৫ বিষয়ে এইচএসসি পরীক্ষা চলছে, দুপুরে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় অভিমুখে লংমার্চ

৫ বিষয়ে এইচএসসি পরীক্ষা চলছে, দুপুরে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় অভিমুখে লংমার্চ
ছবি: সংগৃহীত
 ঢাকা: দেশের চলমান তীব্র বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরিস্থিতির মধ্যেই আজ বুধবার (১৫ জুলাই, ২০২৬) সকাল ১০টা থেকে দেশের ৫৯টি জেলায় এইচএসসি ও সমমানের তাত্ত্বিক বিষয়ের পরীক্ষা শুরু হয়েছে। আজকে সাধারণ ও কারিগরি-মাদ্রাসা বোর্ড মিলিয়ে সর্বমোট ৫টি বিষয়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে বন্যা ও জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড এবং এর আওতাধীন মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডের অধীনস্থ ৫টি জেলার পরীক্ষা পূর্বঘোষিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্থগিত রাখা হয়েছে।

​এদিকে, বৈরী আবহাওয়া ও বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা সম্পূর্ণ স্থগিত করার দাবিতে রাজপথে নেমেছেন পরীক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ। পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, আজ দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে রাজধানীর উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনে থেকে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা শিক্ষা মন্ত্রণালয় অভিমুখে এক বিশাল ‘লংমার্চ’ বা দীর্ঘযাত্রা কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

​আজকের পরীক্ষার বিষয় ও কেন্দ্রের চিত্র

​আজ ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ষষ্ঠ ও সপ্তম দিনের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ৮টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে একযোগে ৩টি প্রধান বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে:

​বিজ্ঞান বিভাগ: পদার্থবিজ্ঞান (তত্ত্বীয়) ২য় পত্র।

​ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ: হিসাববিজ্ঞান ২য় পত্র।

​মানবিক বিভাগ: যুক্তিবিদ্যা ২য় পত্র।

​এর পাশাপাশি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আজ ‘আরবী দ্বিতীয় পত্র’ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ‘ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা-২’ বিষয়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সকাল থেকেই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন পরীক্ষাকেন্দ্রে পরীক্ষার্থীদের উপস্থিত হতে দেখা যায়। বৈরী আবহাওয়া ও বৃষ্টির কারণে পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে পৌঁছাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। অনেক কেন্দ্রে অভিভাবকদের দীর্ঘ উপস্থিতি ও উৎকণ্ঠার চিত্র চোখে পড়েছে।

আরও পড়ুন: শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি: রাজপথে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের তীব্র ক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ

​চট্টগ্রামের পরীক্ষা স্থগিত ও শিক্ষার্থীদের ৩ দফা আন্দোলন

​টানা বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। এই কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড এবং ওই বোর্ডের আওতাধীন মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে থাকা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবন—এই ৫টি জেলার ১৩, ১৫ ও ১৬ জুলাইয়ের সকল পরীক্ষা আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্থগিত করা হয়েছে। গত ১২ জুলাই আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির এক জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই স্থগিতের সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছিল।

​তবে দেশের অন্যান্য স্থানে পরীক্ষা সচল রাখার প্রতিবাদে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছেন একদল আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী। তাদের মূল দাবিগুলো হলো:

১. দেশে চলমান বন্যা ও জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান বা দুর্যোগ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এইচএসসি ও সমমানের চলমান পরীক্ষা সম্পূর্ণ স্থগিত করা।

২. গত ১৩ জুলাই বৈরী আবহাওয়া ও জলাবদ্ধতার কারণে দেশের যেসব পরীক্ষার্থী কেন্দ্রে পৌঁছাতে না পেরে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি, তাদের জন্য বিশেষ পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা করা।

৩. উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায়ে শিক্ষা মন্ত্রী এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রীর পদত্যাগ।

​শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের বিপরীতে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কমিটি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, শুধুমাত্র চট্টগ্রাম বিভাগে বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে পরীক্ষা নেওয়ার অনুপযোগী পরিবেশ তৈরি হওয়ায় সেখানকার পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। দেশের অন্যান্য সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষা গ্রহণের মতো উপযুক্ত পরিবেশ বহাল থাকায় পূর্বঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী পরীক্ষা যথানিয়মে চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের এক বিশেষ বৈঠকেও একই সিদ্ধান্ত বহাল রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়।

​নারী শিক্ষায় ইতিবাচক অগ্রগতি: ছাত্রদের চেয়ে ছাত্রী বেশি

​শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবারের ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সর্বমোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে ছাত্র সংখ্যা ৬ লাখ ২১ হাজার ৯৬৯ জন এবং ছাত্রী সংখ্যা ৬ লাখ ৪৮ হাজার ৬১৪ জন। অর্থাৎ, এবার ছাত্রদের তুলনায় ২৬ হাজার ৬৪৫ জন বেশি ছাত্রী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা এই পরিসংখ্যানকে দেশের নারী শিক্ষার প্রসার এবং নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে দেখছেন।

​এর আগে গত ১ জুলাই সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক জানিয়েছিলেন, দেশের মোট ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে ৯ হাজার ৪৩৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এই পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। এবারই প্রথম ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে একক ও অভিন্ন প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে এইচএসসি পরীক্ষা গ্রহণ করা হচ্ছে।

​ঝরে পড়ার আশঙ্কাজনক চিত্র: পরীক্ষা দিচ্ছেন না ৩৬ শতাংশ নিয়মিত শিক্ষার্থী

আরও পড়ুন: শাহজাদপুরের অবহেলিত উন্নয়নে ২৫ দফা দাবি: নাগরিক কমিটির স্মারকলিপি ও বিশাল মানববন্ধন

​এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় সবচেয়ে চমকপ্রদ ও উদ্বেকজনক তথ্য উঠে এসেছে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার নিয়ে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধিত নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৬ শতাংশ পরীক্ষার্থীই এবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না। অর্থাৎ, তারা পরীক্ষার ফরম পূরণই করেননি।

​তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে চূড়ান্তভাবে নাম নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন করেছিলেন। কিন্তু তাদের মধ্যে মাত্র সাড়ে ৯ লাখ শিক্ষার্থী এবার এইচএসসি পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছেন। বাকি প্রায় সাড়ে ৫ লাখ নিয়মিত শিক্ষার্থী পরীক্ষা থেকে ছিটকে গেছেন। গত বছর এই নিয়মিত শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার হার ছিল ২৯ শতাংশের কিছু বেশি, যা এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

​বোর্ডভিত্তিক ঝরে পড়ার হারের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:

​৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড: মোট নিবন্ধিত ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬১ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ফরম পূরণ করেছেন ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭৭ জন। অর্থাৎ ৩ লাখ ৯১ হাজার ৯৮৪ জন বা ৩৩.৪ শতাংশ নিয়মিত শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না।

​মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড: আলিম প্রথম বর্ষে নিবন্ধিত ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯২৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ফরম পূরণ করেছেন মাত্র ৭৮ হাজার ২৬৯ জন। অর্থাৎ ৬১ হাজারের বেশি বা ৪৪.৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিচ্ছেন না।

​কারিগরি শিক্ষা বোর্ড: ভোকেশনালে নিবন্ধিত ১ লাখ ৬৫ kernel ৫৪২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ফরম পূরণ করেছেন ৭৫ হাজার ১৯৭ জন। বাকি ৯০ হাজার ৩৪াস জন বা ৫৪.৫৮ শতাংশ শিক্ষার্থীই এবার পরীক্ষার বাইরে রয়েছেন।

​শিক্ষাবিদদের মতে, অর্থনৈতিক সংকট, বাল্যবিয়ে এবং কোভিড-পরবর্তী পারিবারিক টানাপোড়েনের কারণেই মূলত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিকের এই চূড়ান্ত পরীক্ষা থেকে ঝরে পড়েছেন, যা দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

সংবাদ সূত্র: আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রেস উইং।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন