইনগত তদন্ত প্রক্রিয়ায় এক বিশাল ও ঐতিহাসিক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় পর বহুল আলোচিত এই শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের হাতে এসে পৌঁছেছে। এই চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্তে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সদ্য পতন হওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা, পুলিশের সাবেক বিতর্কিত মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ এবং সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদসহ তৎকালীন সরকারের উচ্চপর্যায়ের মোট ৪১ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও নিরাপত্তা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরাসরি গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়েছে।

​আজ রবিবার (১৯ জুলাই) ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলামের কার্যালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিশেষ নথির অগ্রগতি ও তদন্ত প্রতিবেদন প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

প্রসিকিউশন কার্যালয়ে হেফাজত নেতাদের বৈঠক ও অগ্রগতি প্রকাশ

আরও পড়ুন: ট্রাম্পকে ‘মহাশয়তান’ আখ্যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে কঠিন শিক্ষার হুঁশিয়ারি মোজতবা খামেনির!

​প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, আজ রোববার সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলামের সাথে তাঁর কার্যালয়ে একটি বিশেষ রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। শাপলা চত্বর মামলার তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা এবং এর আইনি অগ্রগতি সম্পর্কে বিশদভাবে জানার জন্য হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের ১০ থেকে ১৫ জন সিনিয়র নেতার সমন্বয়ে গঠিত একটি উচ্চপ্রতিনিধি দল সেখানে উপস্থিত হন। ওই বৈঠকের একপর্যায়ে চিফ প্রসিকিউটর হেফাজত নেতাদের অবহিত করেন যে, ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে ৪১ জন মূল আসামির বিরুদ্ধে অপরাধের প্রাথমিক প্রমাণ সংবলিত চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশন প্যানেলের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে। এই খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং সাধারণ নাগরিকদের মাঝে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে।

চার জেলায় নজিরবিহীন প্রাণহানি ও দমনপীড়নের ভয়াবহ পরিসংখ্যান

​এর আগে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম গণমাধ্যম ও বিচারপ্রার্থী জনগণের সামনে পূর্ববর্তী অনুসন্ধানের কিছু ভয়াবহ তথ্য ও পরিসংখ্যান তুলে ধরেছিলেন। প্রসিকিউশনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের মে মাসের ওই সময়টাতে শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকাতেই নয়, বরং সরকারি বাহিনীর চালানো এই ক্র্যাকডাউন বা দমনপীড়নকে কেন্দ্র করে দেশের প্রধান প্রধান কয়েকটি জেলাতেও ব্যাপক আকারে রক্তপাত ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল।

তদন্তে উঠে আসা প্রধান ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:

ঢাকা (মতিঝিল ও সংলগ্ন এলাকা): সমাবেশের মূল কেন্দ্রস্থল হওয়ায় এখানে সবচেয়ে বেশি নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত মাদরাসা শিক্ষার্থী ও সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।

নারায়ণগঞ্জ (কাঁচপুর ও সাইনবোর্ড এলাকা): শাপলা চত্বরের ঘটনার প্রতিবাদে এবং ঢাকাগামী হেফাজত কর্মীদের ওপর হামলার জেরে এই অঞ্চলে ব্যাপক সংঘর্ষ ও নির্বিচারে গুলি চালানো হয়।

কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম: ট্রাইব্যুনালের তথ্যমতে, এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ জেলাতেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আক্রমণাত্মক অভিযানের কারণে অসংখ্য সাধারণ মানুষ ও আন্দোলনকারী প্রাণ হারান।

​চিফ প্রসিকিউটরের দেওয়া পূর্ববর্তী হিসাব অনুযায়ী, এই চার জেলায় সংঘটিত অভিযানে সর্বমোট ৫৮ জন নিরীহ নাগরিক ও আন্দোলনকারী হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার অকাট্য দালিলিক প্রমাণ ইতিমধ্যেই প্রসিকিউশনের সংগ্রহশালায় জমা হয়েছে। নতুন এই তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা এবং আসামিদের সুনির্দিষ্ট অপরাধের মাত্রা আরও স্পষ্ট হবে বলে আইনি বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

৫ মে রাতের সেই কৃষ্ণ অধ্যায়: যেভাবে চলেছিল যৌথ অভিযান

​মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণী এবং তদন্তের নথিপত্র থেকে জানা যায়, ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকা ঘেরাও কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজধানী ঢাকার বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিলের শাপলা চত্বর প্রাঙ্গণে মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছিল অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। দিনভর নানা উত্তেজনা শেষে গভীর রাতে যখন হাজার হাজার মাদরাসা ছাত্র ও ধর্মপ্রাণ মানুষ শাপলা চত্বরে অবস্থান নিয়ে ঘুমাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই তৎকালীন সরকারের নির্দেশে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা এক যৌথ ও নির্মম সামরিক স্টাইলের ক্র্যাকডাউন পরিচালনার নীল নকশা প্রণয়ন করেন।

​অভিযোগ রয়েছে যে, ওই দিন রাত ১১টার পর সুপরিকল্পিতভাবে সমগ্র মতিঝিল ও তার আশেপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার বাণিজ্যিক ও আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়ার পর বাংলাদেশ পুলিশ, র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশাল ও ভারী অস্ত্রে সজ্জিত যৌথ বাহিনী চারদিক থেকে শাপলা চত্বর এলাকা অবরুদ্ধ করে ফেলে।

​পরবর্তীতে অন্ধকার রাতেই কোনো প্রকার পূর্ব সতর্কবার্তা ছাড়াই ঘুমন্ত ও অবস্থানকারী আন্দোলনকারীদের ওপর হাজার হাজার রাউন্ড সাউণ্ড গ্রেনেড, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টিয়ারশেল, রাবার বুলেট এবং নির্বিচারে মারণাস্ত্রের তাজা গুলি বর্ষণ করা হয়। একই সাথে চলে চারদিক থেকে লাঠিচার্জ ও সাঁজোয়া যানের (এপিসি) মাধ্যমে ধাওয়া। এই ত্রিমুখী ও ভয়াবহ আক্রমণের মুখে নিরস্ত্র আন্দোলনকারীরা সম্পূর্ণ ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন এবং গভীর অন্ধকার ও বুলেটের আঘাতে শত শত মানুষ রক্তাক্ত হন।

আরও পড়ুন: উল্লাপাড়ায় রেললাইনে বসে মোবাইল ফোনে খেলা দেখার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে যুবকের মৃত্যু

​তদন্ত সংস্থা তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি সবুজ সংকেত এবং তৎকালীন সেনাপ্রধান ও পুলিশ প্রধানের প্রত্যক্ষ রণকৌশলগত নির্দেশনার কারণেই এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে পেরেছিল। যা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের আওতায় মানবতাবিরোধী অপরাধের সমতুল্য।

বিচার প্রক্রিয়ার আগামী দিনের রূপরেখা

​প্রসিকিউশন টিমের সদস্যগণ জানিয়েছেন, হাতে পাওয়া এই তদন্ত প্রতিবেদনটি এখন তাদের বিশেষ আইনি প্যানেল দ্বারা সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করা হবে। ৪১ জন আসামির বিরুদ্ধে আনা সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর বিপরীতে পর্যাপ্ত সাক্ষী, নথিপত্র, অডিও-ভিডিও ক্লিপ এবং ডিজিটাল এভিডেন্স বা প্রমাণাদি সঠিকভাবে সন্নিবেশিত আছে কিনা তা যাচাই করা হবে। এই আইনি স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর খুব দ্রুতই প্রসিকিউশন টিম ট্রাইব্যুনালের মূল আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র বা চার্জশিট গঠন করার জন্য আবেদন দাখিল করবে। ভুক্তভোগী পরিবার এবং হেফাজতে ইসলামের নেতৃবৃন্দ আশা প্রকাশ করেছেন যে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এবার তারা এই ঐতিহাসিক হত্যাকাণ্ডের একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার পাবেন এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হবে।

সংবাদ সূত্র: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয় ও মামলার নথিপত্র।

1 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন