মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে চলমান উত্তেজনার পারদ এবার চরম সীমায় পৌঁছেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে এক নজিরবিহীন হুঁশিয়ারি বার্তা উচ্চারণ করেছে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘মহাশয়তান’ হিসেবে আখ্যায়িত করে ওয়াশিংটনকে চরম শিক্ষা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মোজতবা খামেনি। তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় স্পষ্ট করে বলেছেন, মার্কিন প্রশাসন যদি ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত ও অবৈধ আগ্রাসন এবং সশস্ত্র হামলা চালানো অব্যাহত রাখে, তবে হোয়াইট হাউসের জন্য এমন এক ‘অবিস্মরণীয় ও ঐতিহাসিক শিক্ষা’ অপেক্ষা করছে যা তারা কখনো কল্পনাও করতে পারেনি। একই সময়ে তিনি মার্কিন প্রশাসনের বিরুদ্ধে গত মাসে সম্পাদিত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও পারস্পরিক সমঝোতা বারবার পদদলিত ও লঙ্ঘন করার অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছেন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার (১৮ জুলাই) ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির পক্ষ থেকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লিখিত বিবৃতি পাঠ করা হয়। ওই আনুষ্ঠানিক বার্তায় অত্যন্ত জোরালোভাবে বলা হয়েছে যে, দুই দেশের চলমান সংকট নিরসনে গত মাসে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তা বারবার ভঙ্গ করেছে। এর মাধ্যমে ওয়াশিংটন এবং বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বদরবারে আবারও প্রমাণ করেছেন যে, বৈশ্বিক শান্তি ও চুক্তির ক্ষেত্রে তাঁর সই বা প্রতিশ্রুতির বিন্দুমাত্র কোনো আইনি মূল্য বা আন্তর্জাতিক বৈধতা নেই।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের গুরুতর অভিযোগ
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয় থেকে প্রচারিত ওই বিশেষ লিখিত বিবৃতিতে ওয়াশিংটনের সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র উন্মোচন করে বেশ কিছু কড়া মন্তব্য করা হয়েছে। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়:
"আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চুক্তি ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই ‘মহাশয়তান’ বারবার নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা আবারও বিশ্ববাসীর সামনে স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধানের স্বাক্ষরের কার্যকারিতা এখন সম্পূর্ণ মূল্যহীন এবং আন্তর্জাতিকভাবে এটি একটি অবৈধ দলিল মাত্র। মূলত অন্য দেশের ওপর জোর খাটানো, দাদাগিরি করা, আধিপত্য বিস্তারের নোংরা চেষ্টা এবং বর্বরতা চালানোই আমেরিকার মূল রাষ্ট্রীয় নীতি ও রাজনৈতিক মতবাদের অন্যতম অবিচ্ছেদ্য অংশ।"
বিবৃতিতে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করে আরও বলা হয় যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আমেরিকা যখন গোটা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ উসকে দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে, তখন তারা নিজের অজান্তেই নিজেদের জন্য এক বিশাল অর্থনৈতিক মূল্য এবং চরম আন্তর্জাতিক অপমান ডেকে আনছে। মার্কিন নীতিনির্ধারকদের এটা ভালো করেই মনে রাখা উচিত যে— বীর ইরানি জাতি এবং সমগ্র ‘প্রতিরোধ ফ্রন্ট’ (রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট) মার্কিন আগ্রাসনের দাঁতভাঙা জবাব দিতে এবং তাদের জন্য একটি চূড়ান্ত ও অবিস্মরণীয় শিক্ষা প্রস্তুত করে রেখেছে।
ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোতে মার্কিন হামলা এবং তেহরানের পাল্টা জবাব
সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা তথ্য ও মাঠপর্যায়ের খবরাখবর থেকে জানা গেছে, গত কয়েক সপ্তাহে ইরানের অভ্যন্তরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কৌশলগত হামলার তীব্রতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক স্থাপনা, সাধারণ মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত সেতু, দূরপাল্লার রেলপথ এবং দেশের মানুষের টিকে থাকার অন্যতম উৎস সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে একের পর এক সুপরিকল্পিত হামলা পরিচালনা করেছে। বেসামরিক স্থাপনার ওপর এই মার্কিন আগ্রাসনের তীব্র প্রতিক্রিয়া ও সরাসরি পাল্টা জবাব হিসেবে তেহরানের পক্ষ থেকে প্রতিবেশী কুয়েতের অভ্যন্তরে মার্কিন সামরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বেশ কিছু বেসামরিক অবকাঠামোতে সফলভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর বড় দাবি করা হয়েছে। এই ঘটনার পরপরই উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় এবং জাতীয় গ্রিডের ভারসাম্য বজায় রাখতে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ দেশের সাধারণ নাগরিকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারে সর্বোচ্চ সাশ্রয়ী ও মিতব্যয়ী হওয়ার জন্য জরুরি নির্দেশনা ও বিশেষ আহ্বান জারি করেছে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি যৌথ জোটের বিরুদ্ধে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতকে ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব মূলত তাদের রাষ্ট্র ও জাতির একটি ‘অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই’ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে।
কূটনীতির ব্যর্থতা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের সংকটের শঙ্কা
ওয়াশিংটন ও ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্রমাগত বাড়তে থাকা সর্বাত্মক অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ সত্ত্বেও তেহরানের শীর্ষ নেতৃত্ব মার্কিন শক্তির কাছে বিন্দুমাত্র নতি স্বীকারের কোনো লক্ষণ প্রকাশ করছে না। বরং তারা সর্বশক্তি দিয়ে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। যদিও একই সময়ে পর্দার আড়ালে মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী আঞ্চলিক দেশ এই বিপজ্জনক সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটাতে এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থামাতে জোরদার কূটনৈতিক তৎপরতা ও মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
গত মাসে কাতার এবং পাকিস্তানের অত্যন্ত নিবিড় ও দ্বিপাক্ষিক মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। যার একমাত্র মূল লক্ষ্য ছিল চলমান যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করার জন্য একটি অনুকূল ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, চুক্তি সম্পাদনের কিছুদিন পরেই দুই পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে গুরুতর শর্ত ভঙ্গের ও অনাস্থার অভিযোগ উত্থাপন করতে শুরু করে। ফলশ্রুতিতে তেহরান ও ওয়াশিংটন উভয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয় যে, মধ্যস্থতাকারীদের তৈরি করা সেই ঐতিহাসিক সমঝোতাটি বর্তমানে সম্পূর্ণ অকার্যকর এবং এর কোনো আইনি অস্তিত্ব অবশিষ্ট নেই।
আরও পড়ুন: শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি: রাজপথে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের তীব্র ক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ
বর্তমান যুদ্ধাবস্থার চরম অবনতি ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মাঝে নতুন একটি আশঙ্কার খবর তীব্রভাবে সামনে এসেছে। জানা গেছে যে, বৈশ্বিক সংঘাতে ইরানের অন্যতম প্রধান ও শক্তিশালী মিত্র ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল নৌপথ লোহিত সাগরে প্রবেশের প্রধান প্রবেশদ্বার ‘বাব আল-মান্দেব প্রণালি’ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়ার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করছে। যদি কোনো কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথটি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে তা মুহূর্তের মধ্যে সমগ্র বিশ্ববাজারের জ্বালানি খাতে এক অভূতপূর্ব ও প্রলয়ংকরী অস্থিরতা তৈরি করবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়বে, বিশ্বজুড়ে তীব্র মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে এবং ইরানের ওপর চালানো যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক মহলের চাপ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। মূলত এই কারণেই বর্তমান যুদ্ধটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের কাছে দিন দিন চরমভাবে অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে এবং এটি খোদ মার্কিন অর্থনীতিরও ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে চলেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তাঁর ভাষণের শেষাংশে বলেন, যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার ‘আসল কদর্য চেহারা’ উন্মোচন করে ফেলেছে। এর ফলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চিরাচরিত প্রতারণা, চরম অযৌক্তিকতা, বৈশ্বিক অবিশ্বাসযোগ্যতা এবং তাদের ভেতরের অসৎ চরিত্র আজ বিশ্ববাসীর সামনে দিবালোকের মতো পরিষ্কার। তিনি কঠিন এই জাতীয় সংকটের মুহূর্তে দেশের সামগ্রিক নেতৃত্ব ও সশস্ত্র বাহিনীর ওপর গভীর আস্থা রাখার জন্য সাধারণ জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। একই সাথে সম্ভাব্য যেকোনো বিদেশী আগ্রাসন নস্যাৎ করতে দেশের প্রতিটি নাগরিককে সর্বোচ্চ সতর্ক, ঐক্যবদ্ধ এবং স্ব-স্ব ক্ষেত্রে সক্রিয় থাকার জন্য বিশেষ পরামর্শ দিয়েছেন।
সংবাদ সূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।