শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি: রাজপথে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের তীব্র ক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি: রাজপথে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের তীব্র ক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ
ছবি: সংগৃহীত
এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে রাজপথে শিক্ষার্থীরা: রাজধানীজুড়ে তীব্র যানজট ও বিক্ষোভের উত্তাপ

ঢাকা: চলমান এইচএসসি পরীক্ষার সময়সূচি পুনর্নির্ধারণ, প্রশ্নপত্রের ভুল সংশোধন এবং সাম্প্রতিক সময়ের নজিরবিহীন বৃষ্টি ও জলজটের কারণে সৃষ্ট ভোগান্তি নিরসনে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এই অব্যবস্থাপনার প্রতিকার এবং উদ্ভূত পরিস্থিতির দায় স্বীকার করে বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগের দাবিতে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করে ব্যাপক বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

​আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল থেকেই রাজধানীর উত্তরা ও সায়েন্সল্যাবসহ বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীরা সমবেত হয়ে স্লোগানে স্লোগানে রাজপথ কাঁপিয়ে তোলেন। শিক্ষার্থীদের এই আকস্মিক সড়ক অবরোধের ফলে ঢাকার প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, যার প্রভাব পড়ে পুরো নগরীর যোগাযোগ ব্যবস্থায়।

উত্তরা ও সায়েন্সল্যাবে শিক্ষার্থীদের অবস্থান ও বিক্ষোভ

​আজ সকাল থেকেই রাজধানীর উত্তরা এলাকার বিএনএস সেন্টারের সামনে বিভিন্ন কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শত শত এইচএসসি পরীক্ষার্থী জড়ো হতে শুরু করেন। সময় বাড়ার সাথে সাথে সেখানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি সাধারণ মানববন্ধনে রূপ নেয়। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের একাংশ অবরোধ করে মিছিল করেন।

আরও পড়ুন: হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ: জাতীয় পার্টির স্মরণ ও শ্রদ্ধা

​একই সময়ে রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত মোড় সায়েন্সল্যাব এলাকাতেও ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়। সেখানে জড়ো হওয়া শিক্ষার্থীরা রাস্তা বন্ধ করে অবস্থান নেন। এ সময় তাদের হাতে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া সম্বলিত প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন দেখা যায়। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা চিৎকার করে স্লোগান দিতে থাকেন:

​"শিক্ষা নিয়ে ছিনিমিনি, চলবে না চলবে না!"

"ব্যর্থ মন্ত্রী বিদায় নাও, শিক্ষা বাঁচাও দেশ বাঁচাও!"

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি পরীক্ষার্থীরা

​বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রধান অভিযোগ ছিল, দেশের বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতি এবং বৈরী আবহাওয়ার কথা বিবেচনা না করেই জোরপূর্বক এইচএসসি পরীক্ষার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরীক্ষা আয়োজন করা হয়েছে।

​গত কয়েকদিনের অবিরাম ও ভারী বর্ষণে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চল সম্পূর্ণ জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। রাজপথে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা। শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:

  • যাতায়াতের চরম ভোগান্তি: অনেক শিক্ষার্থীকে চরম নোংরা পানি ও কাদা মাড়িয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়েছে। ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের নিম্নাঞ্চলের অনেক পরীক্ষার্থীকে পরীক্ষা কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য নৌকার সাহায্য পর্যন্ত নিতে হয়েছে।
  • মানসিক ও শারীরিক ধকল: এমন চরম প্রতিকূল ও ভেজা অবস্থায় পরীক্ষা কেন্দ্রে যাওয়ার পর কোনো শিক্ষার্থীর পক্ষেই শান্ত মাথায় ও স্বাভাবিকভাবে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সম্ভব নয়। এটি শিক্ষার্থীদের ওপর মারাত্মক মানসিক ও শারীরিক চাপের সৃষ্টি করছে।
  • আবেদন প্রত্যাখ্যান: বন্যা ও ভারী বৃষ্টির প্রকোপ থাকা অবস্থায় পরীক্ষাটি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার জন্য শিক্ষার্থীরা বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়েছিল। কিন্তু শিক্ষা প্রশাসন সেই মানবিক দাবিগুলোকে কোনো রকম গুরুত্ব দেয়নি।

পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ভুল ও মূল্যায়নের অসঙ্গতি

​প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি চলমান পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের মান নিয়েও শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্রের গুরুতর ভুলের বিষয়টি শিক্ষার্থীরা সামনে এনেছেন।

আরও পড়ুন: সাভারে এনসিপির সমাবেশে হামলার তীব্র নিন্দা জামায়াতের, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

​তাদের অভিযোগ, ওই পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের ৬ নম্বর এবং ৭ নম্বর প্রশ্নে বড় ধরনের ভুল ছিল, যা পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করেছে এবং তাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করেছে। শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট ভাষায় জানান, তারা কঠিন প্রশ্নপত্রের বিরোধী নন, তবে যে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে তারা প্রস্তুতি নিয়েছেন এবং পরীক্ষা দিচ্ছেন, তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে খাতা মূল্যায়ন করা উচিত।

শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত ৮ দফা দাবি

​আন্দোলনের মাঠ থেকে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার এবং তাদের তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে মোট ৮ দফা দাবি উত্থাপন করেছেন। তাদের দাবিগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

​১. পরীক্ষা সাময়িক স্থগিতকরণ: দেশে বিরাজমান বন্যা, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত চলমান এইচএসসি পরীক্ষা অবিলম্বে স্থগিত করতে হবে।

২. ব্যর্থতা স্বীকার ও ক্ষমা প্রার্থনা: বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করার পেছনে দায়ীদের চিহ্নিত করতে হবে এবং শিক্ষামন্ত্রীকে তার প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে ছাত্রসমাজের কাছে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে।

৩. শিক্ষা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ: প্রতি বছর পরীক্ষা পদ্ধতি বা সিলেবাস নিয়ে বারবার নীতি পরিবর্তন ও ‘গবেষণা’ বন্ধ করতে হবে।

৪. রাজনীতিমুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর থেকে সকল প্রকার রাজনৈতিক প্রভাব দূর করতে হবে।

৫. ভুল প্রশ্নের ক্ষতিপূরণ: পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের বিতর্কিত ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নের ভুলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সকল শিক্ষার্থীকে সমপরিমাণ বোনাস নম্বর প্রদান করতে হবে।

৬. সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রশ্নপত্র প্রণয়ন: ভবিষ্যৎ পরীক্ষাগুলোর প্রশ্নপত্র অবশ্যই সারা বছরের সংক্ষিপ্ত ও পঠিত পাঠ্যক্রমের আলোকে এবং বাস্তবসম্মত উপায়ে তৈরি করতে হবে।

৭. পরীক্ষা ব্যবস্থার আধুনিক সংস্কার: শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে অতিরিক্ত পরীক্ষার চাপ কমাতে পরীক্ষা পদ্ধতির আধুনিক ও যুগোপযোগী সংস্কার করতে হবে।

৮. সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মান বৃদ্ধি করতে হবে।

মূল তিনটি দাবি এবং আন্দোলনের ভবিষ্যৎ আলটিমেটাম

​আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, ৮টি দাবির মধ্যে তাদের প্রধান ও তাৎক্ষণিক দাবি তিনটি। প্রথমত, পরীক্ষা দেওয়ার মতো উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত চলমান পরীক্ষা স্থগিত করা; দ্বিতীয়ত, প্রশ্নপত্রের ভুলের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রাপ্য নম্বর প্রদান করা এবং তৃতীয়ত, সামগ্রিক পরীক্ষা ব্যবস্থার একটি স্থায়ী ও ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসা।

​শিক্ষার্থীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এই যৌক্তিক দাবিগুলো যদি অবিলম্বে মেনে নেওয়া না হয়, তবে তারা আরও কঠোর ও সর্বাত্মক কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ ছাড়বেন না এবং পরিস্থিতি আরও জটিল হলে শিক্ষামন্ত্রীর চূড়ান্ত পদত্যাগই হবে তাদের একমাত্র লক্ষ্য।

জনজীবনে প্রভাব ও ঢাকার বাইরের চিত্র

​রাজধানীর উত্তরা এবং সায়েন্সল্যাবের মতো প্রধান সড়কগুলো বন্ধ থাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, যার ফলে অফিসগামী মানুষ এবং সাধারণ পথচারীরা চরম ভোগান্তির শিকার হন। অনেককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসে আটকে থাকতে দেখা যায়। এদিকে শুধু ঢাকাতেই নয়, একই দাবিতে ঢাকার বাইরেও বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রবেশদ্বার বগুড়াতেও সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে এসে সমস্বরে পরীক্ষা স্থগিত ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে তীব্র স্লোগান ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

নিউজ সূত্র: মাঠ পর্যায়ের নিজস্ব প্রতিনিধি ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের বক্তব্য।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন