স্মরণে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার এক দীর্ঘস্থায়ী চরিত্র। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত টানা নয় বছর তিনি রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি বাংলাদেশের সামাজিক, অবকাঠামোগত এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে এমন কিছু পরিবর্তন এনেছিলেন যা আজও দেশজুড়ে আলোচিত। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ ভোরেই রংপুর নগরীর সেন্ট্রাল রোডে অবস্থিত দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয় এবং শোকের চিহ্ন হিসেবে দলীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন: অনলাইনে মাদক কেনাবেচায় সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড, সংসদে বিল পাস
দলীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য ও রংপুর মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক এস এম ইয়াসির জানিয়েছেন, প্রয়াত রাষ্ট্রপতির রুহের মাগফেরাত কামনায় জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ আজ দিনব্যাপী কোরআন তেলাওয়াত ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছেন। এছাড়া নগরীর প্রতিটি মোড়ে এবং গুরুত্বপূর্ণ জনসমাগমস্থলে মাইকযোগে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ভাষণ প্রচার করা হচ্ছে, যা স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝেও তাঁর স্মৃতিকে নতুন করে ফিরিয়ে আনছে।
পল্লী নিবাসে স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিল
আজ বেলা ১১টায় রংপুর নগরীর দর্শনা এলাকায় অবস্থিত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শেষ ঠিকানা ‘পল্লী নিবাস’-এ আয়োজিত স্মরণসভায় কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সরব উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। সমাধিস্থলে পুষ্পস্তবক অর্পণ, কোরআন তেলাওয়াত ও কবর জিয়ারতের পর বিশাল এক দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এই বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় পার্টির বর্তমান চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ (জি এম) কাদের।
এছাড়া দলের মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, কো-চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফাসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের সিনিয়র নেতারা উপস্থিত থেকে এরশাদের কর্মজীবনের ওপর বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিটি উপজেলা ও ইউনিয়ন কমিটিও নিজ নিজ এলাকায় পৃথক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, যা জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শন ও নেতাকে স্মরণ করার একটি প্রয়াস হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এরশাদ শাসনামলের কিছু আলোচিত মাইলফলক
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দীর্ঘ ৯ বছরের শাসনামলে দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদদের মতে, তাঁর শাসনামলের কিছু সিদ্ধান্ত আজও জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়:
উপজেলা পদ্ধতির প্রবর্তন: প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে তিনি বাংলাদেশে উপজেলা শাসনব্যবস্থা চালু করেন, যা স্থানীয় সরকারের উন্নয়নে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা: তিনি সংবিধান সংশোধন করে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন, যা বাংলাদেশের ধর্মীয় রাজনীতি ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সুবিধা: দেশের সমস্ত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ বিল মওকুফের সিদ্ধান্তটি তাঁর শাসনামলে সাধারণ আলেম-ওলামা ও ধর্মপ্রাণ মানুষের মাঝে বিপুল সাড়া ফেলেছিল।
শ্রমিকদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান ঘোষণা: বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ‘জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে তাদের সামাজিক মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিতে কাজ করেছিলেন।
ওষুধ নীতি: ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধ নীতি প্রণয়ন ছিল তাঁর শাসনামলের অন্যতম সেরা কৃতিত্ব, যার ফলে দেশে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে এসেছিল।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন: ঢাকার বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং যমুনা বহুমুখী সেতু নির্মাণের স্বপ্ন ও প্রাথমিক পরিকল্পনা তাঁর আমলেই গ্রহণ করা হয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
আরও পড়ুন: বেলকুচিতে পানির লাইনে রহস্যময় গ্যাস ও আগুন: চাঞ্চল্য ও ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের প্রস্তুতি
এক নজরে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ
১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত ভারতের কোচবিহার জেলার দিনহাটায় জন্মগ্রহণ করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। শৈশব ও কৈশোরের একটা বড় সময় তিনি সেখানেই কাটিয়েছেন। দেশভাগের পর পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশে চলে আসেন এবং রংপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। দীর্ঘ বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে সেনাপ্রধান থেকে রাষ্ট্রপ্রধান—সবক্ষেত্রেই তিনি নিজের ছাপ রেখেছেন।
১৯৮৬ সালে তিনি ‘জাতীয় পার্টি’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃত। যদিও তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল নানা বিতর্কে পূর্ণ, কিন্তু ব্যক্তি এরশাদের ভক্ত-সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন রংপুরের প্রাণপুরুষ। তাঁর মৃত্যুর পর ভক্তদের প্রবল দাবির মুখেই তাঁকে তাঁর প্রিয় ঠিকানা রংপুরের পল্লী নিবাসে সমাহিত করা হয়। আজ সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর হাজারো অনুসারী পরম শ্রদ্ধাভরে তাঁকে স্মরণ করছেন।
আমাদের এই প্রতিবেদনের মূল উদ্দেশ্য—ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জীবনযাত্রাকে নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরা, যাতে পাঠকরা তাঁর শাসনামলের সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য জানতে পারেন।
সংবাদ সূত্র: জাতীয় পার্টি প্রেস বিজ্ঞপ্তি ও জীবনী আর্কাইভ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।