শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ): বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে প্রাকৃতিক পরিবেশকে সুরক্ষিত রাখা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য, সুন্দর ও সবুজ পৃথিবী গড়ে তোলার লক্ষ্যে দেশব্যাপী ব্যাপক পরিসরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় 'প্রাথমিক শিক্ষা পদক–২০২৬' উদযাপন উপলক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উদ্যোগে এবং নির্দেশনায় সারা দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একযোগে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সূচনা হয়েছে। এই মহতী উদ্যোগের অংশ হিসেবে সিরাজগঞ্জ জেলার ঐতিহ্যবাহী শাহজাদপুর উপজেলার পৌর সদরে অবস্থিত স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দরগাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অত্যন্ত উৎসবমুখর, ভাবগম্ভীর ও বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই কর্মসূচির শুভ উদ্বোধন অনুষ্ঠিত হয়।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং সর্বোপরি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রকৃতি প্রেমের বীজ বপন করার এই চমৎকার উদ্যোগে স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং সুশীল সমাজের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানটিকে এক ভিন্ন মাত্রা প্রদান করে। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে শুধু মাটি ও মানুষেরই বন্ধন দৃঢ় হয়নি, বরং একটি সবুজ বাংলাদেশ বিনির্মাণের দৃঢ় অঙ্গীকারও প্রতিফলিত হয়েছে।
আরও পড়ুন: ৫ বিষয়ে এইচএসসি পরীক্ষা চলছে, দুপুরে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় অভিমুখে লংমার্চ
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন এবং বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সাবরিনা শারমীন। তিনি তার বক্তব্যে পরিবেশ সংরক্ষণে গাছের অপরিহার্য ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা থেকে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে হলে বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো থেকেই শিক্ষার্থীদের মনে গাছ লাগানোর প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতে হবে, যেন তারা বড় হয়ে একেকজন প্রকৃতি রক্ষক হিসেবে দেশের কল্যাণে কাজ করতে পারে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই সময়োপযোগী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি শাহজাদপুরের সর্বস্তরের জনগণকে বাড়ির আনাচে-কানাচে, পতিত জমিতে এবং রাস্তার দুপাশে বেশি করে ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ লাগানোর উদাত্ত আহ্বান জানান।
উদ্বোধনী এই মহতী আয়োজনে শিক্ষা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শাহজাদপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ মুরাদ হোসেন এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম। শিক্ষা অফিসারবৃন্দ তাদের বক্তব্যে শিক্ষার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং পরিবেশ সচেতনতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তারা বলেন, বইয়ের পাতার শিক্ষার পাশাপাশি প্রকৃতি থেকে শিক্ষা নেওয়াটা একজন শিশুর পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত জরুরি। একটি গাছ লাগানোর পর তাকে যত্ন করে বড় করে তোলার যে প্রক্রিয়া, তা শিক্ষার্থীদের মাঝে ধৈর্য, মমতা ও দায়িত্বশীলতার জন্ম দেয়। দেশব্যাপী এই কর্মসূচি প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় ধরনের প্র্যাকটিক্যাল বা ব্যবহারিক শিক্ষা হিসেবে কাজ করবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সরকারি কর্মকর্তা ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি শাহজাদপুর উপজেলার স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দের সরব উপস্থিতি এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে সহায়তা করে। অনুষ্ঠানে বিশেষ আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শাহজাদপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সংগ্রামী সাধারণ সম্পাদক মোঃ আরিফুজ্জামান আরিফ, পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি ইমদাদুল হক নওশাদ এবং পৌর বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি রেজাউল ইসলাম রাজা। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তাদের বক্তব্যে বলেন, পরিবেশ রক্ষা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা দলের কাজ নয়, এটি সমগ্র জাতির একটি সম্মিলিত দায়িত্ব। দলমত নির্বিশেষে পরিবেশ বাঁচাতে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ দেশ রেখে যেতে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তারা।
অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন উপজেলা বিএনপির সাবেক প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক এবং দরগাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সুযোগ্য ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মোঃ আল আমিন হোসেন। তিনি তার সমাপনী বক্তব্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বিদ্যালয় প্রাঙ্গণকে সবুজ অরণ্যে পরিণত করতে এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। তিনি বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নির্দেশনা প্রদান করেন যেন রোপণ করা প্রতিটি গাছের সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা হয়। শুধুমাত্র গাছ লাগালেই হবে না, সেগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা এবং বড় করে তোলার মধ্যেই এই কর্মসূচির মূল সার্থকতা নিহিত। একই সাথে তিনি এলাকার অভিভাবকদের প্রতিও আহ্বান জানান, তারা যেন নিজ নিজ সন্তানদের গাছ লাগাতে উৎসাহিত করেন।
এছাড়াও তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জাহিদুল ইসলাম। যুবসমাজের আইডল হিসেবে তিনি তরুণ সমাজকে পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসার এবং সামাজিক বনায়নে নিজেদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান। তার উপস্থিতি অনুষ্ঠানে উপস্থিত তরুণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহের সৃষ্টি করে।
আরও পড়ুন: বাকেরগঞ্জে পাষণ্ড জামাতার বিরুদ্ধে ৭০ বছরের বৃদ্ধা শাশুড়িকে ধর্ষণের অভিযোগ
দরগাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকাবৃন্দ অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পুরো অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন। বিদ্যালয়ের কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীরা যখন নিজ হাতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে গাছের চারা রোপণ করছিল, তখন এক অভূতপূর্ব দৃশ্য ও আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শিশুদের চোখেমুখে ছিল নতুন কিছু করার তৃপ্তি ও উচ্ছ্বাস। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অসংখ্য অভিভাবক এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এই কার্যক্রমকে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক ও নিম্নাঞ্চলের দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন, বন উজাড় এবং শিল্পায়নের ফলে প্রকৃতির যে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, তা পুনরুদ্ধারে ব্যাপকভাবে বনায়ন কর্মসূচির কোনো বিকল্প নেই। 'প্রাথমিক শিক্ষা পদক–২০২৬' এর মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনের সাথে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে যুক্ত করার ফলে এটি দেশের প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত একটি শক্তিশালী বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। দেশের হাজার হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যদি একই সাথে এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা অচিরেই বাংলাদেশের পরিবেশগত দৃশ্যপটকে আমূল বদলে দেবে।
সবশেষে, একটি সুন্দর, সুস্থ ও দূষণমুক্ত সমাজ গঠনের প্রত্যাশা নিয়ে এবং রোপণকৃত গাছের যথাযথ পরিচর্যার অঙ্গীকার ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে শাহজাদপুর দরগাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই বর্ণাঢ্য বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সফল সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। এই উদ্যোগ আগামী দিনে দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এবং "সবুজ বাংলাদেশ, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ" গড়ার স্বপ্নকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।