নেতানিয়াহু পুনরায় ক্ষমতায় ফিরলে দেশ ছাড়ার ভাবনায় এক-চতুর্থাংশ ইসরায়েলি!

নেতানিয়াহু পুনরায় ক্ষমতায় ফিরলে দেশ ছাড়ার ভাবনায় এক-চতুর্থাংশ ইসরায়েলি!
ছবি: সংগৃহীত
 আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ১৮ জুলাই ২০২৬:

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এবং ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থায় এক নজিরবিহীন সামাজিক ও রাজনৈতিক ফাটল দেখা দিয়েছে। দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অতি-ডানপন্থী ও কট্টরপন্থী রাজনৈতিক নীতিমালার কারণে সাধারণ জনগণের একটি বিশাল অংশ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরমভাবে শঙ্কিত। সমসাময়িক এক চাঞ্চল্যকর সমীক্ষায় দেখা গেছে, আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যদি পুনরায় জয়ী হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণ করেন, তবে দেশটির প্রায় এক-চতুর্থাংশ বা ২৩ শতাংশ সাধারণ নাগরিক নিজেদের মাতৃভূমি চিরতরে ত্যাগ করে অন্য কোনো রাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছেন। শনিবার (১৮ জুলাই) ইসরায়েলের শীর্ষস্থানীয় ও প্রভাবশালী গণমাধ্যম 'চ্যানেল ১২'-এর পরিচালিত একটি নতুন জনমত জরিপের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এই বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করেছে। এই সমীক্ষা প্রকাশ্যে আসার পর তেল আবিবের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে তীব্র আলোড়ন ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

আরও পড়ুন: বাগমারায় চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় সাবেক যুবদল নেতাকে পিটিয়ে জখম, কাঠগড়ায় ৩ ছাত্রদল নেতা!

​জনমত জরিপের বিস্তারিত পরিসংখ্যান

​ইসরায়েলি নাগরিকদের বর্তমান মানসিক অবস্থা এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে এই বিশেষ সমীক্ষাটি পরিচালনা করা হয়। প্রকাশিত ওই জরিপের ডেটা বিশ্লেষণ করলে দেশটির অভ্যন্তরীণ বিভাজনের একটি স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে:

​দেশ ত্যাগের ভাবনায় নাগরিক: কট্টরপন্থী নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য নতুন শাসনকাল এবং শাসনব্যবস্থার নেতিবাচক পরিবর্তনের আশঙ্কায় প্রায় ২৩ শতাংশ নাগরিক দেশ ছাড়ার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

​দেশে থাকার সিদ্ধান্ত: বিপরীতে, দেশের অন্য ৬৮ শতাংশ নাগরিক জানিয়েছেন যে দেশের এই উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যেও তারা এই মুহূর্তে নিজ ভূমি পরিত্যাগ করার কোনো পরিকল্পনা করছেন না।

​দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকা অংশ: জরিপে অংশগ্রহণকারী অবশিষ্ট উত্তরদাতারা এই মুহূর্তে নির্দিষ্ট করে কোনো উত্তর দিতে পারেননি এবং দেশ ত্যাগ বা থাকার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি।

​ক্ষোভের মূল কারণ: বিতর্কিত আধা-সাংবিধানিক নতুন আইন

​রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলি নাগরিকদের একাংশের মধ্যে হঠাৎ করে দেশ ছাড়ার এই চরম অনীহা বা প্রবণতা তৈরির পেছনে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে চলতি সপ্তাহে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টর জোট সরকারের পাস করা একটি অত্যন্ত বিতর্কিত আইন। নতুন এই আইনি সংস্কারের বিরুদ্ধে দেশটির প্রায় ৬৭ শতাংশ সাধারণ জনগণ তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে এর প্রকাশ্য বিরোধিতা করেছেন।

​এই বিতর্কিত আইনের প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১. তাওরাত অধ্যায়নের আধা-সাংবিধানিক স্বীকৃতি: নতুন এই আইনের মাধ্যমে ইহুদি ধর্মগ্রন্থ তাওরাত অধ্যায়নকে রাষ্ট্রে আধা-সাংবিধানিক মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

২. সামরিক সেবায় বিশেষ ছাড়: ইসরায়েলে সাধারণ নাগরিকদের জন্য সামরিক বাহিনীতে যোগদান বাধ্যতামূলক হলেও, এই আইনের মাধ্যমে কট্টর অর্থোডক্স (আল্ট্রা-অরথোডক্স) ইসরায়েলিদের সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদান এড়ানোর আইনি পথ তৈরি করা হয়েছে।

৩. গ্রেপ্তার হওয়া থেকে সুরক্ষা: নতুন আইনের সুবিধাভোগী কট্টর অর্থোডক্স ইহুদিরা সামরিক সেবা অমান্য করলেও তাদের গ্রেপ্তার বা কোনো প্রকার আইনি শাস্তির মুখোমুখি হওয়া থেকে বিশেষ সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে।

​তীব্র সামাজিক বৈষম্য ও জনমনে অসন্তোষ

​ইসরায়েলের সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এই আইনটি দেশের প্রচলিত ধর্মনিরপেক্ষ নীতি এবং সমতার পরিপন্থী। যেখানে সাধারণ পরিবারের তরুণ-তরুণীদের দেশের সুরক্ষায় বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে হচ্ছে এবং জীবনের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে, সেখানে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্পূর্ণ ছাড় দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই বৈষম্যমূলক নীতির কারণে সাধারণ ধর্মনিরপেক্ষ ও মধ্যপন্থী ইসরায়েলিদের মাঝে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের প্রতি চরম অনাস্থা তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন: শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে সিরাজগঞ্জে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ

​সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের সাধারণ জনগণের মাত্র ২১ শতাংশ এই ধর্মীয় ও সামরিক ছাড় সংক্রান্ত নতুন আইনি পদক্ষেপের প্রতি নিজেদের সমর্থন ব্যক্ত করেছেন, যারা মূলত নেতানিয়াহুর কট্টরপন্থী রাজনৈতিক জোটের কট্টর সমর্থক। এছাড়া বাকি একটি ক্ষুদ্র অংশ এই স্পর্শকাতর বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

​বিশেষজ্ঞদের চোখে ইসরায়েলের অন্ধকার ভবিষ্যৎ

​আন্তর্জাতিক ও ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, নেতানিয়াহুর এই একচেটিয়া ক্ষমতার মোহ এবং ধর্মীয় দলগুলোকে তুষ্ট করার নীতি ইসরায়েলকে অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী, উচ্চশিক্ষিত এবং ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিকদের একাংশ যদি সত্যিই দেশ ত্যাগ করতে শুরু করে, তবে দেশটির অর্থনীতি, প্রযুক্তি খাত এবং সামরিক কাঠামোতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। নাগরিকদের এই দেশ ছাড়ার প্রবণতা মূলত নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে এক ধরনের নীরব গণঅভ্যুত্থান হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

​সংবাদ সূত্র: ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২ এবং মিডল ইস্ট আই।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন