এই গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠকের উদ্দেশ্যে বুধবার (১৫ জুলাই ২০২৬) বিকেল আনুমানিক ৫টা শূন্য মিনিটের দিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মনোনীত একটি বিশেষ প্রতিনিধিদল রাজধানীর ঐতিহাসিক শিক্ষা ভবন এলাকা থেকে দেশের প্রশাসনিক হৃদপিণ্ড তথা বাংলাদেশ সচিবালয়ের অভিমুখে রওনা দেয় এবং আলোচনার জন্য ভেতরে প্রবেশ করে।
এর আগে দুপুর থেকেই রাজধানীর রাজপথ ছিল শিক্ষার্থীদের স্লোগানে উত্তাল। পৌনে ৪টা শূন্য মিনিটের দিকে ঢাকার আব্দুল গণি রোডের প্রবেশদ্বারে অবস্থিত শিক্ষা ভবনের ঠিক সামনে বিশাল পুলিশি ব্যারিকেড ও কাঁটাতারের বেষ্টনী দিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পথরোধ করা হয় এবং তাদের আটকে দেওয়া হয়। তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়া এই বিশাল শিক্ষার্থী বহরটি সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় থেকে পদযাত্রা শুরু করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তথা সচিবালয়ের দিকে ধাবমান ছিল।
আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬ উপলক্ষে দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির বর্ণাঢ্য উদ্বোধন
পূর্বঘোষিত ও পূর্বপরিকল্পিত রাজপথের কর্মসূচি অনুযায়ী, বুধবারের পূর্বনির্ধারিত এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই শিক্ষার্থীরা বিশাল লংমার্চের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ‘লংমার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয়’ নামক এই কর্মসূচির সূচনা করতে দুপুর আড়াইটা শূন্য মিনিটের দিকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ব্যানার ও ফেস্টুনসহ রাজধানীর অতি গুরুত্বপূর্ণ সায়েন্স ল্যাবরেটরি সড়কে এসে অবস্থান গ্রহণ করে। এর ফলে সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ের মতো ব্যস্ততম চারমাথার সড়ক দিয়ে সকল প্রকার যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণভাবে স্তব্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে বিকেল সোয়া ৩টা শূন্য মিনিটের দিকে সায়েন্স ল্যাব মোড় থেকে হাজারো পরীক্ষার্থীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মূল পদযাত্রাটি সচিবালয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে।
উদ্ভূত জটিল পরিস্থিতি নিরসনকল্পে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট যে ৬ দফা প্রস্তাব বা দাবি পেশ করা হয়েছে, তা নিচে পর্যায়ক্রমে উল্লেখ করা হলো:
১. দুর্যোগকালীন পরীক্ষার বিশেষ সুযোগ: প্রতিকূল ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় অংশ নিতে ব্যর্থ হওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার বিশেষ সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
২. সর্বোচ্চ নম্বর মূল্যায়ন পদ্ধতি: যেসব শিক্ষার্থী কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের পরীক্ষা পুনরায় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে, তাদের ক্ষেত্রে পূর্বের সাধারণ পরীক্ষা এবং পরবর্তী পুনঃপরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে যেটিতে বেশি নম্বর আসবে, সেটিকেই চূড়ান্ত হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
৩. ভুল প্রশ্নের পূর্ণ নম্বর প্রদান: পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে প্রিন্টিং বা অন্য কোনো কারণে ভুল থাকা প্রশ্নের বিপরীতে সকল সাধারণ পরীক্ষার্থীকে আইনিভাবে শতভাগ বা পূর্ণ নম্বর প্রদান করতে হবে।
৪. মানসিক স্থিতিশীলতার জন্য সময় বরাদ্দ: দেশে চলমান অস্থিতিশীল ও মানসিক চাপযুক্ত পরিবেশ বিবেচনা করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ ফিরিয়ে আনার জন্য এবং মানসিকভাবে তৈরি হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় দিয়ে পরবর্তী পরীক্ষাগুলো নতুন সময়সূচিতে গ্রহণ করতে হবে।
৫. পূর্বঘোষণা ছাড়া প্রশ্ন পরিবর্তনের সুবিচার: পরীক্ষার পূর্বে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই প্রশ্নপত্রের কাঠামো ও ধরনে যে অভূতপূর্ব পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা বিগত শিক্ষাবর্ষগুলোর তুলনায় শিক্ষার্থীদের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল, তা বিবেচনা করে খাতা মূল্যায়নের সময় বিশেষ ছাড় দিতে হবে।
৬. পরীক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষকদের হয়রানি বন্ধ: পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে তথাকথিত ‘সচেতন গার্ড’ বা পরিদর্শকের নামে কিছু শিক্ষকের অহেতুক কঠোর, ভীতিপ্রদ এবং বিভ্রান্তিকর আচরণ অতি দ্রুত বন্ধ করতে হবে, যেন কোমলমতি শিক্ষার্থীরা পরীক্ষাকক্ষে কোনো ধরনের মানসিক চাপের সম্মুখীন না হয়।
এই আন্দোলনের সূত্রপাত অবশ্য হঠাৎ করে হয়নি। এর আগে বুধবার দুপুর থেকেই বর্তমান সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের তাৎক্ষণিক পদত্যাগের দাবি নিয়ে দ্বিতীয় দিনের মতো রাজপথে সশরীরে আন্দোলনে অবতীর্ণ হয় বিক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থীরা। পূর্বনির্ধারিত 'লংমার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয়' নামক কর্মসূচির তীব্র জোয়ারে শামিল হতে সকাল থেকেই রাজধানীর উত্তরা, সায়েন্স ল্যাবরেটরি এবং মিরপুরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে হাজার হাজার পরীক্ষার্থী অবস্থান নেয়।
আরও পড়ুন: এক ফেসবুক পোস্টেই বদলে গেল এতিম জান্নাতির জীবন, রাজকীয় আয়োজনে বিয়ে সম্পন্ন
শিক্ষার্থীদের এই আকস্মিক ও বিশাল আন্দোলনের কারণে রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, যার ফলে মিরপুর রোড, প্রগতি সরণি ও উত্তরা মহাসড়কে সকল প্রকার গণপরিবহন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এই নজিরবিহীন যানজটের ফলে অফিসফেরত সাধারণ যাত্রী এবং সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ ও সীমাহীন ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, অতি সম্প্রতি দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া দুর্যোগপূর্ণ বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেই কোনো প্রকার মানবিক বিবেচনা ছাড়া এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং একই সাথে যৌক্তিক প্রতিবাদী পরীক্ষার্থীদের গণমাধ্যমে অবমাননাকরভাবে ‘ফার্মের মুরগি’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে এমন গুরুতর অভিযোগ এনে শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল থেকেই ঢাকার একাধিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার ও মহাসড়ক অবরোধ করে দিনভর বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছিল হাজার হাজার সাধারণ শিক্ষার্থী। আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের সিদ্ধান্তের ওপরই মূলত নির্ভর করছে চলমান এইচএসসি পরীক্ষার ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি।
নিউজের সূত্র: আল-জাজিরা, সিএনএন এবং মিডল ইস্ট আই।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।